বিদ্যালয়ে শিক্ষকের হাতে শিক্ষার্থীর নির্যাতিত হওয়ার ঘটনা প্রায়ই শোনা যায়। জাতিসঙ্ঘ শিশু অধিকার সনদের ৩৭ নম্বর অনুচ্ছেদে শিশুর ওপর নির্যাতন বা নৃশংসতা, অমানবিক, মর্যাদাহানিকর আচরণ বা নির্যাতন না করার বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে।
২০১১ সালের ২১ এপ্রিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি রহিত করা সংক্রান্ত নীতিমালা-২০১১ প্রণয়ন করা হয়। নীতিমালায় বলা হয়েছে, দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু অধিকার সংরক্ষণ ও শিশুদের মানসিক বিকাশে সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতকরণে সরকার বদ্ধপরিকর। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তির ফলে এক দিকে যেমন শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হয়, অন্য দিকে ছাত্রছাত্রীদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়। শারীরিক ও মানসিক শাস্তি রহিত করা হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আনন্দঘন পরিবেশ বজায় থাকবে এবং শিশুরা সুন্দরভাবে গড়ে উঠবে। তাই সরকার কর্তৃক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি রহিত করাসংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন করে।
প্রশ্ন হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি রহিত করাসংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন করার পরেও পরিস্থিতির উন্নতি কী হয়েছে? এর জবাব না। ২২ জানুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জ ভোলাহাট উপজেলার বড়গাছি সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগের দশম শ্রেণীর ছাত্র রুহানকে ২০ জানুয়ারি স্কুল সরকারিকরণ উৎসবে কে বা কারা সাবেক এমপি গোলাম মুস্তফা বিশ^াসের ফেস্টুনে টাঙানো ছবির গলা কেটে দেয়ার অভিযোগে দুই হাত পেছনে বেঁধে তাকে লাঠি দিয়ে বেধড়ক পেটান প্রধান শিক্ষকসহ অন্য শিক্ষকেরা। লাঠি ভেঙে গেলে আরো একটি লাঠি দিয়ে পেটাতে থাকেন। এ ঘটনা স্বীকার না করলে তাকেসহ পরিবারের সবাইকে জেলহাজতে পাঠিয়ে জীবন নষ্টের হুমকি দেন। ২৪ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার নাচোল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের পড়ালেখা নিয়ে সপ্তম শ্রেণীর এক ছাত্রকে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। তার শরীরে সাতটি সেলাই দিতে হয়েছে বলে জানান চিকিৎসক। ২২ জানুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে সবুজছায়া স্কুলে পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী মাহমুদা খাতুনকে (১১) শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়।
দেশের প্রচলিত নারী নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী শিশুদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং এ আইন অনুযায়ী শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার্থী নির্যাতন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিশ্বের সব দেশেই এ আইন কঠোরভাবে মানা হয়। মূলত শিক্ষা, শিক্ষাঙ্গন, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী এ শব্দগুলোর সাথে নির্যাতননামক কোনো শব্দই জড়িত থাকা উচিত নয়।
সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করার পরও বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের শারীরিক নির্যাতন বন্ধের ক্ষেত্রে খুব বেশি অগ্রগতি দেখা যায় না, শিক্ষক যাতে শিশুদের মনস্তত্ত্ব বুঝতে পারে, এজন্য তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া যেতে পারে। গণমাধ্যম এ ক্ষেত্রে রাখতে পারে ইতিবাচক ভূমিকা। জুনিয়র শিক্ষকদের ভেতর এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োগে বিদ্যালয়ের অভিজ্ঞ ও জনপ্রিয় শিক্ষকেরা রাখতে পারেন অনবদ্য ভূমিকা। শিশুরা বিদ্যালয়ে নির্ভয়ে যাক, আনন্দের সাথে শিক্ষার্জন করুক আর শাস্তিমুক্ত বিদ্যালয় শিক্ষালাভে সহায় হয়। আজকের সেøাগান হোকÑ ‘শিশুর জন্য বেত ছাড়ি, সৃজনশীল বাংলা গড়ি, আদর আর ভালোবাসাÑ দিতে পারে সুশিক্ষা; শিখবে শিশু হেসে খেলেÑ শাস্তিমুক্ত পরিবেশ পেলে।’ শিক্ষকেরা তাদের পাশে থাকুন মমতাময় অভিভাবকের স্নেহ নিয়ে, এটাই প্রত্যাশা। হ
শিক্ষার্থী : ভোলাহাট মোহবুল্লাহ মহাবিদ্যালয়, চাঁপ্ইানবাবগঞ্জ।