বহুল আলোচিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন বিলম্বিত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। পরিকল্পনায় নানা পরিবর্তন, ভূরাজনৈতিক টানাপড়েন ও অর্থায়নের জটিলতায় প্রকল্পটি বছরের পর বছর ঝুলে আছে। চলতি বছর কাজ শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে জানা গেল, মূল নির্মাণকাজ শুরুর আগে আরেকটি কারিগরি সমীক্ষা চালাবে সরকার। ২৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সমীক্ষা চলতি বছরে শুরু হবে। ২০২৮ সালের মাচে তা শেষ হবে। ফলে বহুল প্রতীক্ষিত এ প্রকল্পের মূল নির্মাণকাজ কিংবা ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ২০২৯ সালের আগে সম্ভব হবে না। নতুন সমীক্ষায় প্রকল্পের প্রতিটি অংশের কারিগরি ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা আলাদাভাবে যাচাই করা হবে এবং এর সুপারিশের ভিত্তিতে মূল প্রকল্পের কাজ হাতে নেয়া হবে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেছেন, সমীক্ষা শেষে আগামী অর্থবছরে তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু হবে।  
তিস্তা পরিকল্পনা উত্তরাঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দু। ক্ষমতাসীন বিএনপির সুনির্দিষ্ট নির্বাচনী অঙ্গীকার আছে এই বিষয়ে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে সাড়ে সাত লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা দেয়া যাবে এবং বছরে এক কোটিরও বেশি মানুষ বন্যার তাণ্ডব থেকে রক্ষা পাবে। উত্তরাঞ্চলের মানুষ দীর্ঘকাল ধরে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবিতে লাগাতার আন্দোলন চালিয়ে আসছেন। কিন্তু ২০১৬ থেকে চলতি বছর পর্যন্ত নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে এগুলোও বাস্তব সত্য এটিই যে, মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়নি।
২০১৬ সালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড একটি চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সাথে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করে। ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠানটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষাও সম্পন্ন করে। কিন্তু প্রকল্প ঘিরে চীন ও ভারতের অবস্থান, বাজেট ও পরিবেশগত প্রভাবের কারণে প্রক্রিয়াটি থমকে যায়। ২০২৪ সালেও ভারত এ প্রকল্পে অর্থায়নের আগ্রহ দেখায়। অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ৩০ জুন প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের নীতিগত অনুমোদন দেয়। সেই সাথে চীনের কাছে প্রয়োজনীয় ঋণ চায়। সম্প্রতি প্রকল্পটি চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) অন্তর্ভুক্তির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য মতে, চীন নতুন সমীক্ষার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে কারিগরি সহায়তা দিতে সম্মত হয়েছে। 
বলা হচ্ছে, তিস্তাপারের মানুষের দুর্ভোগের স্থায়ী ও টেকসই সমাধান নিশ্চিত করতে নতুন করে সমীক্ষার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সমস্যা হলো— এ দেশে কোনোরকম সমীক্ষা ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নের রেকর্ড যেমন আছে, তেমনি সমীক্ষার নামে দীর্ঘসূত্রতার ঘটনাও কম নয়। এ কারণে নতুন সমীক্ষার সিদ্ধান্ত জনমনে সংশয় সৃষ্টির কারণ হতে পারে। 
বিশেষজ্ঞরাও নতুন করে সমীক্ষার পক্ষে মত দিচ্ছেন। মানারাত আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. আব্দুর রব বলেছেন, মূল কাজ শুরুর আগে এ সমীক্ষা ভবিষ্যতের জন্য অধিকতর সুফল বয়ে আনবে।
আমরা আশা করব, বিপুল জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ লাঘব এবং কৃষিক্ষেত্রে অমিত সম্ভাবনাময় এ প্রকল্পের বিষয়ে কোনোরকম দীর্ঘসূত্রতার আশ্রয় নেয়া  যেন আর না হয়। দ্রুততম সময়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।