কাওসার আজম
কৃষকের হাতে নগদ টাকা না দিয়ে নির্ধারিত কৃষি উপকরণ কেনার জন্য প্রণোদনার অর্থ দেয়ার মধ্য দিয়ে বড় পরিসরে ‘কৃষক কার্ড’ কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। আগামীকাল বৃহস্পতিবার ফেনীর ফুলগাজী থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। একই দিন দেশের ৫৬ জেলার ৭৭ উপজেলায় ভার্চুয়ালি উদ্বোধন করা হবে এ কর্মসূচির। প্রথম ধাপে এক লাখ ৪৭ জন কৃষকের ব্যাংক হিসাবে বছরে দুই হাজার ৫০০ টাকা করে প্রণোদনার অর্থ যাবে। তবে এ অর্থ সাধারণ নগদসহায়তার মতো ইচ্ছেমতো খরচ করা যাবে না। সার, বীজ, কীটনাশকসহ নির্ধারিত কৃষি উপকরণ কিনতেই ব্যবহার করতে হবে। উদ্বোধনের দিন প্রণোদনার অর্থ পেলেও প্রায় ৯২ হাজার কৃষক হাতে পাবেন না কৃষক কার্ডের হার্ড কপি। তাদের অর্থ কী পদ্ধতিতে ব্যবহার হবে, তা নিয়ে মাঠপর্যায়ে অস্পষ্টতা রয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের কৃষক কার্ড সেল, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর (ডিএই) ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্প সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
কেন্দ্রীয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার পাইলট উচ্চবিদ্যালয় মাঠে। ডিএই মহাপরিচালক কৃষিবিদ আব্দুর রহিম বলেন, ১ অক্টোবর ফুলগাজীতে কৃষক কার্ডের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হবে। একই সাথে ৫৬ জেলার ৭৭ উপজেলায় ভার্চুয়ালি উদ্বোধন করা হবে। উদ্বোধনের দিন কৃষকরা নগদ অর্থ পাবেন না। তাদের ব্যাংক হিসাবে প্রণোদনার অর্থ জমা হবে এবং সেই অর্থ দিয়ে কৃষি উপকরণ কিনতে হবে।
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে কৃষক কার্ডের জন্য ১৮ লাখ তিন হাজার কৃষক নিবন্ধিত হয়েছেন। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪৩ লাখ কৃষককে নিবন্ধনের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে বৃহস্পতিবার উদ্বোধনী পর্যায়ে এক লাখ ৪৭ জন কৃষক দুই হাজার ৫০০ টাকা অর্থাৎ প্রতি মাসে প্রায় ২০৮ টাকা করে প্রণোদনা পাবেন। এতে সরকারের ব্যয় হবে ২৫ কোটি টাকা।
ফেনীর ছয় উপজেলার সাত হাজার ৬৪৩ জন কৃষক ওই দিন হার্ডকপি কার্ড হাতে পাবেন। দেশের অন্যান্য এলাকার নির্বাচিত কৃষকদের হিসাবে শুধু প্রণোদনার অর্থ পৌঁছাবে। পরে পর্যায়ক্রমে তাদের কার্ড দেয়া হবে।
উদ্বোধনের দিন প্রণোদনা পেলেও প্রায় ৯২ হাজার কৃষক কেন হার্ড কপি কার্ড পাবেন না- এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা জানান, কৃষক কার্ড বিতরণ পর্যায়ক্রমে করা হবে। সোনালী ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও জনতা ব্যাংকের সক্ষমতা অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন ব্লকে কার্ড সরবরাহ করা হবে। এ তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক প্রণোদনার অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থার সাথেও যুক্ত রয়েছে।
তবে কার্ড হাতে না পাওয়া কৃষকদের প্রণোদনার অর্থ ব্যবহারের বাস্তব পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
কৃষক কার্ড সেলের একটি সূত্র জানিয়েছে, ফেনী ছাড়া দেশের অন্য উপজেলাগুলোতে এখনো পয়েন্ট অব সেল বা পিওএস মেশিন পাঠানো হয়নি। ফলে বিকল্প পদ্ধতিতে প্রণোদনার অর্থ ব্যবহারের কথা বলা হলেও সেই পদ্ধতি সর্বত্র সুনির্দিষ্ট নয়। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রণোদনার অর্থ শুধু কৃষি উপকরণ কেনার জন্য ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
কৃষক কার্ড জাতীয় কমিটির সদস্য ও পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ), বগুড়ার মহাপরিচালক ড. আব্দুল মজিদ প্রামাণিক বলেন, হার্ড কপি সরবরাহ না করলেও কৃষকের হিসাবে প্রণোদনার অর্থ চলে যাবে। প্রণোদনা পাওয়া কৃষকদের কিউআর কোড সরবরাহ করা হবে। ওই কিউআর কোড ব্যবহার করে ডিলার পয়েন্ট থেকে কৃষক কৃষি উপকরণ কিনতে পারবেন।
