হারুন ইসলাম  

* শিক্ষাছুটিতে অর্ধেকের বেশি শিক্ষক
* গেস্ট ফ্যাকাল্টি দিয়ে চলছে ক্লাস
* পাঠদান সচল আছে বলছে প্রশাসন বাস্তব চিত্র ভিন্ন

উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) একসাথে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষক বিদেশে অবস্থান করায় কয়েকটি বিভাগে নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রমে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। কোনো কোনো বিভাগে মোট শিক্ষকের প্রায় অর্ধেক দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাছুটিতে থাকায় সীমিত জনবল দিয়ে ক্লাস, পরীক্ষা, গবেষণা তত্ত্বাবধান ও একাডেমিক প্রশাসনিক কাজ চালাতে হচ্ছে। কোথাও আবার অন্য বিভাগ থেকে শিক্ষক এনে অতিথি বা গেস্ট ফ্যাকাল্টি হিসেবে ক্লাস নেয়ার প্রয়োজন হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য পর্যালোচনার ভিত্তিতে তৈরি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিভাগে মোট ২৪ জন শিক্ষকের মধ্যে ১৫ জনই বিভিন্ন কারণে নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রমের বাইরে রয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। ফলে বিভাগটির স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
শুধু ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিভাগ নয়, আবহাওয়া বিজ্ঞান, অপরাধবিজ্ঞান, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন, ইংরেজি, নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিংসহ আরো কয়েকটি বিভাগেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষক শিক্ষাছুটি, লিয়েন বা অন্যান্য কারণে নিয়মিত দায়িত্বের বাইরে রয়েছেন। এর ফলে কিছু বিভাগকে গেস্ট ফ্যাকাল্টির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে অন্য বিভাগ থেকে শিক্ষক এনে ক্লাস পরিচালনা করা হচ্ছে।
উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষকদের বিদেশে যাওয়ার সুযোগকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও একাডেমিক সক্ষমতা বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হয়। বিশেষ করে মাস্টার্স, এমফিল, পিএইচডি ও পোস্টডক্টরাল গবেষণার মাধ্যমে শিক্ষকরা নতুন জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করেন, যা দেশে ফিরে শিক্ষাদান ও গবেষণায় কাজে লাগানোর কথা। তবে একই সময়ে একটি বিভাগের অনেক শিক্ষক দীর্ঘমেয়াদি ছুটিতে গেলে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান, গবেষণা তত্ত্বাবধান এবং বিভাগীয় কার্যক্রমে জনবল সঙ্কট সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, কোনো শিক্ষক বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা বা গবেষণার জন্য যেতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদিত শিক্ষা ছুটি নিতে হয়। এ ক্ষেত্রে একাডেমিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণের পাশাপাশি সিন্ডিকেটের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। ২০২১ সালে সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তে উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষকদের শিক্ষা ছুটির মেয়াদ চার বছর থেকে বাড়িয়ে পাঁচ বছর করা হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপ-উপাচার্য শিক্ষা অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল জানিয়েছিলেন, মাস্টার্সসহ পিএইচডি শেষ করতে অনেক শিক্ষকের পাঁচ বছর বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে, যার কারণেই মেয়াদ বাড়ানো হয়। 
এ দিকে শিক্ষাছুটিতে থাকা শিক্ষকদের সংখ্যা ও একসাথে ছুটিতে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ। তাদের মতে, একজন শিক্ষক দীর্ঘ সময় ছুটিতে থাকলে সংশ্লিষ্ট বিভাগে তার কোর্স অন্য শিক্ষককে নিতে হয়। একই সময়ে একাধিক শিক্ষক ছুটিতে গেলে সেই চাপ আরো বাড়ে। বিশেষ করে যেসব বিভাগে শিক্ষক সংখ্যা তুলনামূলক কম, সেখানে এর প্রভাব বেশি পড়ে।
শিক্ষার্থীদের গবেষণা তত্ত্বাবধানের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে। একজন শিক্ষক দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকলে তার অধীনে থাকা শিক্ষার্থীদের থিসিস, গবেষণা বা একাডেমিক গাইডেন্সের দায়িত্ব অন্য শিক্ষকের ওপর দিতে হয়। এতে বিভাগে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত এবং শিক্ষকদের অতিরিক্তগুলো সামনে আসে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, একজন শিক্ষককে উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনি একই সময়ে একটি বিভাগের কতজন শিক্ষক ছুটিতে যেতে পারবেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সীমা থাকা দরকার। একসাথে বেশি শিক্ষক ছুটিতে গেলে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং বিভাগের নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রমে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়।
আন্তর্জাতিক বিজনেস বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবুল খায়েরও শিক্ষকদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে বলেন, শিক্ষকরা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গেলে একদিকে তাদের দক্ষতা বাড়ে, অন্য দিকে বিভাগে অতিরিক্ত একাডেমিক চাপ সৃষ্টি হয়। তাই উচ্চশিক্ষার সুযোগ এবং বিভাগের স্বাভাবিক কার্যক্রম- দুই বিষয়েই সমন্বয় প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাছুটির নীতিতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি ছুটি শেষে শিক্ষকদের কর্মস্থলে ফিরে দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের ছুটির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো দীর্ঘমেয়াদি ছুটিতে থাকা শিক্ষকরা ফিরে এসে অর্জিত জ্ঞান ও গবেষণার অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারেন। 
এ দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৪ সালের লিয়েন-সংক্রান্ত নীতিমালাতেও দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নিয়মনীতি নির্ধারণের কথা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদি ছুটির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও একাডেমিক কার্যক্রমের বিষয়টি বিবেচনায় নেয়ার সুযোগ রয়েছে। 
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, কোনো বিভাগে শিক্ষক সঙ্কট সৃষ্টি হলে প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন শিক্ষক নিয়োগ, অতিথি শিক্ষক দিয়ে ক্লাস পরিচালনা অথবা সংশ্লিষ্ট বিভাগের শিক্ষকদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টনের মাধ্যমে সাময়িক সমাধান করা যেতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সঙ্কট এড়াতে বিভাগভিত্তিক শিক্ষক চাহিদা নির্ধারণ করে আগে থেকেই নিয়োগ পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।
অধ্যাপক মজিবুর রহমানের মতে, কোনো বিভাগে নিয়মিতভাবে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষক দীর্ঘ সময়ের জন্য বাইরে থাকলে তাদের জায়গায় বিকল্প শিক্ষক নিয়োগের পরিকল্পনা করা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে এমন ব্যবস্থা করা সম্ভব হলে শিক্ষকরা উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের একাডেমিক কার্যক্রমও সচল রাখা সম্ভব।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালামও বলেছেন, নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে শিক্ষকরা উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষাছুটির আবেদন করতে পারেন। সংশ্লিষ্ট কমিটির সুপারিশের পর বিষয়টি সিন্ডিকেটে অনুমোদনের জন্য যায়। ফলে শিক্ষককে উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিভাগের শিক্ষকসংখ্যা, সামগ্রিক পরিস্থিতি এবং একাডেমিক কার্যক্রম বিবেচনায় নেয়ার সুযোগ রয়েছে।
শিক্ষকদের বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বন্ধ করার পরিবর্তে একসাথে কতজন শিক্ষক ছুটিতে যেতে পারবেন, কোন সময়ে ছুটি দেয়া হবে এবং তাদের অনুপস্থিতিতে কিভাবে ক্লাস-পরীক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম চলবে- এসব বিষয়ে বিভাগভিত্তিক সুস্পষ্ট পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। এতে একদিকে শিক্ষকদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ বজায় থাকবে, অন্য দিকে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত শিক্ষাকার্যক্রমেও বড় ধরনের বিঘœ সৃষ্টি হবে না বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা।