ইসরাইল-ইরান পাল্টাপাল্টি আঘাত
ইসরাইল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রাতভর ২০০টিরও বেশি রকেট হামলার খবর পাওয়া গেছে। এসব রকেট ২২টি স্থানে আঘাত হানে।
- ১০ ইসরাইলি বিমান ধ্বংস
- ইসরাইল হামলা বন্ধ করলে ইরানও করবে
- ইরানের সাথে বসতে চায় জার্মানি, ফ্রান্স ও ব্রিটেন
- আরো ১৩ ইসরাইলি নিহত
- ইরানে মোসাদের দুই গুপ্তচর গ্রেফতার
- হাইফায় তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত
ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত রয়েছে। অন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর অনুসারে, হাইফা ও তেল আবিবসহ ইসরাইলজুড়ে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ইরান দ্বিতীয় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। অন্য দিকে ইসরাইলের হামলায় তেহরানসহ ইরানের বিভিন্ন স্থান্নে নতুন বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেছেন, ইসরাইল যখন ইরানের উপর আক্রমণ বন্ধ করবে তখন ইরানের প্রতিশোধও বন্ধ হয়ে যাবে। বিবিসি, রয়টার্স, আলজাজিরা, সিএনএন ও টাইমস অব ইসরাইল।
ইরানের হামলায় অন্তত ১৩ ইসরাইলি নিহত : ইরানের হামলায় ইসরাইলের অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন। গতকাল রোববার ইসরাইল সরকারের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বার্তাসংস্থা সিএনএন। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শনিবার রাতভর চলা হামলায় ১০ জন নিহত হয়েছেন। এর আগের দিন তিনজন নিহত হয়েছেন। সরকার বলছে, ইরানের হামলায় কমপক্ষে ৩৮৫ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে সাতজনের অবস্থা গুরুতর।
ইসরাইলি পুলিশের বরাতে আলজাজিরা জানিয়েছে, তেলআবিবের দক্ষিণে অবস্থিত বাত ইয়াম শহরে ছয়জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া আরো সাতজন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছেন জরুরি পরিষেবার সদস্যরা। ইসরাইল কর্তৃপক্ষ আরো জানিয়েছে, রাতভর ২০০টিরও বেশি রকেট হামলার খবর পাওয়া গেছে। এসব রকেট ২২টি স্থানে আঘাত হানে। চিকিৎসক ও গণমাধ্যমের খবর অনুসারে, হাইফা ও তেলআবিবসহ ইসরাইলজুড়ে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইরান। এদিকে ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে, গত দুই দিনে ইসরাইলি হামলায় কমপক্ষে ৮০ জন নিহত এবং ৮০০ জন আহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ২০ জন শিশুও রয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় টিভি বলেছে, ‘ট্রুু প্রমিজ ৩’ অভিযানের দ্বিতীয় ধাপে ১০০টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে ইসরাইলে। ইসরাইলি গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, হাইফা ও কিরিয়াত এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র মাটিতে আঘাত করেছে নাকি বাধা দেয়া হয়েছে তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ইসরাইলে ভবন বিধ্বস্ত, দুমড়ে মুচড়ে গেছে গাড়ি : দখলদার ইসরাইলকে লক্ষ্য করে রোববার ভোরে আরেক দফা মিসাইল হামলা চালিয়েছে ইরান। জানা গেছে, বেশ কয়েকটি মিসাইল দখলদারদের বাণিজ্যিক রাজধানী তেলআবিবসহ অন্যান্য জায়গায় আঘাত হেনেছে। সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত কয়েকটি ভিডিওতে দেখা গেছে, হামলায় একটি ভবন আংশিক বিধ্বস্ত হয়েছে। এ ছাড়া অনেক গাড়ি দুমড়ে মুচড়ে গেছে। হিব্রু ভাষার সংবাদমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, সর্বশেষ হামলায় অনেকে হতাহত হয়েছে। যাদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ইংরেজি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরাইল জানিয়েছে, ইরানের সর্বশেষ হামলায় একাধিক মিসাইল মধ্য ইসরাইলের বিভিন্ন জায়গায় আঘাত হেনেছে। সেখানে উদ্ধারকর্মীরা যাচ্ছেন। এর মধ্যে বাত ইয়ামে একটি ভবন বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া ফায়ার ও রেসকিউ সার্ভিস জানিয়েছে, রেহেবোতের একটি ভবনে সরাসরি মিসাইল আঘাত হেনেছে। সাথে তেলআবিবে একটি অবকাঠামো এবং কিরইয়াত একরনের একটি শপিং মলে মিসাইল আঘাত বা শার্পনেল আঘাত হানার তথ্য শোনা যাচ্ছে। সূত্র : টাইমস অব ইসরাইল
