ভারতের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের বিজেপি সরকার একটি জাতীয় দৈনিকের প্রথম পাতায় বিরাট বিজ্ঞাপন দিয়ে আজ চরম অস্বস্তিতে পড়েছে।

এদিন সকালে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় প্রকাশিত ওই বিজ্ঞাপনে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের বিশাল ছবিসহ উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের উন্নয়ন-সূচক যে ছবি ছাপা হয়েছে - তা মূলত কলকাতার একটি ফ্লাইওভারের ও স্কাইলাইনের।

এ তথ্য সামনে আসতেই পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস তা হাতিয়ার করে বিজেপির বিরুদ্ধে আক্রমণ শানিয়েছে, যদিও বিজেপির পক্ষ থেকে দায় চাপানো হচ্ছে বিজ্ঞাপন সংস্থার ওপরেই।

ছবি-বিভ্রাটের দায় স্বীকার করে বিবৃতি দিয়েছে সংশ্লিষ্ট পত্রিকাটিও, তবে তাতে বিতর্ক আরো বেড়েছে।


ভারতের রাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য উত্তরপ্রদেশে ভোট সামনেই, আর তাকে সামনে রেখেই রোববারের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে রাজ্য সরকার পাতাজোড়া বিজ্ঞাপন দিয়েছিল - যার শিরোনাম 'ট্রান্সফর্মিং উত্তরপ্রদেশ'।

মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ কিভাবে রাজ্যের ভোল বদলেছেন, ফলাও করে তার বর্ণনা ছিল সেখানে - কিন্তু গণ্ডগোল বাঁধে সাথের ছবিটিতেই।

ওই ছবিতে নীল-সাদা রেলিং দেওয়া মা ফ্লাইওভার, আইকনিক হলুদ ট্যাক্সি আর দিগন্তের পাঁচতারা হোটেল থেকে নিমেষেই চিনে নেয়া যায় ওই ছবিটি আসলে কলকাতার - যে রাজ্যে মাত্র কয়েকমাস আগেই ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে নির্বাচনী প্রচার করে এসেছেন আদিত্যনাথ।

বিজেপির এ তথ্য বিভ্রাট লুফে নিতে এতটুকুও দেরি করেনি তৃণমূল - দলের জাতীয় মুখপাত্র ও এমপি মহুয়া মৈত্র বলেছেন, ‘এটা একদিকে যেমন হাস্যকর - তেমনি কিন্তু আবার আশ্চর্য হওয়ারও কিছু নেই!’

‘তার কারণ যোগী তো উত্তরপ্রদেশে কিছু করেননি, কাজেই ওনাকে রাজ্যের উন্নয়নের ছবি দিতে হলে অন্যের থেকে ধার করেই দিতে হবে।’

‘আর সেখানে আমাদের কলকাতার মা ফ্লাইওভার, জে ডাব্লিউ ম্যারিয়ট হোটেলের ছবির কাছে ওনাকে হাত পাততে হচ্ছে, সেটা দেখে আমাদের বেশ ভালই লাগছে।’

‘২০২৪-র নির্বাচনের আগে মমতা ব্যানার্জি সারা দেশকেই এখন দিশা দেখাচ্ছেন - উত্তরপ্রদেশ সরকারও তার ব্যতিক্রম নয় বলেই মনে হচ্ছে’, রীতিমতো শ্লেষের সুরেই বলছিলেন মৈত্র।

তৃণমূল নেতা অভিষেক ব্যানার্জিও বিজেপির বিরুদ্ধে ছবি 'চুরি'র অভিযোগ এনে আজ টুইট করেছেন।

দিল্লিতে দলের সিনিয়র এমপি কাকলি ঘোষদস্তিদার আবার বলছিলেন, এর মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির দক্ষতারই পরোক্ষ স্বীকৃতি দিয়েছে বিজেপি।

