তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তায়েব এরদোগানের সাথে ছবি তোলার কারণে দলে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন জার্মান তারকা ফুটবলার মেসুত ওজিল। এই ঘটনার জেরে রাগে-ক্ষোভে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন তুর্কি বংশোদ্ভূত এই তরুণ। এরপরই তার সমর্থনে কথা বলছেন অনেকে। এবার সেই তালিকায় যোগ হলেন আরো একজন। তিনি ওজিলের ক্লাব আর্সেনালের বস উনাই ইমেরি। এই জার্মান তারকাকে শুধু সমর্থনই করেননি। তাকে আপন করে নিয়েছেন তিনি, পাশাপাশি পুরো ক্লাব। সেই কথাই সাক্ষাৎকারে জানালেন তিনি।

আর্সেনাল বস বলেন, 'ওজিল ক্লাবের সব খেলোয়াড়দের কাছে সম্মনিত ব্যক্তি।'

তিনি আরো বলেন, 'আমরা ক্লাবের সব খেলোয়াড় এবং ওজিলকে এখানে নিজের বাড়ির মতো পরিবেশে রাখার চেষ্টা করি। কখনো যেন তাদের এটা মনে না হয়, তারা পরিবারের বাইরে আছেন।'

উনাই ইমেরি বলেন, 'আমরা ক্লাবের সব খেলোয়াড়ের পরিবারের মতো। ওজিলকে স্বাভাবিক পরিবেশ দিতে প্রতিদিনই তার সাথে কথা-বার্তা বলছি। তার সতীর্থদের সাথেও। এই সব কিছু আমাদের জন্য ভালো ফলাফল বয়ে আনবে।'

ওজিলের প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, 'তার সাথে আমার সম্পর্ক ভালো। আমি অন্য খেলোয়াড়দেরও দেখেছি, তাদের সাথেও তার সম্পর্ক ভালো। সে তার সতীর্থদের কাছে খুব সম্মানিত ব্যক্তি।'

উল্লেখ্য, রাশিয়া বিশ্বকাপের আগে তুর্কি প্রেসিডেন্টর সাথে ওজিলের ছবি নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। এর মধ্যেই গ্রুপ পর্ব থেকে ছিটকে যায় ২০১৪’র বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। বাকিদের সাথে ব্যর্থতার দায় গিয়ে পড়ে ওজিলের উপরেও। তবে পারফরম্যান্স জনিত কারণে নয়, দলের মধ্যে ওজিল কোণঠাসা হয়ে পড়েন রাজনৈতিক কারণে। এক পর্যায়ে তা এতটাই বেড়ে যায় যে, অবসর নিতে বাধ্য হন ওজিল।

 

আরো পড়ুন : ওজিলের পাশে ‘আলকেমিস্ট’র লেখক কোয়েলহো

বর্ণবাদের প্রতিবাদে জাতীয় দল থেকে অবসর নেয়া জার্মানির মিডফিল্ডার মেসুত ওজিলের অবস্থানকে সমর্থন জানিয়ে তার পাশে দাড়িয়েছেন ‘আলকেমিস্ট’ খ্যাত বিখ্যাত ব্যাজিলীয় লেখক পাওলো কোয়েলহো। গত রোববার জার্মান ফুটবল ফেডারেশনের বর্ণবাদী আচরণের কারণে রাগে ক্ষোভে অবসর নেন দেশটির হয়ে বিশ্বকাপ জেতা এই তারকা ফুটবলার।

পাওলো কোয়েহলো টুইটারে লিখেছেন, ‘এটি কী পড়লাম: ‘হেরে গেলেই আমি অভিবাসী’। প্রসঙ্গত আগের দিন অবসর নেয়ার সময় দেয়া এক বিবৃতিতে মেসুত ওজিল জানিয়েছেন, দলের হয়ে সাফল্য লাভ করলে জার্মানরা তাকে নিয়ে নাচানাচি করলেও কোন কারণে খারাপ খেললে তাকে অভিবাসীর সন্তান বলে খোঁচা দেয়। তুরস্কে জন্ম নেয়া এই জার্মান তাই অপমানের প্রতিবাদে জার্মানির হয়ে আর না খেলার ঘোষণা দিয়েছেন।

কোয়েলহো ওজিলকে উদ্দেশ্যে করে লিখেছেন, ‘তারা কী বললে তা অগ্রাহ্য করো। তুমি সব সময়ই বিজয়ীদের একজন হিসেবে থাকবে, ওজিল।’

