লালপুর (নাটোর) সংবাদদাতা
নাটোরের লালপুর উপজেলা এখন ইমো, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ হ্যাকিংসহ অনলাইন প্রতারণার এক নীরব ও ভয়ঙ্কর ট্রেন্ডিং জোনে পরিণত হয়েছে। পড়াশোনার প্রাথমিকের গণ্ডি না পেরোনো শত শত তরুণ ও যুবক এখন এ প্রতারণার সাথে জড়িত।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলার বিলমাড়ীয়া ও দুড়দুড়িয়া ইউনিয়ন এবং পার্শ্ববর্তী রাজশাহীর বাঘা উপজেলার কিছু অংশে গড়ে ওঠা অপরাধ চক্রের সাথে জড়িত তরুণদের সিংহভাগেরই দৃশ্যমান কোনো আয়ের উৎস নেই। কিন্তু তাদের লাইফস্টাইল দেখলে যে কারো চোখ কপালে উঠবে। গ্রামের মেঠোপথের ধারে তারা তৈরি করেছেন আধুনিক স্থাপত্যের চোখ ধাঁধানো আলিশান বাড়ি আর বাড়ির চৌসীমানার ওপর নজরদারি রাখতে এসব বাড়ির বিভিন্ন সাইটে বসানো হয়েছে সিসি ক্যামেরা।
শুধু তাই নয়, এসব বাড়ির মালিক তরুণদের হাতে শোভা পাচ্ছে পাঁচ থেকে আট লাখ টাকা দামের নামী ব্র্যান্ডের মোটরবাইক। তারা ব্যবহার করেন নামী ব্র্যান্ডের স্টাইলিশ পোশাক ও জুতা। কোনো পরিশ্রম ছাড়া, রাতারাতি ধনী হওয়ার এ অন্ধ প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে স্থানীয় কিশোর ও যুবকদের একটা বড় অংশ। আর তাদের এ রাজকীয় জীবনযাপনের পেছনে বিপুল অর্থের জোগান আসছে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে থাকা লাখ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশীদের রক্ত পানি করা রেমিট্যান্সের টাকা থেকে। প্রবাসীর কান্নাতেই মূলত গড়ে উঠছে হ্যাকারদের এ বিলাসবহুল অট্টালিকা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা হয় এক ইমু হ্যাকারের সাথে। তিনি জানান, এ ডিজিটাল অপরাধী চক্রের মূল টার্গেট প্রবাসীরা। তারা মূলত কয়েকটি ধাপে এ প্রতারণা চালায়। চক্রের তরুণ সদস্যরা সুন্দর কোনো মেয়ের ছবি ব্যবহার করে ভুয়া ফেসবুক বা ইমু অ্যাকাউন্ট খোলে। এরপর টার্গেট করা প্রবাসীকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে শুরু হয় মিষ্টি আলাপ ও প্রেমের অভিনয়। গভীর সম্পর্কের একপর্যায়ে ভিডিওকলে কথা বলার লোভ দেখিয়ে কিংবা কোনো অ্যাপ ইনস্টল করার অজুহাতে কৌশলে প্রবাসীর মোবাইলে একটি ওটিপি কোড পাঠিয়ে দেয়। ইমো অ্যাকাউন্ট সচল করার সে ওটিপি কোডটি প্রবাসীর কাছ থেকে কৌশলে জেনে নিলেই তার ইমো অ্যাকাউন্টের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চলে যায় হ্যাকারের হাতে। এরপর শুরু হয় তাদের অর্থ হাতানোর কাজ। প্রবাসীর ইমো আইডি হ্যাক করার পর হ্যাকাররা তার বাংলাদেশে থাকা মা, বাবা, স্ত্রী বা ভাইয়ের আইডিতে মেসেজ পাঠায়। প্রবাসীর কণ্ঠ বা বাচনভঙ্গি নকল করে তারা বলে- ‘আমি খুব বিপদে পড়েছি, পুলিশ ধরেছে’ কিংবা ‘হাসপাতালে আছি, জরুরি অপারেশন লাগবে, এখনই এ বিকাশ নম্বরে এ (টাকার অংশ) পরিমাণ টাকা পাঠাও।’ দেশের মাটিতে থাকা স্বজনরা প্রবাসীর হেন বিপদের কথা শুনে মুহূর্তের মধ্যে হ্যাকারদের দেয়া বিকাশ বা নগদ নম্বরে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা পাঠিয়ে দেন।
দুড়দুড়িয়া ইউনিয়নের লালন আলী বলেন, এ প্রতারকদের সিংহভাগ মাদকাসক্ত এবং এদেরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে মাদক ক্রয়-বিক্রয়সহ বিভিন্ন অপরাধের সিন্ডিকেট। উপজেলা নওপাড়া গ্রামের রফিকুল ইসলাম বলেন, যেসব ছেলেদের বাবা কৃষিকাজ বা দিনমজুর না করলে এক বেলা ভাত জুটত না, তাদের ছেলেদের এখন রাজকীয় বাড়ি-গাড়ি, খাওয়াদাওয়া এবং চলাফেরা দেখলে চোখ কপালে ওঠার মতো।
লালপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো: শফিকুল ইসলাম জানান, গত ছয় মাসে লালপুর থানা পুলিশ ধারাবাহিকভাবে সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত প্রায় ৫০টি অভিযান চালিয়ে ৭৬ জন হ্যাকার ও প্রতারককে গ্রেফতার করেছে এবং সাইবার সুরক্ষা আইনে ২৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে বিভিন্ন মোবাইল অপারেটরের ডজন ডজন ভুয়া বা বেনামি সিম কার্ড এবং অ্যান্ড্রয়েড ফোন।
ওসি আরো বলেন, কেবল পুলিশি অভিযান দিয়ে এ সাইবার অপরাধ পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন পারিবারিক সচেতনতা ও সামাজিক প্রতিরোধ। বিশেষ করে প্রবাসীদের ইমো বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো অজানা লিংকে ক্লিক না করা এবং ওটিপি কোড বা পাসওয়ার্ড কারো সাথে শেয়ার না করার বিষয়েও অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে।





