মীর মোকাম্মেল আহছান
ফুটবল ইতিহাসের বর্ণিল অধ্যায় ও অন্যতম দীর্ঘ পথের ইতি টানতে যাচ্ছেন লিওনেল মেসি। আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নামবেন ৩৯ বছর বয়সী এই মহাতারকা। দুই দশকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে অসংখ্য রেকর্ড, শিরোপা, ব্যক্তিগত পুরস্কার আর আবেগঘন মুহূর্তের জন্ম দেয়া বিশ্বকাপজয়ী তারকার জন্য তৈরি হচ্ছে বিদায়ের মঞ্চ। বুয়েন্স আয়ার্সের এস্তাদিও মনুমেন্তালে বেনিনের বিপক্ষে কাল ভোর ৫টায় প্রীতিম্যাচে আকাশি-নীল জার্সি গায়ে চাপিয়ে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ২০৮তম এবং শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে নামবেন মেসি।
আর্জেন্টিনার জাতীয় দলে ২০০৫ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে অভিষেক হয়েছিল মেসির। হাঙ্গেরির বিপক্ষে ম্যাচে অভিষেক হয়েছিল তার লাল কার্ডের তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। সেই থেকে শুরু দীর্ঘ পথচলার। প্রথম দিকে জাতীয় দলের জার্সিতে তার পারফরম্যান্স নিয়ে সমালোচনা ছিল, বিশেষ করে যেভাবে ক্লাব পর্যায়ে বার্সেলোনার জার্সি গাঁয়ে চাপিয়ে বেড়াতেন এই খুদে তারকা, সেভাবে আর্জেন্টিনার জার্সিতে কেন প্রভাব ফেলতে পারছেন না- এ প্রশ্ন উঠত বারবার। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হার, ২০১৫ ও ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে পরাজয়- একসময় মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার যেন অপূর্ণতার গল্প হয়ে উঠেছিল। এমনকি ২০১৬ সালে তিনি জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন। পরে ফিরে এসে বদলে দেন পুরো গল্প।
সেই অপেক্ষার অবসান ২০২১ সালে। ব্রাজিলের মাটিতে কোপা আমেরিকার ফাইনালে সেলেকাওদের হারিয়ে প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জেতেন মেসি। এরপর ২০২২ সালে ইতালিকে হারিয়ে ফিনালিসিমা জেতার পর আসে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্য- কাতার বিশ্বকাপ। ফ্রান্সের বিপক্ষে মহাকাব্যিক ফাইনালে দুই গোল করে এবং টাইব্রেকারে গোল করে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেন আলবিসেলেস্তেদের মহাতারকা। ২০২৪ সালে আরো একবার কোপা আমেরিকা জিতে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে সাফল্যের মুকুট পূর্ণ করেন। তবে এর আগে যুব বিশ্বকাপে ২০০৫ সালে স্বর্ণ জয় ও অলিম্পিক স্বর্ণ জয়ও আছে ২০০৮ সালে। যদিও শেষ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ ব্যবধানে হেরে কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল মেসিকে। ফাইনালে ব্যর্থ হলেও এর আগ পর্যন্ত ৮ গোল করে শিরোপা ধরে রাখার মিশনে সামনে থেকে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। 
জাতীয় দলের হয়ে মেসির পরিসংখ্যানও মহত্ত্বের সাক্ষ্য দেয়। ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল এবং ৬৮ অ্যাসিস্ট নিয়ে তিনি আর্জেন্টিনার সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা ফুটবলার। দক্ষিণ আমেরিকার জাতীয় দলগুলোর মধ্যেও তার ২০৭ ম্যাচের রেকর্ড অনন্য। বিশ্বকাপে খেলেছেন রেকর্ড ছয়টি আসর-২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ ও ২০২৬। বিশ্বকাপে তার ম্যাচসংখ্যা ৩৪- যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ। একই সাথে পাঁচটি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করা আর্জেন্টিনার প্রথম এবং একমাত্র খেলোয়াড় এবং বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকে ফাইনাল- সব ধাপেই গোল করা একমাত্র ফুটবলার তিনি।