গত মে মাসে বিশ্বকাপের আগ মূহুর্তে লন্ডনে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগানের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছিলেন ওজিল। তুরস্কের সাথে জার্মানির কূটনৈতিক সম্পর্ক খারাপ অনেক দিন ধরেই, এ কারণে দেশটির ফুটবল ফেডারেশন ও রাজনীতিবিদরা নানাভাবে অতিষ্ট করে তোলেন ওজিলকে। ওজিল বলেছেন, সেই সাক্ষাৎ ছিলো একটি দাতব্য কর্মসুচির অনুষ্ঠানে, এতে কোন রাজনীতি ছিলো না। কিন্তু সেই বক্তব্যও তাকে রক্ষা করতে পারেনি বর্ণবাদী আচরণ থেকে।

 

আরো পড়ুন : অবসর নিয়েও 'রেহাই' পাচ্ছেন না ওজিল

জার্মান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সমালোচনায় বিদ্ধ হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি মেসুত ওজিল। তবে অধিকাংশেরই ধারণা, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তায়েব এরদোগানের সাথে ছবি তুলে জার্মান ফুটবলারটি ভুল করেননি। তবে একাংশের মত, শিকড়ের খোঁজে তুরস্কের রাষ্ট্রপ্রধানের সাথে দেখা করা বা ছবি তোলা উচিত হয়নি ওজিলের। তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারার নাগরিকরা স্বাগত জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট ফুটবলারটির সিদ্ধান্তকে।

তবে সোমবার প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে ডিএফবি জানিয়েছেন, ‘মেসুত ওজিলের বিরুদ্ধে কোনো বর্ণবৈষম্যমূলক মন্তব্য করেননি সংস্থার প্রধান রেনহার্ড গ্রিন্ডল। তবে তুরস্কের রাষ্ট্রপ্রধানের সাথে ছবি তোলার জন্য অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে ওজিল এবং গুন্ডোগানকে। জার্মানির জাতীয় ফুটবল দলের প্রতি ওজিলের দায়বদ্ধতা নিয়ে কোনো প্রশ্নই তোলা হয়নি।’

গত রোববার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অবসর ঘোষণা করেছেন জার্মানির এই তারকা ফুটবলার। তার বক্তব্য, ‘কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে এরদোগানের সাথে দেখা করিনি। আমার হৃদয়ে জার্মানির পাশাপাশি তুরস্কের জন্য বিশেষ স্থান রয়েছে। নিজের শিকড় কী ভুলে যাওয়া সম্ভব? তা সত্ত্বেও বর্ণবৈষম্যমূলক মন্তব্য ক্রমাগত শুনে যেতে হচ্ছে। যা আদৌ কাঙ্ক্ষিত নয়। বর্ণবিদ্বেষ কখনও মেনে নিইনি। এখনও নেব না। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগানের সাথে দেখা করা কিংবা ছবি তোলার জন্য ডিএফবি এবং বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে যে বর্ণবিদ্বেষী সমালোচনা শুনেছি তা মানতে পারছি না। প্রত্যেকেরই সহ্যের সীমা রয়েছে। জার্মানির হয়ে মাঠে এত বছর ঘামরক্ত নিংড়ে দেয়ার পরেও আমার দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অযৌক্তিক। আবার বলছি, ২০১০ সালে তুরস্কের প্রেসিডেন্টের সাথে আমার আলাপ হয়েছিল। তারপর থেকেই সম্পর্ক নিবিড় হয়। তাই তার সাথে দেখা করা বা ছবি তোলার জন্য বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই।’

উল্লেখ্য, তুরস্কের প্রেসিডেন্টের সাথে ছবি তোলার জন্য জার্মান সমর্থকরা ওজিলের দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। ডিএফবি’র প্রেসিডেন্ট রেনহার্ড গ্রিন্ডল এক সাক্ষাৎকারে ওজিলের সমালোচনা করে বলেছিলেন, ‘তুরস্ক থেকে যারা জার্মানিতে এসেছে তাদের উচিত রাজনৈতিক মতাদর্শ মেনে চলা। ওই দেশের পাতা ফাঁদে পা দিলে সমস্যা বাড়তেই পারে।’ এরপর অবশ্য ওজিলের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন জার্মানির কোচ জোয়াকিম লো এবং জার্মান প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক-ওয়াল্টার স্টেইনমিয়ার। এই দু’জনকে পাশে পেয়ে ওজিলের মন্তব্য ছিল, ‘ম্যাচ জিতলে আমি জার্মান। আর হারলেই অভিবাসী।’