ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

‘৫ আগস্ট থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলে এবং রিমান্ডে আমাকে চরম নির্যাতন করা হয়েছে এবং হুমকি দেয়া হয়েছে নির্যাতনের কথা বাইরে বললে আমার পরিবারের সদস্যদের গুম করে ফেলা হবে। এর পরও আপনাদের সামনে সত্যটা তুলে ধরতে এসেছি, আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় পাই না, সত্য সবার সামনে তুলে ধরতে চাই।’ জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক যুগ্ম সদস্যসচিব গাজী সালাহউদ্দিন তানভীর কারাগার ও রিমান্ডে নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে এ অভিযোগ করেছেন।
গতকাল শুক্রবার সকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।  তার ‘শারীরিক অবস্থা ও তার ওপর হওয়া বর্বর নির্যাতনসহ সার্বিক বিষয়ে’ এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এ সময় তার হাতে স্যালাইন লাগানো ছিল। সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যের পর গত ৫ আগস্ট সাইবার সুরক্ষা আইনের মামলায় গ্রেফতার হয়েছিলেন গাজী সালাহউদ্দিন তানভীর। গত ১৫ সেপ্টেম্বর তিনি জামিনে কারামুক্ত হন। মুক্ত হওয়ার পর তিনি অভিযোগ করেন, জেলে ও রিমান্ডে তাকে ব্যাপক নির্যাতন করা হয়েছে।
তানভীর জানান, ‘আমার শরীরে অসংখ্য ইনজেকশন পুশ করা হয়েছে। এসব কিসের ইনজেকশন, তা আমি জানি না। অন্তত ৭০-৮০টি ইনজেকশন দেয়া হয়েছে আমাকে। সারাক্ষণ জ্বর থাকত আর তারা আমাকে ইনজেকশন দিত।’
গাজী সালাহউদ্দিন তানভীর অভিযোগ করে বলেন, ২ আগস্ট সাইবার সুরক্ষা আইনে তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। বগুড়া সদর থানা বিএনপির সভাপতি এইচ এস মাফুতুন আহমেদ খান এই মামলার বাদি। ৫ আগস্ট তাকে গ্রেফতার করে বগুড়ায় কারাগারের এমন একটি সেলে নেয়া হয়, যেটি চরম অপরিচ্ছন্ন এবং আলো-বাতাসহীন। সেখানে বিদ্যুৎ ও পাখা ছিল না।
কারারক্ষীদের আওয়ামী লীগের সমর্থক দাবি করে এনসিপির এই নেতা বলেন, তাদের বেশির ভাগই সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের এবং তাকে জুলাই জঙ্গি বলে গালাগাল করতেন। আশপাশের কয়েদিরাও আওয়ামী লীগের আসামি ছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, তারাও তাকে বিভিন্নভাবে সম্বোধন করতেন।
গাজী সালাহউদ্দিন তানভীর বলেন, ‘৫ আগস্ট যেদিন প্রথম জেলে নেয়া হলো, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবসে সবাইকে ভালো খাবার দেয়া হলো; কিন্তু আমাকে দুই দিনের পচা খাবার দেয়া হলো। কারাগারে এমন পচা-বাসি খাবার-দাবার দেয়া হতো, যা খাওয়ার অযোগ্য।’
একপর্যায়ে তার ডায়রিয়া হয় বলে জানান তানভীর। চিকিৎসার জন্য তাকে শহীদ জিয়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলেও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ দেয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার ভাষ্য, অজ্ঞাত ওষুধ খাওয়ানো এবং শরীরে অসংখ্য ইনজেকশন দেয়া হয়েছে।
এক দিন হাত-পা কাঁপার কারণে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নষ্ট এমআরআই মেশিনে তাকে ঢোকানো হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তানভীর। তিনি বলেন, মেশিনের ভেতরে থাকা অবস্থায় বিকট শব্দ হয়ে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর কোমর থেকে পা পর্যন্ত তার শরীর অবশ হয়ে যায় এবং তিনি ১০-১২ ঘণ্টা অচেতন ছিলেন। পরে উন্নত চিকিৎসার কথা বলে তাকে ঢাকায় আনা হয় বলে জানান তিনি। তাকে কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়। সেখান থেকে এক দিন চিকিৎসার জন্য শাহবাগে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে নেয়া হয়।
তানভীরের অভিযোগ, চিকিৎসক দেখিয়ে কারাগারে ফেরার সময় গাড়িতে সাদাপোশাকে কয়েকজন ব্যক্তি ওঠেন এবং তাকে নির্যাতন করেন। তাদের একজন তাকে বলেন, ‘বসুন্ধরার মালিককে তুইতোকারি করেছিল, এত বড় সাহস তোর।’ তানভীর বলেন, বসুন্ধরার মালিক আহমেদ আকবর সোবহান ও তার ছেলে আনভীরের নাম উল্লেখ করে তাকে নির্যাতন করা হয়েছে। তার অভিযোগ, ওই ঘটনার পর কারাগারেও তাকে একটি অন্ধকার কক্ষে নিয়ে নির্যাতন করা হতো।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সচিবালয়ে প্রবেশ করে জেলা প্রশাসক নিয়োগে হস্তক্ষেপ এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) পাঠ্যবই ছাপার কাজে কমিশন-বাণিজ্যে জড়ানোর অভিযোগ উঠলে আলোচিত হন গাজী সালাহউদ্দিন তানভীর। সমালোচনার মুখে ২০২৫ সালের এপ্রিলে তাকে এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিবের পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। এক বছর তিনি দলের বাইরে ছিলেন। পরে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় গত ১৬ এপ্রিল সালাহউদ্দিনকে আবার দলে নেয়া হয়।
দলে ফেরার সাড়ে তিন মাসের মাথায় গত ৩১ জুলাই প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে ফেসবুকে একটি আপত্তিকর পোস্ট দেন সালাহউদ্দিন তানভীর। সেদিন রাতে তাকে এনসিপি থেকে দ্বিতীয়বারের মতো সাময়িক অব্যাহতি ও কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়। তবে এনসিপির ফেসবুক পেজে সাময়িক অব্যাহতির সেই চিঠি প্রকাশের কাছাকাছি সময়ে সালাউদ্দিন তানভীরও নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এক পোস্টে তার বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। এর পাঁচ দিনের মাথায় ৫ আগস্ট ঢাকার পূর্ব মণিপুর এলাকা থেকে তানভীরকে গ্রেফতার করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার, উত্তরাঞ্চলের যুগ্ম মুখ্য সংগঠক আবু সাঈদ লিয়ন, কেন্দ্রীয় মিডিয়া উপকমিটির সদস্য ইয়াসির আরাফাত, এনসিপির চিকিৎসক সংগঠন ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের সদস্যসচিব আবদুল আহাদসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।