ইসরাইলি হামলা বন্ধ হলে প্রতিক্রিয়াও বন্ধ হবে : ইরান
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেছেন, ইসরাইল যদি ইরানে হামলা বন্ধ করে, তবে আমাদের প্রতিক্রিয়াও বন্ধ হয়ে যাবে। তেহরানে এক সংবাদ সম্মেলনে এই মন্তব্য করেন তিনি। শুক্রবার ইসরাইলি হামলা শুরুর পর থেকে এটিই ছিল তার প্রথম প্রকাশ্য বক্তব্য। আলজাজিরা এ খবর জানিয়েছে। তেহরানে কূটনীতিকদের সামনে আরাকচি বলেন, ‘যদি আগ্রাসন বন্ধ হয় আমাদের প্রতিক্রিয়াও বন্ধ হবে।’ এদিকে ইসরাইল এখনো এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। তবে রোববারও তারা ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাকচি আরো বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় ইসরাইলি হামলার নিন্দা জানানো।’
তিনি আরো বলেন, ‘নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনায় ইসরাইলি হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সম্পৃক্ততা নেই, ওয়াশিংটনের এমন দাবি আমরা বিশ্বাস করি না।’ তিনি বলেন, ‘আমরা পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের বিপক্ষে এবং এটা আমাদের দৃঢ় নীতি। তবে যারা আমাদের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচির অধিকার কেড়ে নিতে চায়, তাদের সে অধিকার নেই।’
তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আমাদের ষষ্ঠ দফা আলোচনা নির্ধারিত ছিল। কিন্তু তা এখন বাতিল করা হয়েছে। তবুও আমরা প্রস্তুত ছিলাম আমেরিকানদের জন্য প্রয়োজনীয় আশ্বাস দিতে।’ ‘আগের দফার আলোচনায় আমেরিকা কিছু প্রস্তাব দিয়েছিল, যেগুলোর সবগুলো আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। আমরা আমাদের প্রতিক্রিয়া দিয়েছিলাম এবং একটি পাল্টা প্রস্তাব দেয়ার কথা ছিল। সেই প্রস্তাব একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তির দ্বার খুলে দিতে পারত।’
আরাকচি আরো বলেন, ‘ইসরাইল স্পষ্টভাবে চায় না যে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আমাদের কোনো কূটনৈতিক অগ্রগতি হোক।’ এদিকে ইরানের হামলায় ইসরাইলের উত্তরাঞ্চলীয় শহর হাইফার একটি তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তেল শোধনাগারটি পরিচালনাকারী ইসরাইলি প্রতিষ্ঠান ‘বাজান’ এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ইরানি বাহিনী রাতভর ইসরাইলের দিকে প্রায় ৮০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এগুলোর মধ্যে ৪০টি পড়েছে ইসরাইলের উত্তরাঞ্চলে। এই অঞ্চলেই হাইফা অবস্থিত। এর আগে ইরানের মধ্যাঞ্চলীয় শহর ইসফাহানে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইসরাইলি বাহিনী। তবে এতে এখন পর্যন্ত কেউ হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
ইরানের সাথে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত জার্মানি, ফ্রান্স ও ব্রিটেন : এদিকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা প্রশমনে উদ্যোগ নিতে প্রস্তুত জার্মানি, ফ্রান্স ও ব্রিটেন। মধ্যপ্রাচ্য সফরে থাকা জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়াডেফুল শনিবার বলেছেন, ইসরাইল ও ইরানের মধ্যকার চলমান সংঘাত নিরসনে অবদান রাখার চেষ্টা করছেন তিনি। তবে তিনি উল্লেখ করেন, এর আগেও গঠনমূলক আলোচনার সুযোগ ইরান গ্রহণ করেনি। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।
শনিবার রাতে জার্মান পাবলিক সম্প্রচারক এআরডিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ওয়াডেফুল বলেন, ‘আমি আশা করি, এখনো সেটা সম্ভব। জার্মানি, ফ্রান্স ও ব্রিটেন একত্রে প্রস্তুত। আমরা ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তাৎক্ষণিক আলোচনার প্রস্তাব দিচ্ছি, আমি আশা করি তারা এই প্রস্তাব গ্রহণ করবে।’ তিনি বলেন, ‘এই সংঘাত প্রশমনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হচ্ছে, ইরান যেন এই অঞ্চলের জন্য, ইসরাইল রাষ্ট্রের জন্য অথবা ইউরোপের জন্য কোনো হুমকি না হয়ে দাঁড়ায়।’
