বিশেষ সংবাদদাতা
 
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে  শক্তিশালী ও অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম বেগবান করার লক্ষ্যে বড় ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি সর্বাধুনিক ২০০০ হর্স পাওয়ার (এইচপি) ক্ষমতাসম্পন্ন ‘এসি-এসি ভিএফডি’ ক্যাটাগরির ল্যান্ড ড্রিলিং রিগ সংগ্রহের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এই জন্য ব্যয় হবে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। 
আজ বুধবার সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করা হতে পারে বলে জানা গেছে। 
প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে জ¦ালানি মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেশি সংখ্যক নতুন অনুসন্ধান ও মূল্যায়ন-কাম-উন্নয়ন কূপ খনন করা। যার মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধি করে জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের অবদান রাখা সম্ভব হবে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের (পরিকল্পনা-১ শাখা) প্রস্তুতকৃত নথি অনুসারে, “২০০০ হর্স পাওয়ার রিগ ক্রয়” শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সর্বমোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫৭৭.২৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি (জিওবি) অর্থায়ন/উন্নয়ন ঋণ : ৫২০.০০ কোটি টাকা (মোট ব্যয়ের ৯০%)। এবং কোম্পানির নিজস্ব অর্থায়ন (বাপেক্স) ৫৭.২৩ কোটি টাকা (মোট ব্যয়ের ১০%)
ওই প্রকল্পের পুনর্গঠিত ডিপিপি ২০২৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর বাপেক্স পরিচালনা পর্ষদে অনুমোদিত হয়। পরে ২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) কর্তৃক প্রকল্পটি অনুমোদন লাভ করে। সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষে ১৯ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে প্রকল্পটির প্রশাসনিক আদেশ জারি করা হয়। প্রকল্পের নির্ধারিত বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ১ অক্টোবর ২০২৫ থেকে ৩১ মার্চ ২০২৮ পর্যন্ত।
মাটি থেকে ৫,০০০ মিটারেরও বেশি গভীরতায় সফলভাবে খননকাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম এমন একটি আধুনিক রিগ টার্ন-কি (টার্নকী) ভিত্তিতে কেনা হচ্ছে। এই ক্রয় প্রক্রিয়ার জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র উন্মুক্ত করা হলে দেশী-বিদেশী মোট ৩৭টি প্রতিষ্ঠান দরপত্র শিডিউল ক্রয় করে।
গত ১৮ মে ২০২৬ তারিখে এক ধাপ দুই খাম (ঙঝঞঊঞগ) পদ্ধতিতে দরপত্র উন্মুক্ত করা হলে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় পাঁচটি আন্তর্জাতিক দরদাতা প্রতিষ্ঠান তাদের আর্থিক ও কারিগরি প্রস্তাব দাখিল করে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো :  যুযুহু কনস্ট্রাকশন মেশিনারি গ্রুপ, চীন সাংহাই হাবো অফশোর ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড, যুংহুয়া-সিএমসি জয়েন্ট ভেঞ্চার ও চীনের বাউজি ওয়েল্ডফিল্ড মেশিনারি কোম্পানি।
প্রাথমিক ও কারিগরি মূল্যায়নে প্রথম দু’টি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব দরপত্রের নির্ধারিত শর্ত পূরণ না করায় অগ্রহণযোগ্য বলে ঘোষিত হয়। বাকি তিনটি প্রতিষ্ঠান কারিগরি ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতার বিচারে উত্তীর্ণ হয়।
ক্রয় প্রক্রিয়া চলাকালে দরপত্রে অংশগ্রহণকারী একটি যৌথ প্রতিষ্ঠানের জেনারেটর সরবরাহসংক্রান্ত একটি অভিযোগ জমা পড়ে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাপেক্স পরিচালনা পর্ষদের ৫২২তম সভায় কারিগরি কমিটি ও মূল প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিষয়টির স্পষ্টীকরণ চাওয়া হয়। বিশেষ করে ক্যাটারপিলার জেনারেটর  সরবরাহের সময়সীমা ১৩ মাসের বিষয়টি আন্তর্জাতিক মূল প্রস্তুতকারক থেকে যাচাই-বাছাই নিশ্চিতকরণের পর চূড়ান্ত কারিগরি প্রতিবেদন পর্ষদ সভায় গৃহীত হয়।
আর্থিক মূল্যায়নে দেখা যায়, চীনের প্রতিষ্ঠান বাউজি ওয়েল্ডফিল্ডকে সর্ব সর্বনি¤œ গ্রহণযোগ্য দরদাতা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। সর্বনি¤œ দরদাতার প্রস্তাবিত মূল্যায়িত মূল্য : ৪৯৪.৩৭ কোটি টাকা (৪,০১,৮৪,৪৮২ ডলার, বিনিময় হার ১ ডলার = ১২২.৭৫ টাকা হিসেবে)।
যদিও জয়ী প্রতিষ্ঠানের দর দাফতরিক প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে ২.৮৫ শতাংশ বেশি, তবে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যস্ফীতি, মূলধনি যন্ত্রাংশের বাজার পরিস্থিতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনা করলে এই দর পুরোপুরি যুক্তিসঙ্গত ও বিদ্যমান বাজারমূল্যের সাথে সঙ্কতিপূর্ণ।
সূত্র জানায়, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর) অনুসরণ করে সর্বমোট ৪৯৪ কোটি ৩৭ লাখ ১৯ হাজার ৬১৮ টাকা ৩৩ পয়সায় চুক্তি সম্পাদনের জন্য সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের জন্য সুপারিশ পেশ করা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান কেবল রিগ ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রাংশ সরবরাহ করবে না বরং চুক্তি স্বাক্ষরের দিন থেকে ২০২৮ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট কূপে খননকাজ পরিচালনা, কমিশনিং, টেস্টিং এবং প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ সেবার  পূর্ণ দায়িত্ব পালন করবে।
জ¦ালানি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা এ বিষয়ে বলেছেন, দেশীয় খনিজসম্পদ উত্তোলনে বাপেক্সের নিজস্ব শক্তিশালী রিগ বহর থাকা অত্যন্ত জরুরি। ২০০-এসি-এসি ভিএফডি প্রযুক্তির নতুন এই রিগ বহরে যুক্ত হলে বিদেশী ঠিকাদারদের ওপর নির্ভরতা কমবে, দ্রুততম সময়ে নতুন খনিতে ড্রিলিং চালানো যাবে এবং দেশের চলমান গ্যাস সঙ্কট নিরসনে একটি সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।