এ ইউ দৌলা
বাঙালি জাতির মনস্তাত্ত্বিক ইতিহাসে এক অসাধারণ ও বিপ্লবাত্মক ঘটনার সাক্ষী হয়ে রইল দিনটি। প্রকৃত স্বাধীনতা লুকিয়ে থাকে জাতির মানসিক স্বাধীনতা অর্জনের মাঝে। আসলে শেকলবন্দি মানুষ পরাধীন নয়; বরং যারা মানসিক পরাধীনতায় অভ্যস্ত, তারাই সত্যিকারের কারাবাসী।

তাই ৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ থেকে পরিপত্রের মাধ্যমে মহামান্য ও মাননীয় শব্দগুলোর দাফতরিক ব্যবহারকে নিষিদ্ধ করার আদেশ জারির ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে একটি ছোট প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত মনে হলেও, দিনটি মূলত আমাদের জাতিসত্তার এক গভীর পুনর্জাগরণের সূচনা।

এই যুগান্তকারী পরিবর্তনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আজ গভীর আনন্দ অনুভব করছি এই বিশ্বাসে যে, বাঙালি মুসলিম সমাজ অবশেষে ইসলামকে তার মৌলিক চেতনায় উপলব্ধি করতে শুরু করেছে। কেন এ কথা বলছি, তার একটি তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরছি।

ঔপনিবেশিক মাইন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ও ভাষাগত মনস্তত্ত্ব
আমাদের সমাজে মান, মর্যাদা, সম্মান ও প্রশংসা অর্জনের যে মাপকাঠি দীর্ঘকাল ধরে শিকড় গেড়ে বসেছে, তা মূলত ঔপনিবেশিক শিক্ষা ও শাসন ব্যবস্থার ফসল। সত্যিকার সম্মান যে আত্মসম্মান, সেটা ভুলিয়ে দিয়ে ঔপনিবেশিক শাসকরা আমাদের পূর্বপুরুষদের ভুলভাবে শিখিয়ে দিয়েছিল যে, অন্যের কাছ থেকে পাওয়া সম্মান ও প্রশংসাই হল তোমাদের আসল মর্যাদা।

এই মনস্তাত্ত্বিক কৌশল বাস্তবায়নের জন্য তারা এমন কিছু শব্দের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছিল, যার গভীর প্রভাবে মানুষের অবচেতন মন পরাধীন হয়ে পড়ে। ভাষার এই মনস্তত্ত্ব বা লিঙ্গুইস্টিক সাইকোলজি খুব সূক্ষ্মভাবে কাজ করে। একটি ছোট উদাহরণে বিষয়টি পরিষ্কার হবে— ধরুন, আপনার বন্ধু এবং সহকর্মীরা সকলে মিলে আপনাকে একটি কল্যাণ সমিতির সভাপতি নির্বাচিত করলেন। এরপর আপনার সাথে দেখা হলে তারা বললেন, ভাই, আপনি তো এখন অনেক ক্ষমতাবান! কেউ বললেন, আপনি তো এখন ক্ষমতার চেয়ারে, কেউ হয়ত বললেন, সভাপতির অনেক ক্ষমতা। কিন্তু এর গভীরে কি হচ্ছে জানেন? যে আপনি অত্যন্ত ভালো মানুষ, চুপচাপ একাকি নিজের মতো জীবন যাপন করতে ভালবাসেন সেই আপনার মাঝেই মাইন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং শুরু হবে। বারবার এই ‘ক্ষমতা’ শব্দটি শুনতে শুনতে আপনার অবচেতন মনে একসময় সত্যি সত্যিই বিশ্বাস জন্মাতে শুরু করবে যে আপনি ক্ষমতাধর। আর এই অনুভূতি আপনার মাঝে কর্তৃত্বপরায়ণ আচরণ তৈরি করবে।

এবার ধরুন অন্য দৃশ্যপট; আপনি সেই কল্যাণ সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হওয়াতে চারপাশের মানুষরা আপনাকে ক্ষমতাধর না বলে তারা আপনাকে নতুন দায়িত্ব নেয়ার দায়িত্বশীল হিসেবে সম্বোধন করলেন। তারা বললেন, ভাই আপনি তো নতুন বড় দায়িত্ব পেয়েছেন। এমন হলে সেই শব্দচয়ন আপনার অন্তরে অহংকার না জাগিয়ে বরং আপনাকে আরো বিনয়ী, দায়িত্ববান ও কর্তব্যপরায়ণ করে তুলবে। শব্দের শক্তি এভাবেই মানুষের মনকে নিয়ন্ত্রণ করে। নিয়ন্ত্রণের কৌশল হিসেবে ঔপনিবেশিক শাসকরা এ দেশের সাধারণ মানুষের মাইন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং করার জন্যই রাজা-বাদশাহ ও আমলাদের ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু শব্দের অভ্যাস আমাদের সংস্কৃতিতে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। যখনই কেউ বলত, মহামান্য রাজা বা মাননীয় কোতোয়াল, তখন সাধারণ মানুষের অন্তর অবচেতনভাবেই সেই ক্ষমতার প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্যের মানসিকতা তৈরি করে নিত।

