কৃষি ঋণে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির পরও পাহাড়সম খেলাপি ঋণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে ওভারডিউয়ের মারপ্যাঁচে ব্যাংক খাতের চিত্র
দেশের অর্থনীতিতে জিডিপির ১১.৮৫ শতাংশ অবদান রাখা এবং ৪৫ শতাংশ কর্মসংস্থানের জোগানদাতা কৃষি খাত চলতি অর্থবছরের শুরুতেই ঋণ বিতরণে কিছুটা গতির দেখা মিললেও বড় ধরনের কাঠামোগত ও সুশাসনের সঙ্কটে জর্জরিত রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষি ক্রেডিট বিভাগ-১ (মনিটরিং অ্যান্ড ওভারসাইট উইং) কর্তৃক প্রকাশিত জুলাই ২০২৬-এর সর্বশেষ মাসিক প্রতিবেদনে ব্যাংক খাতের ঋণ বিতরণের খণ্ডচিত্রের পাশাপাশি খেলাপি ও ওভারডিউ ঋণের এক উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
দেশের অর্থনীতিতে জিডিপির ১১.৮৫ শতাংশ অবদান রাখা এবং ৪৫ শতাংশ কর্মসংস্থানের জোগানদাতা কৃষি খাত চলতি অর্থবছরের শুরুতেই ঋণ বিতরণে কিছুটা গতির দেখা মিললেও বড় ধরনের কাঠামোগত ও সুশাসনের সঙ্কটে জর্জরিত রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষি ক্রেডিট বিভাগ-১ (মনিটরিং অ্যান্ড ওভারসাইট উইং) কর্তৃক প্রকাশিত জুলাই ২০২৬-এর সর্বশেষ মাসিক প্রতিবেদনে ব্যাংক খাতের ঋণ বিতরণের খণ্ডচিত্রের পাশাপাশি খেলাপি ও ওভারডিউ ঋণের এক উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৫৮টি বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বিআরডিবির মাধ্যমে মোট ৬০ হাজার কোটি টাকা কৃষি ও গ্রামীণ ঋণ বিতরণের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে মোট বিতরণ হয়েছে দুই হাজার ৭৭৩ কোটি টাকা (যার মধ্যে ব্যাংকগুলো দিয়েছে দুই হাজার ৬৫৮.৩১ কোটি টাকা এবং বিআরডিবি ১১৫.১২ কোটি টাকা)। এটি গত বছরের একই সময়ের (দুই হাজার ২৪৯.০৯ কোটি টাকা) তুলনায় ২৩.৩১ শতাংশ বেশি। কাগজ-কলমে এই প্রবৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক মনে হলেও এর পেছনের আর্থিক স্বাস্থ্য ও শৃঙ্খলা নিয়ে বিশ্লেষকদের মনে গভীর শঙ্কার অবকাশ রয়েছে।
বিতরণে তারতম্য ও প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ক্রিয়তা
জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৪.৪৩ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকগুলো ৫.৭৯ শতাংশ অর্জন করে শীর্ষে থাকলেও, বিদেশী বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো (লক্ষ্যমাত্রা দুই হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা) এই এক মাসেও কৃষি খাতে কোনো ধরনের ঋণ বিতরণ বা অংশগ্রহণই শুরু করেনি, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে তাদের দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এ ছাড়া বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ৪.১২ শতাংশ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ৪.১২ শতাংশ লক্ষ্য অর্জন করেছে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, নীতিমালায় শস্য খাতে ৫৫ শতাংশ বিতরণের নির্দেশনা থাকলেও জুলাই মাসে বিতরণ হয়েছে মোট ৪০.৪৭ শতাংশ। এর বিপরীতে প্রাণিসম্পদ ও পোলট্রি খাতে ৩৪.৯০ শতাংশ এবং মৎস্য খাতে ১৪.৪৬ শতাংশ অর্থ ঢালা হয়েছে। শস্য খাতে এই অনীহা দীর্ঘমেয়াদে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও উৎপাদনের ভিত্তিকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অর্থবছরের প্রথম মাসের (জুলাই ২০২৬) অর্জন
- মোট বিতরণ : জুলাই ২০২৬ মাসে মোট বিতরণ হয়েছে ২,৭৭৩.৪৩ কোটি টাকা (এর মধ্যে ৫৮টি ব্যাংক দ্বারা ২,৬৫৮.৩১ কোটি টাকা এবং বিআরডিবি দ্বারা ১১৫.১২ কোটি টাকা)।
- বার্ষিক লক্ষ্যের বিপরীতে অগ্রগতি : ব্যাংক খাতে মোট লক্ষ্যের মাত্র ৪.৪৩% অর্জিত হয়েছে।
- ইসলামী ব্যাংকগুলো : ৫.৭৯% (সর্বোচ্চ অর্জন)
- বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো : ৫.০৬%
- রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক : ৪.১২%
- বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক : ৪.১২%
- বিদেশী বাণিজ্যিক ব্যাংক : ০.০০% (এখনো বিতরণ শুরু করেনি)
পাহাড়প্রমাণ ওভারডিউ ও শ্রেণীকৃত ঋণের বোঝা
প্রতিবেদনের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো বকেয়া, ওভারডিউ ও শ্রেণীকৃত (খেলাপি) ঋণের স্ফীতি। জুলাই ২০২৬ শেষে ব্যাংক খাতে মোট বকেয়া ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬২ হাজার ৮৬৭ কোটি টাকা। এর বিপরীতে- ওভারডিউ বা মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ : সামান্য হ্রাস পেলেও তা এখনো ২২ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকার বিশাল অঙ্কে অবস্থান করছে। শ্রেণীকৃত বা খেলাপি ঋণ : ৫.৩৭ শতাংশ কমে ১৮ হাজার ৮১৬.৫০ কোটি টাকায় দাঁড়ালেও এটি অর্থনীতির জন্য একটি বিরাট বোঝা হিসেবে বহাল রয়েছে।
বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক ও কিছু ইসলামী ব্যাংকে খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। জুলাই ২০২৫ থেকে জুলাই ২০২৬ তুলনায় ইসলামী ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ১০২.২৪ শতাংশ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ১০.৫৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষি ও প্রান্তিক চাষিদের নামে নেয়া ঋণ সঠিকভাবে আদায় না হয়ে যদি এভাবে খেলাপি সংস্কৃতির আবর্তে আটকে থাকে, তবে গ্রামীণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তারল্য ও সুশাসন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।
বিশ্লেষকদের অভিমত
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিজমির দ্রুত সঙ্কোচন এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মুখে বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা এখন বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বাংলাদেশ ব্যাংক ও কৃষি সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা ঋণ বিতরণের পরিমাণগত প্রবৃদ্ধি নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেও, ওভারডিউ ও খেলাপি ঋণের বিশাল পাহাড় অপসারণ না করা পর্যন্ত কৃষি ঋণের সুফল প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছানো অসম্ভব।
বিশ্লেষকদের মতে, কেবল লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের প্রতিযোগিতায় না নেমে ঋণগ্রহীতার সঠিক নির্বাচন, নিয়মিত মনিটরিং এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়বে।
বিষয়সমূহ
এই বিষয়ে আরও
ব্যাংকিং খাতের ভেতরেই ঋণ-বোমা
তথ্য আছে, নজরদারি আছে- তারপরও ৬ লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ












