আজকের পত্রিকা

হাজার কোটি টাকার মাশরুমের বাজার দেশে

হাজার কোটি টাকার মাশরুমের বাজার দেশে
হাজার কোটি টাকার মাশরুমের বাজার দেশে

মাশরুম একটি পুষ্টিকর সুস্বাদু ও ঔষুধিগুণসম্পন্ন ফসল। দেশে বাড়ছে মাশরুমের উৎপাদন। বড় হচ্ছে মাশরুমের বাজার। তৈরি হচ্ছে হাজার হাজার চাষি-উদ্যোক্তা। ২০০৬-০৭ অর্থবছরের দিকে দেশে মাশরুমের উৎপাদন ছিল প্রায় ৩ হাজার টনের মতো। বিগত ১৭ বছরে এটি প্রায় ৬ গুণ বেড়ে ৪০ হাজার টনে ঠেকেছে। প্রকারভেদে মাশরুমের কেজি ২০০ টাকা থেকে ১০-১৫ হাজার টাকা। তবে, বেশির ভাগ বিক্রি হয় ২০০ টাকা কেজিতে। গড় মূল্য ২৫০ টাকা ধরলে ৪০ হাজার টন মাশরুমের বাজারমূল্য আসে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। উৎপাদন বাড়লেও চাহিদার তুলনায় তা কম। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশে ১৭ কোটি জনসংখ্যা হিসেবে প্রতিদিন মাত্র ২৫ গ্রাম করে মাশরুম খেলেও বছরে প্রায় সাড়ে ১৫ লাখ টন মাশরুমের প্রয়োজন। আর ১০ শতাংশ মানুষও যদি মাশরুম খান তাহলে প্রতিদিন দরকার ৪৫০ টন মাশরুম।

ঔষধিগুণসম্পন্ন মাশরুমের রয়েছে অপার সম্ভাবনা : খাদ্য হিসেবে মাশরুম অতুলনীয়। প্রাচীনকাল থেকেই এটি পুষ্টিসমৃদ্ধ, সুস্বাদু ও ঔষধিগুণসম্পন্ন দামি খাবার হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু অন্যান্য সবজির মতো মাশরুম মাটিতে জন্মায় না। জীবন ধারণের জন্য এরা জৈবিক বস্তু থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করে। বাংলাদেশে জমির অপ্রতুলতা, বেকারত্ব, পুষ্টিহীনতা, মাথাপিছু আয়ের স্বল্পতা, কর্মসংস্থান-সর্বোপুরি দারিদ্র্য বিমোচন বিবেচনায় মাশরুম একটি অমিত সম্ভাবনার ফসল। বিপুল জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশে পুষ্টি নিরাপত্তায় মাশরুমের অপরিহার্যতা রয়েছে। বিগত পাঁচ দশকে দেশের কৃষি খোরপোস থেকে বাণিজ্যিক কৃষিতে পরিণত হয়েছে। কৃষিকে এখন রফতানিমুখী করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রেও মাশরুম একটি গুরুত্বপূর্ণ ফসল বা কৃষিপণ্য হয়ে উঠতে পারে। দেশে বিভিন্ন ফসল ফলাতে জমি বিশেষ করে আবাদযোগ্য জমির প্রয়োজন হয়। সেক্ষেত্রে মাশরুম চাষে কৃষিজমি সংরক্ষণ করা সম্ভব। এ দেশের আবহাওয়া মাশরুম চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। অমিত সম্ভাবনার ফসল মাশরুম চাষের জন্য কোনো উর্বর জমির প্রয়োজন হয় না। ঘরের ভেতর বা ঘরের পাশের অব্যবহৃত জায়গা বা বারান্দায় মাশরুম চাষ করা যায়। মাশরুমের বহুমুখী ব্যবহার কৃষি অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

মাশরুম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে যে, মাশরুম টিউমার নিরাময় করে, উচ্চ রক্তচাপ কমায় এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে। শুধু এসব রোগীই যদি নিয়মিত ৫০ গ্রাম করে মাশরুম খান তাহলে বিপুল পরিমাণ মাশরুম প্রয়োজন হবে। সেই মাশরুমের জোগান দেয়ার মতো উৎপাদন এখনো দেশে নেই।

মাশরুমকেন্দ্রিক গড়ে উঠছে সফল উদ্যোক্তা : দীর্ঘদিন প্রবাস জীবন কাটিয়ে দেশে আসেন মো: জহিরুল ইসলাম। ঢাকার অদূরে ধামরাই উপজেলার কুল্লা ইউনিয়নের আড়ালিয়া গ্রামের সন্তান তিনি। দেশে ফিরে জীবনের বাকি দিনগুলো কোন পেশায় পার করবেন, সিদ্ধান্তহীনতায় কেটে যায় কিছু সময়। ২০১৭ সালে সিদ্ধান্ত নেন কৃষি উদ্যোক্তা হবেন। সাভারে হর্টিকালচার সেন্টারে প্রশিক্ষণ নিতে যান। সেখানে পরিচয় হয় মাশরুম চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন ও দারিদ্র্য হ্রাসকরণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক কৃষিবিদ ড. মোছা: আখতার জাহান কাঁকনের সাথে। ২০০ টাকা দিয়ে মাশরুমের প্যাকেট কিনে ঘরের কোণে সখেরবসে চাষ শুরু করেন। তখনো তিনি বুঝতে পারেননি পরবর্তীতে এটিই তাকে একজন সফল মাশরুম চাষি বা উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিতি দিবে। প্রায় ৮ বছরের ব্যবধানে জহিরুল এখন সফল চাষি। সরেজমিনে গিয়ে কথা হয় তার সাথে। তিনি বলেন, মাশরুম চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন ও দারিদ্র্য হ্রাসকরণ প্রকল্পের প্রকল্প থেকে মাশরুম চাষ নিয়ে ১০ দিনের ট্রেনিং দেই। পরিচালক আখতার জাহান কাঁকন যথেষ্ট সহযোগিতা করেন। প্রদর্শনী হিসেবে ৩ লাখ ১৫ হাজার টাকা পাই। এর সাথে আমার কিছু টাকা ইনভেস্ট করি। এ দিয়ে আমি বড় আকারে মাশরুম চাষ শুরু করি। বর্তমানে ১৪-১৫ লাখ টাকার পুঁজি হয়েছে। তিনি জানান, ৫-৭ টি মাশরুমের জাত রয়েছে। তবে, শীতকালের জাত গরম কালে করি না, গরমেরটা শীতকালে করি না। এখন যেমন আছে ঋষি মাশরুম। এটা ঔষধিগুণসম্পন্ন মাশরুম। আর ওয়েস্টার ৪-৫টা জাতের রয়েছে। জহিরুল জানান, ঋষি মাশরুম এই প্রথম চাষ করেছেন। বাজারে এর চাহিদা অনেক। দাম অনেক বেশি, ১৫ হাজার টাকা কেজিতেও বিক্রি হয়।

তিনি জানান, বর্তমানে আমার এখানে ২ জন কর্মচারী কাজ করেন। পাশাপাশি আমি ও আমার স্ত্রী কাজ করি। সবারই বেতন আছে। বেতন বাদ দিয়ে ৭০-৮০ হাজার টাকা থাকে মাসে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাশরুম চাষের জন্য কোনো উর্বর জমির প্রয়োজন হয় না। অল্প জায়গায় অধিক পরিমাণ মাশরুম উৎপাদন করা যায়। মাশরুম চাষের জন্য কীটনাশক, রোগনাশক এমনকি রাসায়নিক সারের প্রয়োজন হয় না বিধায় এটি একটি অর্গানিক ফসল। স্বল্প পুঁজিতে মাশরুম চাষ শুরু করা যায়।

বেকার, প্রতিবন্ধীসহ নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব। এ কারণে সারা দেশেই বাড়ছে মাশরুম চাষির সংখ্যা। গড়ে উঠছে নতুন নতুন উদ্যোক্তা।

সরেজমিন সাভারে গিয়ে কথা হয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (ডিএই) মাশরুম চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন ও দারিদ্র্য হ্রাসকরণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক কৃষিবিদ ড. মোছা: আখতার জাহান কাঁকনের সাথে। ২৫তম বিসিএস (কৃষি) কর্মকর্তা কাঁকনের চাকরি জীবনের ১৯ বছরের প্রায় ১৭ বছরই কাটছে মাশরুমের সাথে। সাভারের মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে তিনি প্রকল্প পরিচালক হিসেবে যোগ দেন। ২০২৭ সালে ডিসেম্বরে শেষ হবে এই প্রকল্প। মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউট ছাড়াও দেশের ৩৪টি মাশরুম উপকেন্দ্র/হর্টিকালচার সেন্টার এবং দেশের সব জেলার ১৬০টি উপজেলা ও ১৫টি মেট্রোপলিটন থানা এই প্রকল্পের আওতাভুক্ত। মাশরুম উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে বিশে^র জনপ্রিয় বিভিন্ন মাশরুমের জার্মপ্লাজম সংগ্রহ এবং এসব জার্মপ্লাজমের বাংলাদেশে চাষ ও সংরক্ষণ উপযোগী লাগসই ও টেকসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন/ উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ; মাশরুম ও মাশরুমজাত পণ্যের উৎপাদন ও ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীসহ সব স্তরের মানুষের খাদ্য, পুষ্টি ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে সহায়তা করাসহ ৫টি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য রয়েছে মাশরুম প্রকল্পের।

গবেষণার প্রতি বিশেষ আগ্রহ থেকেই মাশরুমের সাথে নিজেকে যুক্ত করার কথা জানিয়ে প্রকল্প পরিচালক ড. মোছা: আখতার জাহান কাঁকন জানান, ল্যাবের প্রতি আমার খুবই আগ্রহ। পিএইচডিটাও ল্যাবরেটরি বা বায়োটেক ল্যাবে করেছি। মাশরুমের পুষ্টিগুণ ও ঔষুধিগুণ রয়েছে। এটা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া দরকার। এজন্য আমি মাশরুম নিয়ে কাজ করার আগ্রহ দেখাই। ২০০৮ সাল থেকে মাশরুমের সাথে কাজ করা শুরু।

মাশরুমের উৎপাদন বৃদ্ধি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিগত দিনে বেশ কিছু জাত উন্নয়ন হয়েছে। যেমন আমরা নিজেরাই দুটি জাত উদ্ভাবন করেছি। বীজ জীবাণুমুক্ত করাসহ আরো কিছু প্রযুক্তির উদ্ভাবন হয়েছে। সহজ সহজ কিছু প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও নতুন কিছু জাত আসার কারণে দেশে মাশরুম উৎপাদন বেড়েছে।

একটা সময় মাশরুমের প্রতি মানুষের নেতিবাচক ধারণা ছিল। এখন জনসচেতনা বৃদ্ধি পেয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অল্প পুঁজিতে মাশরুম লাভজনক ব্যবসা। সহজবদ্ধ চাষ পদ্ধতি। ফলে মানুষ আগ্রহী হয়ে উঠছেন। প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা ইউনিয়ন পর্যায়ে উদ্যোক্তা তৈরি করছি। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে মাশরুম চাষ ও প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছি।

আরো বড় পরিসরে মাশরুম উৎপাদনে বাধার কথা জানতে চাইলে কৃষিবিদ ড. কাঁকন বলেন, আমাদের খাদ্যাভ্যাসে এখনো ওভাবে মাশরুম আসেনি। এটা আসা জরুরি। এটা যে, আদর্শ খাবার, পুষ্টিসমৃদ্ধ হালাল খাবার-এ বিষয়ে আরো সচেতনতা বাড়াতে হবে। একেবারে গ্রামে গ্রামে উৎপাদন করতে হবে। মানুষ যেভাবে অতি সহজেই এক কেজি আলু পটল কিনতে পারে- সেভাবেই যেন মাশরুম কিনতে পারে। এটা করতে গেলে আমাদের মাশরুমের বীজের প্রাপ্তিটা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য ৩৪টি হর্টিকালচার সেন্টারে কাজ করছি। তবে, এসব হর্টিকালচার সেন্টার দিয়ে সারা দেশে মাতৃবীজ সরবরাহ যথেষ্ট না। দেশের প্রতিটি জেলায় বা প্রতিটি হর্টিকালচার সেন্টারে যদি মাতৃবীজ সরবরাহের ব্যবস্থা থাকে তাহলে মাশরুমের উৎপাদন দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত প্রায় লক্ষাধিক চাষি মাশরুমের সাথে যুক্ত হয়েছেন। প্রতিনিয়তই এ সংখ্যা বাড়ছে বলে ‘মাশরুম আপা’ হিসেবে খ্যাতি পাওয়া ড. আখতার জাহান কাঁকন জানান।

তিনি জানান, সমতলের মধ্যে যশোর, মাগুরা, ঝিনাইদহ, সিলেট, বগুড়া, রংপুরে বেশি মাশরুম চাষ হয়। আর পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলাতে উৎপাদন ও চাহিদা দুটোই বেশি। তবে উৎপাদন কম হলেও সবচেয়ে বেশি মাশরুম খাওয়া মানুষের সংখ্যা ঢাকাতে।

বিদেশেও রফতানি হতে পারে : বাংলাদেশে মাশরুমের একটি বড় বাজার রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে, মাশরুমের পুষ্টি ও ঔষধিগুণাগুণ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। মাশরুমের রন্ধন প্রণালী সম্পর্কে মানুষ জানার কারণে দেশে মাশরুমের ব্যবহার খুব দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাশরুম চাইনিজ রেস্তোরাঁ, চেইন সুপার শপ, ফ্রাই শপ/ভ্রাম্যমাণ দোকান, ছোট রেস্টুরেন্ট, ফলের দোকান, মুদি দোকান এবং কাঁচা বাজারে বিক্রি হচ্ছে। বিক্রি হচ্ছে অনলাইনেও। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং আমেরিকায় বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী এবং ভারতীয় উপমহাদেশীয় মানুষ বাস করে। তাই বিদেশে মাশরুমের একটি বৃহৎ মার্কেট রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে এই মার্কেট বাংলাদেশের রফতানিকারকদের টার্গেট হতে পারে। পুরনো উদ্যোক্তাদের সাথে নতুন উদ্যোক্তাদের লিংকেজ তৈরি করে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানান আখতার জাহান কাঁকন।

এই বিষয়ে আরও

কৃষি ঋণে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির  পরও পাহাড়সম খেলাপি ঋণ

কৃষি ঋণে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির পরও পাহাড়সম খেলাপি ঋণ

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে ওভারডিউয়ের মারপ্যাঁচে ব্যাংক খাতের চিত্র

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০২ এএম

সার সরবরাহ, মজুত ও বিতরণ মনিটরিংয়ে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ গঠন

সার সরবরাহ, মজুত ও বিতরণ মনিটরিংয়ে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ গঠন

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪৭ পিএম

এই সম্পর্কিত আরও

সোম, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সাত মিনিটে এক মাইল দৌড়াতে হবে

সোম, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ডিআরইউ গেমসের পুরস্কার বিতরণ

সোম, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

পিএসজির প্রথম জয়

সোম, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ঝিলি-বর্ষার লক্ষ্য মূল জাতীয় দল

সোম, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ইউএস ওপেনের নতুন চ্যাম্পিয়ন জভেরেভ