কিন্তু এটা তো ইসলামের শিক্ষা নয়। কৃত্রিম বিভাজনমূলক ব্যবস্থার বিপরীতে ইসলাম ধর্ম সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বৈপ্লবিক এক দর্শনের জীবন দিয়েছে। পবিত্র কুরআনের প্রথম সূরার শুরুতেই আমরা পড়ি, ‘আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামিন’— সকল প্রশংসা, সম্মান ও মহিমা কেবল বিশ্ব জাহানের মালিক আল্লাহর জন্য। যখন আমরা নামাজের মধ্যে বলি আত্তাহিয়াতু লিল্লাহি (সকল সুন্দর সুন্দর অভিবাদন কেবল আল্লাহর জন্য) কিংবা রব্বানা লাকাল হামদ (হে আল্লাহ, সমস্ত মর্যাদা ও প্রশংসা কেবল আপনার জন্য) তখন প্রতিদিন আমরা এই সত্যটিই নিজেদের অন্তরকে বুঝিয়ে দেই যে— প্রশংসা, সম্মান ও মর্যাদা কেবল একমাত্র আল্লাহর জন্য। এর অর্থ দাঁড়ায়, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারোর জন্য কোনো প্রশংসা, সম্মান ও মর্যাদা নেই; মানুষের মাঝে কৃত্রিমভাবে আলাদা কোনো বড়-ছোট বা উঁচু-নিচু মর্যাদার ব্যবস্থা নেই। আমাদের কেউ কারো থেকে ছোট নয়, আবার কেউ কারো থেকে বড় নয়, আদম সন্তান হিসেবে আমাদের সকলেরই একই মর্যাদা, আমরা প্রত্যেকেই কেবল একজন পরীক্ষার্থী; এটিই আমাদের সর্বজনীন পরিচয়।

এখানেই প্রশ্ন, যে ইসলামের মৌলিক শিক্ষাই হল সবাই সমান, সেই মুসলিম সমাজে নিজেদের মধ্যে মর্যাদা, সম্মান ও প্রশংসার এমন অসম বিস্তার ঘটল কীভাবে? কীভাবে মুসলমানরা মর্যাদার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে ক্ষমতা, সম্পদ, বাড়ি, গাড়ি ও গহনা প্রদর্শনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ল?

এর মূলে রয়েছে মানুষের আদিম প্রবৃত্তি (ইনস্টিনক্ট) এবং ঔপনিবেশিক কৌশল। বাইবেলের শিক্ষা অনুযায়ী, সম্পদ অর্জন করা এবং ধনী হওয়া হলো খ্রিস্টীয় অনুসারীদের একটি পবিত্র ধর্মীয় দায়িত্ব। তাদের বিশ্বাস, মহান আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন ও পছন্দ করেন, তাকেই তিনি ক্ষমতা, মর্যাদা, ধন-সম্পদ ও অপরিসীম রিজিক দান করেন। এই ধারণার বশবর্তী হয়ে তারা মনে করেন যে, ধনী ও ক্ষমতাবান হওয়া মানেই আল্লাহর প্রিয়ভাজন হওয়া। তাই ঔপনিবেশিক শক্তি যখন মুসলিম দেশগুলো দখল করল, তখন তারা এই মানসিকতাকে ছড়িয়ে দিতে সব ধরণের ব্যবস্থা করল। তারা মানুষকে ধনী ও ক্ষমতাধর হওয়ার জন্য প্ররোচিত করতে লাগল।

কিন্তু অর্থনীতির একটি ধ্রুব সত্য হলো, ধনী বা ক্ষমতাবান হওয়া একটি আপেক্ষিক ব্যাপার; সকলেই ধনী কিংবা সকলেই ক্ষমতাবান হওয়া সম্ভব নয়, অর্থাৎ সমাজে কেউ ধনী বা ক্ষমতাবান হতে হলে সমাজের কিছু মানুষকে অবশ্যই গরিব ও দুর্বল করে রাখতেই হবে। তাই তারা সম্পদ ও ক্ষমতার প্রদর্শনকে উৎসাহ দিতে লোক দেখানো প্রতিযোগিতাকে উসকে দেয়ার ব্যবস্থা করল। একজনের সম্পদ ও ক্ষমতা দেখে অন্যজন যেন সেটা পাওয়ার চেষ্টা করে, অর্থাৎ তারা মর্যাদা, সম্মান, প্রশংসা শব্দের ব্যবহার দিয়ে মানুষের অন্তরে অভাব আর লোভের প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে দেয়ার শিক্ষা চালু করল। এভাবেই ঔপনিবেশিক শক্তি সাধারণ মানুষকে নিয়ন্ত্রণ ও শোষণের কৌশল হিসেবে ধন-সম্পদ, জাঁকজমক ও প্রদর্শন এবং সেসবের প্রতিযোগিতার মোটিভেশনকে আমাদের সংস্কৃতিতে পরিণত করে দিল। আর অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে, মুসলমানরা তাদের মৌলিক শিক্ষা ভুলে গিয়ে ঔপনিবেশিক শক্তির এই সুচতুর কৌশলের ফাঁদে বন্দি হল।

আজ মুসলমানগণ নিয়মিত কোরআন পড়েন, নামাজ আদায় করেন; কিন্তু অনেকেই জানেন না যে তারা আসলে কী পড়ছেন বা কোরআনের বাণীর মাঝে মহান আল্লাহ জীবন ও জাতির কল্যাণের জন্য কী সুগভীর প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা লুকিয়ে রেখেছেন। ঔপনিবেশিক শাসকরা মুসলিমদের এই অজ্ঞতার পূর্ণ সুযোগ নিয়ে মুসলিম সমাজে ক্ষমতা, সম্পদ ও লোক দেখানোর প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে দিল। ফলে সৃষ্টি হলো মানুষে মানুষে কৃত্রিম শ্রেণিভেদ, মর্যাদার বৈষম্য এবং ধনী-গরিব, অভিজাত ও অনভিজাতের সীমারেখা। ইসলাম যেখানে সব মানুষকে সমান মর্যাদা দিয়েছে এবং সমস্ত শ্রেণিবিভেদ লুপ্ত করেছে, সেখানে ইসলামের নামেই আবার ফিরে এল নানা প্রতিযোগিতা, নানা শ্রেণি আর সম্মানের নানা রকম স্তর। আর আমরা বলতে শুরু করলাম, হিজ এক্সেলেন্সি, হার এক্সেলেন্সি এবং বাংলায় তার অনুবাদ হলো মহামান্য, মাননীয়।

একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই বোঝা যায়, ইসলামের মৌলিক বানীর শিক্ষায় একটি রাষ্ট্রের সকল নাগরিক যখন এই বিশ্বাসে উদ্বুদ্ধ হন যে, এখানে কেউ কারো চেয়ে শ্রেষ্ঠ বা অধিক সম্মানের অধিকারী নয়, কেউ তখন সেরা ধনী হওয়ার প্রতিযোগিতা করে না, কেউ তখন ক্ষমতার লড়াই করার ইচ্ছে করে না, কেউ তখন কৃত্রিম সম্মান অর্জনের জন্য অযথা প্রতিযোগিতা করে না, কারো মাঝে নিজেকে সেরা প্রমাণ করার মিথ্যা অহংকার থাকে না। আর এমন হলে সেই সমাজে দুর্নীতি, হানাহানি, শঠতা ও প্রতারণা চিরতরে বিদায় নেয়; সমাজ হয়ে ওঠে প্রকৃত শান্তির ঠিকানা। ইসলামের মূল বাণী যে ‘শান্তি’, এই ধর্ম বিশ্বাস এভাবেই মানবজাতির জন্য শান্তির ইঞ্জিনিয়ারিং করে।

তাই, একজন মুসলিম সন্তান হিসেবে আজ অত্যন্ত আনন্দচিত্তে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি সেই দূরদর্শী মানুষগুলোর প্রতি, যারা বাঙালি জাতিকে মনস্তাত্ত্বিক পরাধীনতা থেকে মুক্ত করার জন্য ‘মহামান্য বা মাননীয়’-এর মতো দাসত্বমূলক শব্দগুলো বর্জন করার সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছেন, যারা এই শব্দগুলোর ব্যবহার বাদ দেয়ার জন্য নিজেদের মাঝে আলোচনা করছেন এবং যারা একে অপরকে এর গুরুত্ব বুঝিয়েছেন।

আর একই সাথে তাদের প্রতি বিনীত নিবেদন, আমাদের জাতিসত্তাকে আরো নানা প্রকার মানসিক দাসত্ব থেকে মুক্ত করার জন্য বিজ্ঞ মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মাধ্যমে সংস্কৃতির গভীরে লুকিয়ে থাকা বিষগুলোকে চিহ্নিত করে তা অপসারণের ব্যবস্থা গ্রহণের। এটা গভীর আত্মোপলব্ধির প্রয়োজন যে, স্বাধীনতার ৮০ বছর পরও কেন আমরা আজো সরকারি, বেসরকারি এমনকি নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনেও ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা, তাদের নিয়ম, তাদের পোশাক ও তাদের শিখিয়ে দেয়া প্রথা থেকে পুরোপুরি বের হয়ে নিজেদের উপযোগী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারছি না? তার মূল কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।

(মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক)