মো: শাহজাহান সিরাজ  কিশোরগঞ্জ (নীলফামারী)
নীলফামারীর কিশোরগঞ্জে বিদেশে লোক পাঠানোর নামে প্রতারণায় ব্যবহৃত ভুয়া ব্যাংক হিসাবের ফাঁদে পড়ে শতাধিক পরিবার হয়রানি ও আর্থিক ক্ষতির শিকার হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সের মাঠকর্মী মোজাহারুল ইসলাম মোজা বীমার গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে তাদের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে হিসাব খোলেন। পরে সেই হিসাব ও চেকবই ব্যবহার করে বিদেশে লোক পাঠানোর কথা বলে লাখ লাখ টাকা লেনদেন করা হয়েছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। প্রতারণার শিকার ব্যক্তিরা ওই হিসাবের মালিকদের বিরুদ্ধে মামলা করায় নিরীহ নারীদের অনেকে এখন বিভিন্ন আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, কিশোরগঞ্জ উপজেলার ইসমাইল দোলাপাড়া গ্রামের মৃত আবুল হোসেনের ছেলে মোজাহারুল ইসলাম ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সের মাঠকর্মী ছিলেন। তিনি বীমার টাকা ও লভ্যাংশ দেওয়ার কথা বলে গ্রাহকদের ভোটার আইডি, ছবি, নমিনি ও অন্যান্য কাগজপত্র সংগ্রহ করেন। পরে এসব কাগজ দিয়ে তাদের নামে ব্যাংক হিসাব খুলে হিসাবের কাগজপত্র ও চেকবই নিজের কাছে রাখেন।
সাবিনা বেগম, আনোয়ারা বেগম ও এজনা খাতুন জানান, তারা মোজাহারুলের মাধ্যমে বীমা করেছিলেন। ব্যাংক হিসাব খোলার কথা বলে তাদের কাছ থেকে কাগজপত্র নেয়া হলেও হিসাবগুলো কীভাবে ব্যবহার হয়েছে, তা তারা জানতেন না। সম্প্রতি নোয়াখালীর আদালত থেকে তাদের নামে কিশোরগঞ্জ থানায় গ্রেফতারি পরোয়ানা আসার পর বিষয়টি জানতে পারেন। তাদের নামে ২০২৫ সালে নোয়াখালীতে সিআর-৫৭৩ নম্বর মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৬/৪২০/১০৯ ধারায় মামলা করা হয়েছে বলে তারা জানান।
ভুক্তভোগীদের দাবি, কিশোরগঞ্জ উপজেলায় ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সের প্রায় ১১০ জন সদস্য ছিলেন। তাদের মধ্যে ৪০-৫০ জনের নামে নারায়ণগঞ্জ, ঝিনাইদহ, জামালপুর ও যশোরের আদালতে প্রতারণার মামলা চলমান রয়েছে।
বাহাগিলি ইউনিয়নের উত্তর দুরাকুটি পশ্চিমপাড়া গ্রামের দিনমজুর জামিয়ার রহমান বলেন, তার নামে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকে হিসাব খুলে মোজাহারুল কয়েক লাখ টাকা লেনদেন করেন। পরে নারায়ণগঞ্জের এক ব্যক্তি তার বিরুদ্ধে মামলা করলে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। তার বক্তব্যের ভিত্তিতে পুলিশ মোজাহারুলকে গ্রেফতার করে এবং টাকা উদ্ধারের পর বাদি নিজে উদ্যোগ নিয়ে তাকে মুক্ত করার ব্যবস্থা করেন বলে জানান তিনি।
তারা বিবি নামে এক মহিলা জানান, তার ও প্রতিবেশী মেরিনা রহমানের ভোটার আইডি, ছবি ও অন্যান্য কাগজপত্র নিয়ে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকে হিসাব খোলা হয়। তাদের অজান্তেই সেখানে কয়েক লাখ টাকা লেনদেন করা হয়েছে। বিষয়টি জানার পর তারা মোজাহারুল ও তার সহযোগীদের বিপক্ষে কিশোরগঞ্জ থানায় মামলা করেন।
তারা বিবির অভিযোগ, মামলা করার পর তার ও তার বোন মেরিনার নামে গাড়াগ্রাম টেপারহাট ও বড়ভিটা কৃষি ব্যাংকে হিসাব খুলে যথাক্রমে ৩৫ লাখ ও ১০ লাখ টাকার চেক জালিয়াতির মামলা করা হয়েছে। অথচ তারা ওই ব্যাংক দু’টিতে কখনো যাননি।
ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, গাড়াগ্রাম টেপারহাট শাখায় ৩৫ লাখ টাকার একটি চেক ডিজঅনার হয়েছে। ওই হিসাব থেকে এর আগে কোনো লেনদেন হয়নি। বড়ভিটা শাখায় মেরিনার নামে ১০ লাখ টাকার একটি চেক ডিজঅনার হয়। ওই হিসাবেও আগে কোনো লেনদেনের তথ্য নেই।
রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের বড়ভিটা শাখার ব্যবস্থাপক দেলোয়ার হুসাইন বলেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ভিত্তিতে মেরিনার নামে হিসাব খোলা হয়েছে। ১০ লাখ টাকার চেকটি কিশোরগঞ্জ সোনালী ব্যাংক থেকে পাঠানো হয়েছিল। হিসাবে টাকা না থাকায় তা ডিজঅনার করা হয়েছে।
গাড়াগ্রাম টেপারহাট শাখার ব্যবস্থাপক মো: মোকলেছুর রহমান বলেন, তারাবিবি ব্যাংকে এসেছিলেন এবং হিসাবের স্বাক্ষর মিলিয়ে দেখা হয়েছে। স্বাক্ষর জালিয়াতির বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে চাননি।
অভিযোগের বিষয়ে মোজাহারুল ইসলামের বক্তব্য জানতে তার বাড়িতে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। ফলে তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
কিশোরগঞ্জ থানার ওসি আব্দুর গফুর বলেন, তিনি কয়েক মাস আগে থানায় যোগ দিয়েছেন। আগের ওসির সময়ে মোজাহারুলকে গ্রেফতার করা হয়েছিল বলে তিনি জেনেছেন। ২০২৫ সালের ২১ আগস্ট কিশোরগঞ্জ থানায় তার বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়। মামলাটি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।