সেদিন এক বৃদ্ধ রিকশাচালক আক্ষেপ করে বললেন, আপনার মতো একজন ছাত্র আমাকে সারা ক্যাম্পাস ঘুরিয়ে তারপর ১০০ টাকা হাতে ধরিয়ে বিদায় করে দিলো। অথচ আমাকে যে সময় ধরে ঘুরিয়েছে, তাতে আমার অন্তত ৫০০ টাকা পাওনা হয়েছে। লোকটির কথা শুনে আমি অবাক হলাম; আবার খুব কষ্টও পেলাম। এই মানুষগুলোই প্রতিনিয়ত আমাদের সুখ দিয়ে যান, বিনিময়ে আমরা তাদের দুঃখ ছাড়া আর কিছুই দিতে পারি না। শুধু একজন রিকশাচালকই নন, আপনি প্রত্যেক শ্রমজীবী মানুষের সাথে কথা বলে দেখবেন, তারা কোনো না কোনোভাবে বঞ্চনার শিকার হয়ে থাকেন। আর তাদের প্রতিনিয়ত বঞ্চিত করে আমাদের দেশের তথাকথিত শিক্ষিত এবং বিত্তবান সম্প্রদায়।
সত্য কথা বলতে কী, আমাদের দেশের শ্রমজীবী মানুষেরা সবচেয়ে বেশি লাঞ্ছনা ও অবজ্ঞার শিকার। শুধু আমাদের দেশে কেন, পৃথিবীর প্রতিটি দেশেই তারা চরমভাবে বঞ্চনার শিকার হয়ে থাকেন। বছরের পর বছর এভাবে চলে আসছে। অথচ আমরা মুখে অনেক বড় বড় কথা বলি। আমরা শ্রমিকের ন্যায্য অধিকারের কথা বলি, তাদের জন্য নিরাপদ কর্মক্ষেত্র তৈরির কথা বলি। এ ছাড়াও আমরা অনেক বড় বড় কথা বলি, যা আমরা কোনোদিনও বাস্তবায়ন করে দেখাতে পারি না। অদূর ভবিষ্যতেও পারব কি না, এ নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।
পয়লা মে পৃথিবীর সব শ্রমিকের জন্য এক ঐতিহাসিক দিন। এদিন তাদের জন্য হয়ে আছে এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ইতিহাস। প্রতিবছর এদিন তারা নতুন করে বাঁচার অনুপ্রেরণা পান। আবার কেউ কেউ নতুন করে হতাশায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। এদিন আবার তাদের হতাশার কী আছে? হ্যাঁ, প্রশ্নটা উঠতেই পারে। এদিন তারা হতাশায় মুষড়ে পড়েন। এর কারণ, তাদের বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। অথচ এসব বড় বড় বুলি শুধু মঞ্চ কাঁপানোর জন্যই ব্যবহৃত হয়। বাস্তবে এসব ফাঁকা বুলি ছাড়া আর কিছুই নয়।
সৃষ্টির আদিকাল থেকে পৃথিবীর মানুষের জন্য খাবার বন্দোবস্ত করে আসছেন কৃষকেরা। তারা যদি আমাদের জন্য খাদ্য উৎপাদন না করতেন, তাহলে হয় আমাদের না খেয়ে মরতে হতো, না হয় নিজেদের খাদ্যের ব্যবস্থা নিজেদেরই করতে হতো। যে মানুষগুলোর হাড়ভাঙা পরিশ্রমের ফলে আমরা বেঁচে থাকার রসদ পাচ্ছি, আমাদের সমাজে সেই মানুষগুলোই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। আগের চেয়ে তাদের অবস্থা সামান্য উন্নতি হলেও এটাকে যথেষ্ট মনে করার কোনো কারণ নেই। মহাজনের সুদের টাকা মেটাতে এখন হয়তো তাদের হালের বলদ বিক্রি করার দরকার হয় না। তবে এক শ্রেণীর অসাধু মানুষ আজো তাদের রক্ত চুষে খাচ্ছে। কৃষকরা তাদের ফসলের ন্যায্য দাম পান না। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য কোনো কারণে ক্ষেতের ফসল নষ্ট হয়ে গেলে তারা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পান না। সভ্যতা বিনির্মাণে যাদের এত অবদান, তাদের কিভাবে আমরা এত অবহেলায় ফেলে রাখতে পারি?
নারীদের জন্য যেসব কর্মক্ষেত্র রয়েছে, তা তাদের জন্য কতটা নিরাপদ? আগের তুলনায় বর্তমান সময়ে অধিকসংখ্যক নারী কর্মের তাগিদে বাইরে বের হয়েছেন। একটি দেশের উন্নতি এবং সমৃদ্ধির জন্য তারা তাদের মূল্যবান শ্রম ব্যয় করে থাকেন। কিন্তু আমরা কি তাদের জন্য আজো নিরাপদ কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছি? এর উত্তর হলোÑ না। তাই যদি পারতাম, তা হলে প্রতিনিয়ত আমাদের কর্মক্ষেত্রে নারীদের হয়রানির খবর শুনতে হতো না। আর নারীদের বেতন? বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্পে প্রচুর সংখ্যক নারী কাজ করে থাকেন। বলা চলে, এসব প্রতিষ্ঠানের মূল চালিকাশক্তিই হলো নারী শ্রমিক। অথচ তাদের যে বেতন দেয়া হয়, তা অতি সামান্য। এই বেতন দিয়ে কোনো মানুষ সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকতে পারে না। তারপরও আমাদের নারীরা পারেন। কারণ, তারা সংগ্রামী।
একজন রিকশাচালক, একজন কৃষক, একজন গার্মেন্টকর্মী কিংবা একজন নির্মাণ শ্রমিকÑ এরা সবাই একটি দেশের উন্নতি এবং সমৃদ্ধির জন্য নিজেদের মূল্যবান শ্রম ব্যয় করে থাকেন। তাদের শ্রম এবং ঘামের মাধ্যমে আমাদের সভ্যতা গড়ে উঠেছে। আমাদের শহরগুলোয় বড় বড় দালানকোঠা নির্মাণ করে আমাদের বসবাসের ব্যবস্থা তারা করে দিয়েছেন। আমাদের প্রবাসী শ্রমিক ভাইয়েরা হাড়ভাঙা খাটুনির মাধ্যমে আমাদের জন্য মূল্যবান রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। আমরা যদি তাদের জন্য আরেকটু নিরাপদ কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি করতে পারি এবং তাদের দিকে একটু সহানুভূতির দৃষ্টিতে তাকাতে পারি, তাহলে তারা আমাদের জন্য আরো বেশি অবদান রাখতে সক্ষম হবেন। আমাদের কাছ থেকে তারা খুব বেশি কিছু চান না। শুধু আমাদের একটু ভালোবাসা এবং মমতামাখা দৃষ্টি তাদের মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলতে পারে। শ্রমিকেরা তাদের ন্যায্য অধিকার ফিরে পাক। আজকে থেকে এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। হ
লেখক : শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
সেদিন এক বৃদ্ধ রিকশাচালক আক্ষেপ করে বললেন, আপনার মতো একজন ছাত্র আমাকে সারা ক্যাম্পাস ঘুরিয়ে তারপর ১০০ টাকা হাতে ধরিয়ে বিদায় করে দিলো। অথচ আমাকে...
