আজকের পত্রিকা

হাওরের আকাশে কালো মেঘ কাটছেই না

হাওরের আকাশে কালো মেঘ কাটছেই না

এশিয়ার বৃহত্তম জলাভূমি হাকালুকি হাওরের কুলাউড়া অংশে ৫০০ হেক্টর বোরো ধান তলিয়ে গেছে। কয়েক দিনের টানা বর্ষণ আর ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। হাকালুকি হাওরের দিগন্তজোড়া সোনালি ফসলের মাঠ এখন পানির নিচে। বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে হাওর তীরের হাজার হাজার কৃষকের আহাজারি যেন থমছে না। পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া পাকা-আধাপাকা ধান রক্ষায় প্রাণপণ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন কৃষকরা।

কিশোরগঞ্জ ও কুলাউড়া প্রতিনিধি

‘সব ধান তল অয়া গেছে। কিছুই পাই নাই। ধান দূরের কথা, এক মুইঠ খেড়ও (খড়) বাঁচাইতে পারি নাই। ধার-দেনা কইরা ক্ষেত করছিলাম। এহন সারা বছর কি কইরা চলাম, গরুগুলোরেও কেমনে বাঁচাইলাম, কিছুই বুঝতাছি না।’

নয়া দিগন্তকে কথাগুলো বলছিলেন ইটনা উপজেলার এলংজুরী ইউনিয়নের বড়হাতকবিলা গ্রামের কৃষক বখতিয়ার ভূঁইয়া।

এদিকে হাওরের আকাশে কালো মেঘ কাটছেই না, এক দিকে বৃষ্টি আরেক দিকে নদীর পানি বাড়ছে। এতে কৃষকের কপালে দুশ্চিন্তার ছাপ আরো গাঢ় হচ্ছে।

আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, আগামী তিন দিন কিশোরগঞ্জে মেঘলা আকাশ, বজ্রঝড় এবং থেমে থেমে বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।

গতকাল সোমবার কিশোরগঞ্জে সকাল ৬টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত ৫৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকার কারণে হাওর অঞ্চলের পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে এবং বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে।

নিকলী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো: জাহিদুল ইসলাম মাসুম বলেনে, আগামী তিনদিন কিশোরগ ঞ্জে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকবে এবং বজ্রসহ বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। ৬ ও ৭ মে জেলাজুড়ে ভারী বজ্রঝড়ের আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে স্থানীয় কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে প্রতিদিনই হাওরে পানিতে তলিয়ে যাওয়া জমির পরিমাণ বাড়ছে। করিমগঞ্জ উপজেলার গুণধর ইউনিয়নের খয়রত গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান জানান, রোববার রাত থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে।

এলাকায় বেশিরভাগ ধান কাটা হয়ে গেলেও রোদ না থাকায় তা পচে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আজ্জোয়া ( সোমবার) দুপুরে কিছু রইদ (রোদ) উঠছিল। কিন্তু এই রইদে কী অইবো। একলাগা রইদ না থাকলে ধান শুকাইবো না।’

কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসেন বলছেন, দুপুর নাগাদ বৃষ্টি বন্ধ হয়ে রোদ দেখা গেলেও জেলার চারটি নদীর মধ্যে ভৈরবে মেঘনা ছাড়া আর অন্যগুলোর পানি বেড়েছে।

পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় কিশোরগঞ্জের ইটনায় ধনু-বৌলাই নদীর পানি ১০ সেন্টিমিটার বেড়েছে। চামড়া বন্দর এলাকায় মগড়া নদীর পানি বেড়েছে ১৭ সেন্টিমিটার এবং অষ্টগ্রামে কালনী নদীর পানি বেড়েছে ১৮ সেন্টিমিটার। তবে তা এখনো বিপদসীমায় পৌঁছেনি।

এমন পরিস্থিতিতে রোববার কিশোরগঞ্জের হাওরে নতুন করে আরো ২ হাজার ৫০২ হেক্টর জমির বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে।

কিশোরগঞ্জের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান বলেন, এ পর্যন্ত জেলার হাওরাঞ্চলে ১২ হাজার ৫২২ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। এতে ৪৯ হাজার ১৫৬ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

কিশোরগঞ্জের মতোই সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও আশপাশের পুরো হাওরাঞ্চলেরই চিত্র এমন বলে জানা গেছে।

হাকালুকির হাওরে ধান বাঁচাতে কৃষকের প্রাণপণ লড়াই

এশিয়ার বৃহত্তম জলাভূমি হাকালুকি হাওরের কুলাউড়া অংশে ৫০০ হেক্টর বোরো ধান তলিয়ে গেছে। কয়েক দিনের টানা বর্ষণ আর ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। হাকালুকি হাওরের দিগন্তজোড়া সোনালি ফসলের মাঠ এখন পানির নিচে। বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে হাওর তীরের হাজার হাজার কৃষকের আহাজারি যেন থমছে না। পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া পাকা-আধাপাকা ধান রক্ষায় প্রাণপণ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন কৃষকরা।

সরেজমিন হাকালুকি হাওরের দক্ষিণ তীরের ভূকশিমইল, জয়চণ্ডী ও কাদিপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে হাহাকার। বুক সমান পানিতে নেমে কৃষকরা ধান কাটার চেষ্টা করছেন। কোথাও নৌকা, আবার কোথাও কলাগাছের ভেলা দিয়ে আধাপাকা ধান কেটে পাশের উঁচু সড়ক বা বাঁধের ওপর স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। তবে বৃষ্টির কারণে ধান শুকানোর কোনো উপায় নেই। দীর্ঘ সময় ভেজা অবস্থায় থাকায় ধানের ছড়ায় পচন ধরেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে ধান থেকে নতুন করে অঙ্কুর গজাতে শুরু করেছে।

কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এবারের সঙ্কট গত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক বেশি। একে তো প্রতিকূল আবহাওয়া, তার ওপর তীব্র শ্রমিক সঙ্কট। জ্বালানি তেলের সঙ্কটে সময়মতো কম্বাইন হারভেস্টার মেশিন দিয়ে ধান কাটা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে এক বিঘা জমির ধান কেটে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছাতে খরচ হচ্ছে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা। অথচ বাজারে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৯০০ থেকে এক হাজার টাকায়। শ্রমিকের দৈনিক মজুরি হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ায় অনেক কৃষক ধান কাটার আশা ছেড়ে দিয়ে হতাশ হয়ে পড়েছেন। বছরের খাবার, কৃষি ঋণে সর্বশান্ত হয়ে পড়েছে কৃষকরা।

হাওর তীরের সাদিপুর, মীরশংকর, জাবদা, বড়দল ও কাড়েরাসহ প্রায় অর্ধশতাধিক গ্রামের তিন হাজার কৃষক এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। জয়চণ্ডী ইউনিয়নের এক কৃষক আক্ষেপ করে বলেন, এই বোরো ধানই আমাদের সারা বছরের খাবার। এবার জমি আধাপাকা থাকতেই সব শেষ হয়ে গেল। সামনের দিনগুলোতে পরিবার নিয়ে হয়তো না খেয়েই থাকতে হবে। কৃষকদের দাবি, আগাম বন্যা থেকে ফসল রক্ষায় যেন হাওরের বাঁধ নির্মাণে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়। প্রতি বছর ফসল নষ্ট হচ্ছে অথচ দেখার কেউ নেই হাওরের কৃষকদের।

কুলাউড়া উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে উপজেলায় আট হাজার ৭২০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে, যার বড় একটি অংশ (৪ হাজার ৮০৫ হেক্টর) হাওর এলাকায়। অতিবৃষ্টি ও ঢলের পানিতে এরই মধ্যে প্রায় ৫০০ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন জানান, বৈরী আবহাওয়ার কারণে কৃষকরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তবে আমরা মাঠপর্যায়ে তদারকি করছি। এখন পর্যন্ত হাওর এলাকার প্রায় ৮০ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছে। বাকি ধানগুলো দ্রুত ঘরে তোলার জন্য কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। যদিও এ দাবির সাথে দ্বিমত পোষণ করেছেন কৃষকরা।

এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন। তিনি কৃষকদের উদ্দেশে বলেন, সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়েছে এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের চেষ্টা করা হবে। এ বছর কুলাউড়ায় ৮৩৫ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে সরকারি গুদামে প্রতি মণ এক হাজার ৪৪০ টাকা দরে ধান কেনা শুরু হয়েছে। তবে বিশাল ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় এই সরকারি সহায়তা পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছেন সাধারণ কৃষকরা। তারা দ্রুত কৃষি পুনর্বাসন প্যাকেজ ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন।

এই বিষয়ে আরও

কৃষি ঋণে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির  পরও পাহাড়সম খেলাপি ঋণ

কৃষি ঋণে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির পরও পাহাড়সম খেলাপি ঋণ

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে ওভারডিউয়ের মারপ্যাঁচে ব্যাংক খাতের চিত্র

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০২ এএম

সার সরবরাহ, মজুত ও বিতরণ মনিটরিংয়ে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ গঠন

সার সরবরাহ, মজুত ও বিতরণ মনিটরিংয়ে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ গঠন

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪৭ পিএম

এই সম্পর্কিত আরও

সোম, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সাত মিনিটে এক মাইল দৌড়াতে হবে

সোম, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ডিআরইউ গেমসের পুরস্কার বিতরণ

সোম, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

পিএসজির প্রথম জয়

সোম, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ঝিলি-বর্ষার লক্ষ্য মূল জাতীয় দল

সোম, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ইউএস ওপেনের নতুন চ্যাম্পিয়ন জভেরেভ