আসাদুল ইসলাম সবুজ লালমনিরহাট
‘কোথায় স্বর্গ, কোথায় নরক কে বলে তা বহুদূর/ মানুষের মাঝে স্বর্গ-নরক, মানুষেতে সুরাসুর’- মানবতাবাদী এ পঙক্তির স্রষ্টা কবি শেখ ফজলল করিম। কিন্তু সময়ের স্রোতে কবির সৃষ্টি টিকে থাকলেও তাঁর স্মৃতিচিহ্নগুলো আজ অযতœ-অবহেলায় হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। লালমনিরহাটের কালীগঞ্জের কাকিনায় কবির বাস্তুভিটায় জীর্ণ ঘরে পড়ে আছে তার ব্যবহৃত নানা সামগ্রী। আর বাজারের পাশে নির্মিত স্মৃতি গণপাঠাগারটিও দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ।
১৮৮২ সালের ১৪ এপ্রিল তৎকালীন রংপুর জেলার কাকিনায় জন্ম নেয়া শেখ ফজলল করিম বাংলা সাহিত্যে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেন। চাকরি ছেড়ে সাহিত্য ও সমাজসেবায় যুক্ত হন তিনি। নিজস্ব সঞ্চয়ের অর্থে কাকিনায় ‘সাথাবিদ্য প্রিন্টিং ওয়ার্কস’ নামে ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯০৮ থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত সম্পাদনা করেন ‘বাসনা’ মাসিক পত্রিকা। তাঁর পদ্য ও গদ্য মিলিয়ে প্রায় ৪৫টি গ্রন্থের মধ্যে ‘তৃষ্ণা’, ‘পরিত্রাণ কাব্য’, ‘ভগ্নবীণা’, ‘লাইলী-মজনু’, ‘পথ ও পাথেয়’ ও ‘আফগানিস্তানের ইতিহাস’ উল্লেখযোগ্য।
কবির বাস্তুভিটায় গিয়ে দেখা যায়, একটি জীর্ণ আধাপাকা ঘরে তালাবদ্ধ অবস্থায় সংরক্ষিত রয়েছে তাঁর ব্যবহৃত কাঠের খাট, আরামচেয়ার, টুপি, দোয়াত-কলম, ক্ষুদ্রাকৃতির কুরআন শরিফ, ম্যাগনিফায়িং গ্লাসসহ বিভিন্ন সামগ্রী। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় উত্তরসূরিরাই ব্যক্তিগত উদ্যোগে এসব স্মৃতিচিহ্ন আগলে রেখেছেন। তবে দীর্ঘদিন ধরে এ দায়িত্ব পালন করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে, কাকিনা বাজারে লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়কের পাশে ২০০৫ সালে নির্মিত ‘কবি শেখ ফজলল করিম স্মৃতি গণপাঠাগার’ও দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ। পাঠাগারের প্রবেশপথের পাশে দোকানপাট গড়ে উঠেছে। চারপাশে জমেছে বর্জ্য। ফলে যে স্থাপনাটি হওয়ার কথা ছিল জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র, সেটিই এখন কার্যত অচল।
কবির প্রপৌত্র শেখ ফিরোজ বলেন, ‘দেশ-বিদেশ থেকে সাহিত্যানুরাগীরা এখানে আসেন। কিন্তু আর্থিক সঙ্কটের কারণে পরিবারের পক্ষে এসব স্মৃতি রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। সরকারের উচিত দ্রুত জাদুঘর নির্মাণ করে স্মৃতিচিহ্নগুলো সংরক্ষণ করা।’ দর্শনার্থী মোখলেছুর রহমান বলেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই সাহিত্যিকের স্মৃতিচিহ্ন এভাবে নষ্ট হওয়া দুঃখজনক। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বা প্রতœতত্ত্ব অধিদফতর উদ্যোগ নিলে এগুলো সংরক্ষণ করা সম্ভব।
কবির স্মৃতি সংরক্ষণে স্থানীয়দের পাশাপাশি বিভিন্ন মহল সরকারি উদ্যোগের দাবি জানিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বাস্তুভিটা, স্মৃতিচিহ্ন ও পাঠাগারকে সমন্বিতভাবে সংরক্ষণ করা গেলে নতুন প্রজন্ম শেখ ফজলল করিমের সাহিত্যকর্ম ও জীবন সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবে। অন্যথায় অবহেলা ও সময়ের ক্ষয়ে হারিয়ে যেতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক ঐতিহ্য।