রোববার ওমানে অবস্থান করছেন ওয়াডেফুল। তিনি বলেন, এই সংঘাত তখনই শেষ হবে যখন-ইরান ও ইসরাইল উভয়ের ওপর সব দিক থেকে প্রভাব খাটানো হবে। তিনি আরো বলেন, ‘সবার পক্ষ থেকেই একটি অভিন্ন প্রত্যাশা রয়েছে যে, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে দুই পক্ষেরই সহিংসতার ঘূর্ণি থামাতে একটি আন্তরিক প্রচেষ্টা চালানো দরকার।’ ইরানের সরকার পতনের সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাইলে ওয়াডেফুল বলেন, তার ধারণা, তেহরানের সরকার পতন করাই ইসরাইলের উদ্দেশ্য নয়।
গাজা প্রসঙ্গে ওয়াডেফুল বলেন, ফিলিস্তিন অধ্যুষিত উপত্যকায় অমানবিক পরিস্থিতি গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি ইসরাইলের প্রতি ত্রাণ সংস্থাগুলোকে অবাধ প্রবেশের অনুমতি দেয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘ক্ষুধা, মৃত্যু, গাজার মানুষের দুঃখ-যন্ত্রণা অবশ্যই বন্ধ হতে হবে।’ তবে তিনি আরো বলেন, এই সংঘাতের জন্য দায়ী হামাস। ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাস-নেতৃত্বাধীন হামলায় ইসরাইল থেকে যাদের জিম্মি করা হয়েছিল তাদের মুক্তির আহ্বান জানান ওয়াডেফুল।
১০ ইসরাইলি বিমান ধ্বংস : মাত্র এক ঘণ্টায় ইসরাইলের ১০টি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছে ইরান। দেশটির সামরিক বাহিনীর বরাত দিয়ে এ খবর দিয়েছে মেহের নিউজ এজেন্সি। ইরানের খাতাম আল-আনবিয়া আকাশ প্রতিরক্ষা ঘাঁটির কমান্ডার মেহের নিউজকে জানিয়েছেন, এক ঘণ্টার ব্যবধানে তারা দখলদার ইসরাইলের ১০টি সামরিক বিমান ধ্বংস করেছেন।
তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি। ইসরাইলের পক্ষ থেকেও কোনো বার্তা আসেনি। অবশ্য, তারা কখনো তাদের ক্ষয়ক্ষতির কথা তেমন একটা স্বীকারও করে না। দাবিকৃত বিমানগুলো আসলে যুদ্ধবিমান, ড্রোন, নাকি নজরদারি চালানোর বিমান, সে ব্যাপারে স্পষ্ট করে কোনো কিছু জানা যায়নি। তবে ওই ঘটনার পর ঘোষণা দিয়ে ইসরাইলে ব্যাপক হামলা চালায় ইরান। এতে অন্তত ২০ জন আহত হয়েছে, যাদের একজনের অবস্থা গুরুতর।
ইসরাইলের জরুরি পরিষেবা এমডিএ জানিয়েছে, হাইফা শহরের পাশে ইরান থেকে নিক্ষেপ করা ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে পাঁচজন আহত হয়েছেন এবং গ্যালিলি এলাকায় একটি দোতলা ভবনে ১৪ জন আহত হয়েছেন। তবে ম্যাডিসিস দাবি করছে, ইসরাইলের উত্তরাঞ্চলে ইরানের ছোড়া মিসাইলে একজন মারা গেছে। একই দাবি করেছে ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি।
দখলদার ইসরাইলকে লক্ষ্য করে শনিবার রাতভর ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চলিয়েছে ইরান। এতে কমপক্ষে ৭ ইসরাইলি নিহত ও দেড় শতাধিক আহত হয়েছে। এ তথ্য দিয়েছে আলজাজিরা। শনিবার রাতে প্রথম দফায় ইসরাইলের বন্দর নগরী হাইফাতে কয়েক ডজন মিসাইল ছোড়ে তেহরান। এরপর শনিবার মধ্যরাতে আরেক দফা মিসাইল ছুড়ে দেশটি।
ইরানে ইসরাইলি মোসাদের দুই গুপ্তচরকে গ্রেফতার : ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের দুই সদস্যকে গ্রেফতার করার কথা জানিয়েছে ইরান। আলজাজিরার খবর থেকে এ তথ্য জানা গেছে। আধা সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই দুই ব্যক্তি আলবোর্জ প্রদেশে বিস্ফোরক ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বানানোর সময় ধরা পড়েছেন। ইসরাইলের সাথে দীর্ঘদিনের ছায়াযুদ্ধে লিপ্ত ইরান এর আগেও বহুবার মোসাদের সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে অনেক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে ও মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। বিশেষ করে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ব্যাহত করতে নাশকতা বা হত্যাচেষ্টায় জড়িত থাকার অভিযোগে তাদের শাস্তি দেয়া হয়েছে।
ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করে দেবো : ইসরাইল
ইসরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাৎজ ইরানকে হুঁশিয়ার করে বলেছেন, তাদের পারমাণবিক সক্ষমতা ও অস্ত্রব্যবস্থা ধ্বংস করে দেয়া হবে।’ ইসরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো এ তথ্য জানিয়েছে। খবর আলজাজিরার। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে ইঙ্গিত করে কাৎজ বলেন, ‘ইরানের স্বৈরশাসক নিজের শাসন টিকিয়ে রাখতে তেহরানকে বৈরুত বানিয়ে ফেলেছেন এবং তেহরানের জনগণকে জিম্মি করে রেখেছেন।’ এদিকে গতকাল রোববার তৃতীয় দিনের মতো ইরানে বিমান হামলা চালায় ইসরাইল। এর জবাবে ইরানও ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে।
ইসরাইলের হাইফায় তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত : ইরানের হামলায় ইসরাইলের উত্তরাঞ্চলীয় শহর হাইফার একটি তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তেল শোধনাগারটি পরিচালনাকারী ইসরাইলি প্রতিষ্ঠান ‘বাজান’ এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। প্রতিষ্ঠানটির বরাতে ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম এই তথ্য দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, ইরানের রাতভর হামলায় তেল শোধনাগার কমপ্লেক্সের ভেতরে পাইপলাইন ও সঞ্চালন লাইনের কিছু নির্দিষ্ট জায়গায় ক্ষতি হয়েছে। তেল শোধনাগারটি এখনো চালু আছে। তবে কিছু ইউনিট ও স্থাপনা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ক্ষতির প্রভাব মূল্যায়ন করা হচ্ছে। এই খবর এমন একসময় এলো, যখন ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ইরানি বাহিনী রাতভর ইসরাইলের দিকে প্রায় ৮০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এগুলোর মধ্যে ৪০টি পড়েছে ইসরাইলের উত্তরাঞ্চলে। এই অঞ্চলেই হাইফা অবস্থিত। খবর আলজাজিরার।
ইস্পাহান শহরে ইসরাইলের হামলা : ইসরাইলি বাহিনী ইরানের মধ্যাঞ্চলীয় শহর ইস্পাহানে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। ইসনা সংবাদ সংস্থার বরাতে ইরানের উপ-প্রাদেশিক গভর্নর আকবর সালেহি বলেছেন, ‘ কিছুক্ষণ আগে ইস্পাহানে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি স্থাপনা লক্ষ করে হামলা চালানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কেউ হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।’ তিনি আরো জানান, ‘বিশেষজ্ঞ দলগুলো বর্তমানে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি যাচাই করছে।’ এর আগে, ইসরাইলি বাহিনী শিরাজ শহরে বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের কারখানায় হামলা চালায়। এ সময় সেখান থেকে ঘন কালো ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়। খবর আলজাজিরার।
ইসরাইলের বিশ্ববিদ্যালয়ে ইরানের হামলা : ইরানের হামলায় ইসরাইলের কেন্দ্রীয় শহর রেহোভতে অবস্থিত গবেষণাধর্মী বিশ্ববিদ্যালয় উইজম্যান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সেও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রতিষ্ঠানটির কয়েকটি স্থাপনা নষ্ট হয়েছে। ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেটের খবরে বলা হয়েছে, এই হামলায় কেউ হতাহত হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলেছে, ক্যাম্পাসের কয়েকটি ভবনে হামলা হয়েছে।
বিপর্যস্ত ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা : টানা কয়েক দিন ধরে ইরান এবং ইসরাইলের হামলা ও পাল্টা হামলায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্য। গত শুক্রবার ভোরে তেহরানসহ ইরানের বেশ কিছু স্থানে পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনায় ইসরাইল বিমান হামলা চালায়। পরে তীব্র শক্তি নিয়ে ইসরাইলে পাল্টা হামলা শুরু করে ইরানও। এমন অবস্থায় ইরানের আক্রমণে কার্যত বিপর্যস্ত ও দিশেহারা হয়ে পড়েছে ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। বিশ্লেষকের বরাত দিয়ে রোববার এই তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা।
সংবাদমাধ্যমটি বলছে, গত কয়েকদিন ধরে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে চলমান সংঘাতে ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কিছু দুর্বলতা দেখা গেছে। বিশেষ করে দেশটির সুপরিচিত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা ‘আয়রন ডোম’ চাপে পড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন একজন বিশ্লেষক। দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের গবেষক মুহাম্মদ সেলুম বলেন, “আয়রন ডোম মূলত স্বল্পপাল্লার রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর জন্য তৈরি। কিন্তু এখন ইরান থেকে যেসব হামলা হচ্ছে, তা হচ্ছে ক্রুজ মিসাইল, ব্যালিস্টিক মিসাইল ও হাইপারসনিক মিসাইল-যেগুলো আটকানো আয়রন ডোমের সক্ষমতার বাইরে।” তবে তিনি জানান, ইসরাইলের কাছে আরো উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আছে। যেমন, ‘অ্যারো ১’ এবং ‘অ্যারো ৩’ যেগুলো প্রায় ১০০ কিলোমিটার উঁচুতে গিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে পারে। ‘ডেভিড স্লিং’ নামের আরেকটি ব্যবস্থা রয়েছে, যা মাঝারি দূরত্বে ২০ থেকে ৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত আসা হামলাও প্রতিহত করতে সক্ষম। মুহাম্মদ সেলুম বলেন, “ইসরাইলের এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত এবং সমন্বিত হলেও তা চরম মাত্রার হামলায় ভেঙে পড়তে পারে। আর গত ৪৮ ঘণ্টায় আমরা তারই উদাহরণ দেখেছি।”
এদিকে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সাথে কথা বলেছেন। ম্যাক্রোঁ তাকে “উত্তেজনা এড়াতে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের” আহ্বান জানিয়েছেন। একই সাথে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ইরানকে পারমাণবিক আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি। কিন্তু ইরানি প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ফরাসি প্রেসিডেন্টকে বলেছেন, ইসরাইলের হামলা অব্যাহত থাকলে ইরান আলোচনার টেবিলে বসবে না। রোববারের নির্ধারিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পারমাণবিক আলোচনা বাতিলের ঘোষণা করার পরই ইরান এই কথা জানাল।
পূর্ব আজারবাইজানে ইসরাইলি হামলায় ৩০ জন সামরিক কর্মী নিহত : ইরানের পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশে ইসরাইলি হামলায় ৩০ জন সামরিক কর্মী নিহত হয়েছেন। একই হামলায় একজন রেড ক্রিসেন্ট কর্মী এবং আরো দু’জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। পূর্ব আজারবাইজানের গভর্নর বেহরাম সারমাস্ত রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেছেন, ইসরাইল প্রদেশজুড়ে ১৯টি স্থানে হামলা চালিয়েছে, যার মধ্যে তাবরিজ শহরও রয়েছে।
সারমাস্ত আরো বলেন, তাবরিজের ১২টি স্থানে হামলা চালানো হয়েছে। এ ছাড়া বোস্তানাবাদ, শাবেস্তার, আজারশাহর, মারাগেহ এবং তুর্কমেনচায় কাউন্টিতে অতিরিক্ত হামলা চালানো হয়েছে। পৃথকভাবে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির উদ্ধৃতি দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালিত প্রেস টিভি জানিয়েছে, পশ্চিম আজারবাইজান প্রদেশে একটি অ্যাম্বুলেন্সে ইসরাইলি হামলায় দুই জন নিহত হয়েছে।
গত শুক্রবার ভোরে ইসরাইলি বাহিনী ইরানে আক্রমণ করে। তারা তেহরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাগুলোতে হামলা চালায় এবং শীর্ষস্থানীয় সামরিক কমান্ডার ও নেতৃস্থানীয় বিজ্ঞানীদের হত্যা করে। এরপর শুক্রবার দিনগত রাতে ইরান ইসরাইলের বেশ কয়েকটি এলাকা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। শনিবারও ইরানের শহর ও স্থাপনায় ইসরাইলি হামলা অব্যাহত থাকে। এর প্রতিক্রিয়ায় গত শনিবার রাতে ইরানের আরো একটি ক্ষেপণাস্ত্রের ঝাঁক ইসরাইলজুড়ে আঘাত হানে।