বিশ্বকাপের গোলের রেকর্ডেও জার্মানির মিরোসøাভ ক্লোসাকে পেছনে ফেলে শীর্ষে জায়গা করে নিয়েছিলেন মেসি। ২০২৬ বিশ্বকাপে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে গোল করে তিনি মিরোসøাভ ক্লোসেকে ছাড়িয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। ফুটবলের মেগা আসরে তার মোট গোলসংখ্যা ২১টি। তবে এক গোল বেশি নিয়ে এই মুহূর্তে শীর্ষে রয়েছেন ফ্রান্সের ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপ্পে। শুধু তাই নয়, বিশ্বকাপে সর্বাধিক ২৩টি ম্যাচ জয়ের রেকর্ডও তার। বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার গোল্ডেন বল জিতেছেন দুইবার- ২০১৪ ও ২০২২ সালে।
ক্লাব ফুটবলেও মেসির রেকর্ডের তালিকা আরো দীর্ঘ। বার্সেলোনার হয়ে ৭৭৮ ম্যাচে ৬৭২ গোল করেছেন তিনি। কাতালান ক্লাবটির সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে চারটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগসহ অসংখ্য শিরোপা জিতেছেন। বার্সার হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে তার গোল ১২০টি। যা একটি ক্লাবের হয়ে এই প্রতিযোগিতায় সর্বোচ্চ। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের এক ম্যাচে চার গোল, এক নকআউট টাইয়ে ছয় গোল এবং এক নকআউট ম্যাচে পাঁচ গোল করার মতো রেকর্ডও তার দখলে।
লা লিগায় মেসির আধিপত্য ছিল আরো বিস্ময়কর। ৪৭৪ গোল নিয়ে তিনি প্রতিযোগিতাটির সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। এক মৌসুমে সর্বোচ্চ ৫০ গোল, সবচেয়ে বেশি ৩৬ হ্যাটট্রিক, সর্বাধিক আটটি পিচিচি এবং বিদেশী খেলোয়াড় হিসেবে সবচেয়ে বেশি ১০টি লিগ শিরোপা- সবই মেসির রেকর্ডের অংশ। ২০১২ সালে ক্লাব ও জাতীয় দল মিলে এক বছরে ৯১ গোল করার কীর্তিও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত রেকর্ড।
ব্যক্তিগত পুরস্কারের হিসাবেও মেসি সবার ওপরে। আটটি ব্যালন ডি’অর তার দখলে, যা সর্বোচ্চ। ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু জিতেছেন ছয়বার। ২০২৩ সালে ইউরোপের ফুটবল ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাব ইন্টার মিয়ামিতে যোগ দেয়ার পরও থামেনি তার রেকর্ড-ভাঙার গল্প। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ক্রুজ আজুলের বিপক্ষে গোল করে ইন্টার মিয়ামির হয়ে ১০০ গোল পূর্ণ করেন তিনি- যা তাকে ক্লাবটির ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড়ের জায়গায় আসিন করে। মিয়ামির হয়ে জিতেছেন লিগস কাপ, সাপোর্টার্স শিল্ড এবং ২০২৫ সালের এমএলএস কাপ। টানা দুই মৌসুম এমএলএসের এমভিপি হওয়া প্রথম খেলোয়াড়ও তিনি।
আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে আগেই অবসর নিয়েছেন মেসি। তবে তার সম্মানে আয়োজন করা হচ্ছে বিদায়ী ম্যাচ। সেই ম্যাচে সবশেষ ঘরের মাঠে খেলবেন বেনিনের বিপক্ষে। মনুমেন্তালে অনুষ্ঠিত ম্যাচটি হবে আর্জেন্টিনা ও বেনিনের প্রথম মুখোমুখি লড়াই। আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে মেসির জন্য এটি বিদায়ের রাত আর পশ্চিম আফ্রিকার দলটির জন্য ম্যাচটি ঐতিহাসিক। প্রায় ৮৫ হাজার দর্শকের সামনে তার পাশে থাকবেন ২০২২ বিশ্বকাপজয়ী সতীর্থদের অনেকে এবং আর্জেন্টিনার নতুন প্রজন্মের ফুটবলাররা।
মেসি ৩১ আগস্ট জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন। নিজের বিদায়ী বার্তায় তিনি জানান, সিদ্ধান্তটি তার জন্য অত্যন্ত কষ্টের হলেও মনে করছেন সময় এসে গেছে। তিনি বলেছেন, জাতীয় দলের জার্সির জন্য সবসময় নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছেন এবং এখন সুযোগ দেয়ার উপযুক্ত সময় নতুন প্রজন্মকে।
বেনিনের বিপক্ষে এটি শুধুই একটি প্রীতিম্যাচ নয়, মেসির সাথে আর্জেন্টিনার দীর্ঘ সম্পর্কের শেষ অধ্যায়। যে মেসিকে একসময় জাতীয় দলের ব্যর্থতার দায় নিতে হয়েছিল, সেই মেসিই শেষ পর্যন্ত দেশকে বিশ্বকাপ, দু’টি কোপা আমেরিকা ও ফিনালিসিমার শিরোপা এনে দিয়েছেন। তার বিদায়ের সাথে শেষ হবে একটি প্রজন্মের গল্প- তবে রেকর্ড, শিরোপা আর ফুটবলের ওপর রেখে যাওয়া প্রভাবের কারণে মেসির গল্প শেষ হওয়ার নয়।