খাদেমুল হক বাবুল জামালপুর
দেশের চলমান বিদ্যুৎসঙ্কটের মধ্যে জামালপুরে নির্মাণাধীন ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। তবে ৬০ শতাংশ ভৌত অবকাঠামোর কাজ শেষ হওয়ার পরও প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার জোড়খালি ইউনিয়নের কাইজারের চরে ৩২৫ দশমিক ৬৫ একর পতিত জমির ওপর এই মেগা বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণের উদ্যোগ নেয় রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (আরপিসিএল)। এক হাজার ৬১২ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ে গৃহীত এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল বার্ষিক প্রায় এক লাখ ৭৮ হাজার ২৭৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেন্দ্রটি দ্রুত চালু হলে বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও উত্তরাঞ্চলের লোডশেডিং সঙ্কট নিরসনের পাশাপাশি জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় পরিবর্তন আসবে।
২০২১ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটি নানা অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক প্রতিকূলতার মুখে পড়ে। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা, মার্কিন ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, পরপর কয়েকটি বিধ্বংসী বন্যা, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং বিদেশী অর্থায়নের জটিলতায় নির্মাণকাজের গতি মারাত্মকভাবে কমে যায়। একপর্যায়ে ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রকল্পটির কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে পড়ে।
পরবর্তীতে চলতি বছরের ১৯ আগস্টে একনেক সভায় সংশোধিত আকারে এক হাজার ৬১২ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি আবার অনুমোদন দেয়া হয়। নীতিগত ও অর্থায়নের সব বাধা দূর হলেও বাস্তবে প্রকল্পের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি লক্ষ করা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের গতি থমকে যাওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বিদেশী পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের চুক্তির মেয়াদ ২০২৫ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা। এরপর দীর্ঘ ১৪ মাস কোনো পরামর্শক ছিল না। গত ২৫ আগস্ট ‘অ্যাটলান্টা এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে নতুন পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলেও এত বড় মেগা প্রকল্পে তাদের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
এর পাশাপাশি আরপিসিএল ২০২৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর এক চিঠির মাধ্যমে মূল ভারতীয় ইপিসি ঠিকাদার অমারা রাজা ইনফ্রা প্রাইভেট লিমিটেডের উপকরণ সরবরাহ স্থগিত করে। ওই সময় থেকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পাওনা বকেয়া অর্থ পরিশোধ না করায় নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে। বর্তমানে ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি দু’টি বিশাল ব্যাচিং প্ল্যান্ট, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও বিপুল জনবল নিয়ে অলস বসে আছে। কাজ বন্ধ থাকলেও এসব সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ ও কর্মী বাবদ প্রতিদিন বিপুল আর্থিক লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের।
এদিকে দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকায় সঞ্চালন লাইন প্রকল্পটিও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য টাঙ্গাইলের ঘাটাইল গ্রিড উপকেন্দ্র পর্যন্ত ৪৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ১৩২ কেভি সঞ্চালন লাইনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। কিন্তু বর্তমানে চরের অরক্ষিত এলাকায় বসানো টাওয়ারের নানা মূল্যবান উপকরণ ও আমদানিকৃত সরঞ্জাম চুরির হাত থেকে রক্ষা করতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। খোলা আকাশের নিচে থেকে রোদে-বৃষ্টিতে দামি যন্ত্রাংশের গুণগত মানও নষ্ট হচ্ছে। সরজমিনে দেখা যায়, মূল বিদ্যুৎকেন্দ্র ও নদীভাঙন রোধে আরসিসি ব্লক ফেলানো, মাটি ভরাট এবং সোলার প্যানেলের ফ্রেম বসানোর বড় কাজগুলো আগেই সম্পন্ন হয়েছে। এখন কেবল চূড়ান্ত পর্বের প্যানেল স্থাপন ও সংযোগের কাজ বাকি।
এদিকে জমি অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্ত ২৪১টি ভূমিহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করতে পাকা বাড়ি, বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, মসজিদ ও বাজারের সুবিধাসহ পরিকল্পিত আবাসন গড়ে তোলার কাজ চলছে। তবে আবাসন পুরোপুরি হস্তান্তরিত না হওয়ায় চরে এখনো ৮-১০টি পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে। স্থানীয় বাসিন্দা মোছা: সবুরা খাতুন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের সাত জনের পরিবারের জন্য মাত্র একটি ঘর দেয়া হয়েছে। এই কষ্টে দিন কাটাচ্ছি। অন্য এক বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা চাই দ্রুত কাজ শুরু হোক। এটি মূলত একটি ‘কৃষি-সৌর’ প্রকল্প। এখানে সৌর প্যানেলের নিচে ছায়াসহিষ্ণু হলুদ, আদা ও কাঁচামরিচ চাষের পাশাপাশি বর্ষাকালে নিচে মাছ চাষের পরিকল্পনা রাখা হয়েছে।
জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল (ইইই) বিভাগের চেয়ারম্যান মো: সিজার রহমান বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের সরকারি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এই কেন্দ্রটি গুরুত্বপূর্ণ। এটি ঘাটাইলের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে জামালপুর ও টাঙ্গাইল অঞ্চলে পিক-আওয়ারের বিদ্যুৎ ঘাটতি অনেকটাই দূর হবে। পাশাপাশি কয়লা বা তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রতি বছর বিপুল কার্বন নিঃসরণ রোধ করা সম্ভব হবে। তবে প্রোপার আইসোলেশন না থাকলে গ্রিডে ডিসি কারেন্ট ঢুকে বিদ্যুতের মান নষ্ট হতে পারে। এ ছাড়া ২৫-৩০ বছর পর মেয়াদোত্তীর্ণ সোলার প্যানেলের বর্জ্য সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না করলে তা বড় ধরনের পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি করবে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্পের পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, প্রকল্পের ছোটখাটো কিছু আনুষঙ্গিক কাজ চালু রয়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই মূল ঠিকাদারের মাধ্যমে পুরোদমে কাজ শুরু করা সম্ভব হবে। মূল কাজ শুরু হলে বকেয়া ও পরামর্শক সংক্রান্ত সব জটিলতার অবসান ঘটবে এবং দ্রুততম সময়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদনে যাবে।