কৃষির প্রাণ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর (ডিএই)। প্রায় ৩ হাজার বিসিএস (কৃষি) ক্যাডার সদস্যসহ ২৬ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রশাসনিক কেন্দ্র রাজধানীর খামারবাড়ি। কিন্তু, ডিএই’র কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি, পদায়ন, পদোন্নতি খামারবাড়ির বাইরে থেকে নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। 

ক্ষমতাসীন কৃষক দল এবং অ্যাগ্রিকালচারিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এ্যাব)-এর কতিপয় নেতা বদলি-পদায়নে কলকাঠি নাড়ছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের প্রশাসন ও অর্থ উইং এবং মহাপরিচালকের দফতরের সংশ্লিষ্টরা নেতাদের তদবির বাস্তবায়নেই ব্যতিব্যস্ত থাকছেন বলে অভিযোগ। উপপরিচালক পদের একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা বিষয়টি স্বীকার করে অনেকটা হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘কী করব বলেন, আমরা অনেকটা অসহায়। বাইরের তদবিরে আমরা একেবারে নাজেহাল।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খামারবাড়ির ৫ম গ্রেডের এক কর্মকর্তা আক্ষেপ করে আরো বলেন, ‘মাঠে কারা ভালো কাজ করছেন বা মন্দ কাজ করছেন—এটা আমাদের নখদর্পণে। কিন্তু, খামারবাড়ির বাইরে থেকে এমন শক্তিশালী তদবির আসে যে, তা তামিল করা ছাড়া উপায় থাকে না। ফলে ভালো কর্মকর্তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী ভালো জায়গায় পদায়ন সম্ভব হয় না।’

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ক্ষমতাসীন কতিপয় কৃষিবিদ নেতাদের পক্ষ থেকে মাঠপর্যায়ের ৯ নম্বর গ্রেড থেকে শুরু করে, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা, জেলার ডিডি ও খামারবাড়ির গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নে জোরালো তদবির আসছে। প্রশাসন উইংকে তা বাস্তবায়নে চাপ দেন সংশ্লিষ্টরা। মাঝেমধ্যেই এই পদায়নে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ আসছে। বিশেষ করে খামারবাড়ির প্রশাসন উইং, উদ্ভিদ সংগনিরোধ ও উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১৮ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থ লেনদেনের অভিযোগ চাউর হয়েছে।

শুধু কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর নয়; ব্রি, বারিসহ কৃষি মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য দফতর-সংস্থাতেও একই নেতাদের হস্তক্ষেপ রয়েছে বলে অভিযোগ। এই বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি কৃষিমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ দফতরেও কথা উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে কৃষিমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টরা বিব্রত বলে জানা যায়।

এদিকে, সোমবার দ্বিতীয়বারের মতো রাজধানীর খামারবাড়ি সড়কের বিভিন্ন দেয়াল ও মেট্রো স্টেশনের খুঁটিতে ডিএইর তিন কর্মকর্তাকে ‘স্বৈরাচারের দোসর’ আখ্যা দিয়ে পোস্টার সাঁটানো হয়েছে। এতে ডিএইর টিস্যু কালচার প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক তালহা জুবায়ের মাশরুর, পরিকল্পনা উইংয়ের উপপরিচালক সাখাওয়াত হোসেন শরীফ ও প্রশাসন উইংয়ের উপপরিচালক মুরাদুল হাসানের ছবি দিয়ে তাদের অপসারণের দাবি জানানো হয়। পোস্টার লাগানো ও নামানোকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উত্তেজনাও তৈরি হয় বলে জানা যায়।

‘জাতীয়তাবাদী সচেতন কৃষিবিদ সমাজ’-এর ব্যানারে সাঁটানো পোস্টারে পিডি তালহা জুবায়ের মাশরুরের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ ও সাবেক কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাকের ঘনিষ্ঠ অনুসারী হওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। ২০২৪ সালের ৪ আগস্টের ‘শান্তি মিছিলে’ নেতৃত্ব ও অর্থ জোগান এবং অতীতে জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের কর্মকর্তাদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিরূপ মন্তব্য করার অভিযোগও করা হয়েছে।

তালহা জুবায়ের মাশরুর দাবি করেন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় সেখানে ছাত্ররাজনীতি করার পরিবেশ ছিল না। তিনি বলেন, ‘কে কোন দায়িত্বে থাকবেন, সেটি সরকারের সিদ্ধান্ত।’

পরিকল্পনা উইংয়ের উপপরিচালক সাখাওয়াত হোসেন শরীফের বিরুদ্ধে ছাত্রদল ও বিএনপিপন্থী পেশাজীবী রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত না থাকার পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘আস্থাভাজন’ হিসেবে জাতীয় কৃষি প্রযুক্তি প্রকল্পের (এনএটিপি) প্রকল্প পরিচালক হওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।

সাখাওয়াত হোসেন শরীফ বলেন, ‘আমি পটুয়াখালী কৃষি কলেজে পড়াশোনা করার সময় ছাত্রদলের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলাম। ক্যাম্পাসের আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্রদলের সম্মুখসারিতে ছিলাম। অথচ এখন আমাকে স্বৈরাচারের দোসর তকমা দেয়া হচ্ছে।’

অন্যদিকে, প্রশাসন উইংয়ের উপপরিচালক মুরাদুল হাসানের বিরুদ্ধে অতীতে জামায়াতপন্থী কৃষিবিদ ফোরামে যুক্ত থাকা এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবেক পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীকে ‘সোনার নৌকা’ উপহার দেয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। একই সাথে ডিএইর বদলি ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও আনা হয়েছে।

জানা যায়, মুরাদুল হাসান ছাত্রজীবনে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সদস্যও ছিলেন। ১৯৯৫ সালে ছাত্রদলের প্যানেল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হন।

এর আগেও এই তিন কর্মকর্তার ছবিসংবলিত পোস্টার টানানো হয় খামারবাড়ি সড়কে।

ডিএইর একাধিক কর্মকর্তা বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু কোনো প্রমাণ ছাড়াই রাজনৈতিক তকমা দিয়ে পোস্টার লাগানো মূলত গুরুত্বপূর্ণ পদ খালি করার কৌশল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কর্মকর্তাদের অভিযোগ, প্রকল্পের পিডিদের ওপর টেন্ডার নিয়েও চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেয়া, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার এবং বিভিন্ন সুবিধা আদায়ের চেষ্টা চলছে বলে তারা দাবি করেন। এতে রাজি না হলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিএনপিপন্থী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও ফ্যাসিস্টের সহযোগী তকমা লাগিয়ে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

তবে, এ্যাব-এর একজন নেতা বলেন, খামারবাড়িতে কেউ পিডি হতে, আবার কেউ পিডি পদ ধরে রাখতে নানাভাবে চেষ্টা করছেন। আবার প্রশাসন শাখার গুরুত্বপূর্ণ পদ ধরে রাখতে কিংবা ওই পদে যেতেও তৎপরতা রয়েছে। এক্ষেত্রে কেআইবি কিংবা কৃষক দল ও এ্যাব কেন্দ্রিক নেতাদের দোষ আসছে।

ওই নেতা বলেন, ‘মুরাদুল হাসান সরাসরি ছাত্রদলের রাজনীতি করেছেন। সাখাওয়াত হোসেন শরীফও বিএনপিমনা কর্মকর্তা। সুকৌশলে তাদের নামও রাখা হয়েছে পোস্টারে। এতে বোঝা যায়, কেউ কেউ সুযোগ নিতে চাচ্ছেন। অনেকে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চাচ্ছেন।’

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক আব্দুর রহিম বলেন, ‘কে বা কারা পোস্টার লাগিয়েছে তা এখনো শনাক্ত করা যায়নি। ‘যারা এ কাজ করেছে তারা মোটেই ঠিক করেনি। বিষয়টি প্রশাসনের নজরে রয়েছে।’

কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, ‘সরকারি চাকরিতে বদলি কিংবা পদায়ন নিয়ম মেনেই করা হয়। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ হওয়ার আগে তাকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ আখ্যা দিয়ে ছবি টানিয়ে হেয় করা বা অন্য মাধ্যমে প্রচারণা চালানো অন্যায়। তিনি বলেন, ‘আমরা বিষয়টি নজরে রাখছি।’