কাকলি ঘোষদস্তিদারের কথায়, ‘বিজেপি তো অন্তত মনে মনে জানছে উন্নয়ন আসলে কোথায় হয়েছে এবং এটাও বুঝতে পারছে ওনাকে অনুসরণ করলেই ভাল হয়। ফলে আমি বলব বিজেপি এখানে নিজের অজান্তেই মমতা ব্যানার্জিকে একটা স্বীকৃতি দিয়ে ফেলেছে এবং যোগীর তুলনায় তিনি যে অনেক শ্রেষ্ঠ - তাও স্বীকার করে ফেলেছে।’

বিষয়টি নিয়ে উত্তরপ্রদেশ বা দিল্লিতে বিজেপির নেতারা কেউই মুখ খুলতে রাজি হননি, কিংবা বিষয়টি তাদের জানা নেই বলে এড়িয়ে গিয়েছেন।

তবে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির মুখপাত্র শমীক ভট্টাচার্যর দাবি, ভুলটা আসলে বিজ্ঞাপনী সংস্থার - রাজ্য সরকারের নয়।

শমীক ভট্টাচার্য বলছিলেন, ‘আমরা সবাই জানি সরকার যখন এ ধরনের কোনো বিজ্ঞাপন দেয় সেটা এজেন্সির মাধ্যমেই দেয়া হয়। এখানে ভুলবশত কলকাতার ছবি দেয়া হয়ে থাকলে তার দায় ওই এজেন্সিরই।’

‘কোনো সরকারই ইচ্ছে করে এমন ভুল করবে না - আর বিজেপি যদি দারুণ ফ্লাইওভারের ছবি দিতে চায় তাহলে আমাদের আমলে করা মহারাষ্ট্র বা গুজরাটের ছবিই দেবে, কলকাতারটা কেন দিতে যাবে?"


‘তবে সবচেয়ে বড় কথা, এটা একটা ভুল এবং ভুল ছাড়া আর কিছুই নয় - এটাকে চুরি বলাটা অনুচিত। এবং এটা নিয়ে কোনো রাজনীতিও কাম্য নয়!’

দুপুরের পর ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকাগোষ্ঠী অবশ্য টুইট করে জানায় ভুলটা তাদের মার্কেটিং বিভাগেরই - এবং তাদের সব ডিজিটাল সংস্করণ থেকেই বিজ্ঞাপনটি সরিয়ে দেয়া হয়েছে।

যদিও মহুয়া মৈত্রর ধারণা, পত্রিকাটিকে চাপ দিয়েই তাদের এ ভুল স্বীকারে বাধ্য করা হয়েছে।

মৈত্র আরো বলেন, ‘আমি একশোভাগ নিশ্চিত ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে চাপ দিয়েই এটা করানো হয়েছে। কারণ, বিজেপি এখন একটা বলির পাঁঠা খুঁজছে। কারণ এটা হতেই পারে না যে উত্তরপ্রদেশ রাজ্য সরকার এত খরচ করে একটা বিজ্ঞাপন দিয়েছে - কিন্তু সেটা তারা ছাড়পত্র দেয়নি, কিংবা সরকারের কেউ সেটা সাইন অফ করেনি। ফলে এখন যেভাবে সংবাদপত্রটির ঘাড়ে বন্দুক রেখে তারা দায় এড়াতে চাইছে, তা বিশ্বাসযোগ্য নয় একেবারেই!’

নেপথ্যের ঘটনা যাই হোক, গোটা ভারতে এখন বিজেপির সবচেয়ে শক্ত প্রতিপক্ষ তৃণমূল কংগ্রেস, আর ওই তৃণমূলেরই শাসিত রাজ্যের অবকাঠামোর ছবি নিজেদের বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করে যোগী আদিত্যনাথের সরকার ও দলীয়ভাবে বিজেপিকে এখন যে চরম বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে - তা স্পষ্ট বোঝাই যাচ্ছে।

সূত্র : বিবিসি