নির্ধারিত বিক্রয়কেন্দ্রে পিওএস ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষকের কেনাকাটার তথ্য সংরক্ষণ করা হবে। ফলে কোন কৃষক কী পরিমাণ উপকরণ কিনছেন, তা পরবর্তী সময়ে যাচাইয়ের সুযোগ থাকবে।
কৃষক কার্ডে থাকা কিউআর কোড স্ক্যান করে দ্রুত কৃষকের পরিচয় ও নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা যাবে। একই ব্যক্তির নামে একাধিক সুবিধা গ্রহণ, ভুয়া কৃষক তালিকাভুক্তি কিংবা একই কৃষকের তথ্য একাধিকবার অন্তর্ভুক্তির মতো অনিয়ম কমানোও এর অন্যতম উদ্দেশ্য। পর্যায়ক্রমে কৃষকের জমির পরিমাণ, উৎপাদনের ধরন, কৃষি কার্যক্রম, ব্যাংক হিসাব এবং সরকারি সহায়তা পাওয়ার তথ্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডারে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কৃষক কার্ডকে শুধু প্রণোদনা দেয়ার মাধ্যম হিসেবে দেখছে না কৃষি মন্ত্রণালয়। কার্ডের মাধ্যমে কৃষক, মৎস্যচাষি ও দুগ্ধ খামারিরা নগদ প্রণোদনা, ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ, সেচসুবিধা, সহজ শর্তে ঋণ, কৃষিবীমাসহ ১০ ধরনের বিশেষ সুবিধা পাবেন। কৃষককে পেশাজীবী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া, আয় বৃদ্ধি এবং সরকারি ভর্তুকি বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
কৃষক বাছাইয়ের ক্ষেত্রে জমির মালিকানাকে অন্যতম মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে কৃষি ব্লক ধরে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনায় ৫ শতাংশের কম জমির মালিককে ভূমিহীন, ৫ থেকে ৪৯ শতাংশ জমির মালিককে প্রান্তিক এবং ৫০ থেকে ১৪৯ শতাংশ জমির মালিককে ক্ষুদ্র কৃষক হিসেবে চিহ্নিত করার বিধান রাখা হয়েছে। তবে দেশের বিপুলসংখ্যক কৃষক বর্গাচাষি, ভাগচাষি বা অন্যের জমি ইজারা নিয়ে চাষ করেন। ফলে প্রকৃত কৃষক শনাক্তে মাঠপর্যায়ের তথ্য যাচাই কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটি কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তথ্যের নির্ভুলতা, কার্ডের অপব্যবহার বন্ধ এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার মাঠপর্যায়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ।
কৃষক কার্ড কার্যক্রমের পরীক্ষামূলক যাত্রা শুরু হয় গত ১৪ এপ্রিল। প্রি-পাইলট পর্যায়ে আট বিভাগের ১০ জেলার ১১টি উপজেলা ও ১১টি কৃষি ব্লকে ২২ হাজারের বেশি ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষককে কার্ড দেয়া হয়। টাঙ্গাইল থেকে পরীক্ষামূলকভাবে কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়েছিল। ওই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই এবার বড় পরিসরে কর্মসূচি শুরু হচ্ছে।
কৃষক কার্ডকার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে ‘প্রোগ্রাম অন অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ অ্যান্ড রেসিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ’ বা ‘পার্টনার’ প্রকল্পের আওতায়। বিশ্বব্যাংক, ইফাদ ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। উদ্বোধনী প্রস্তুতির অংশ হিসেবে প্ল্যাকার্ডসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ফেনীর ফুলগাজীতে পাঠানো হয়েছে। পার্টনার প্রকল্পের অংশ টারাপস থেকে অনুষ্ঠানে কারিগরি সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে। তবে কৃষকের প্রণোদনার অর্থ দেয়া হচ্ছে সরকারের রাজস্ব খাত থেকে। নির্দিষ্ট তিনটি ব্যাংকের মাধ্যমে কৃষক কার্ড সরবরাহ করা হলেও এ-সংক্রান্ত ব্যয় পরে প্রকল্প থেকে বহন করা হবে।
দীর্ঘমেয়াদে দেশের সব কৃষককে একটি সমন্বিত ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডারের আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। চলতি অর্থবছরে ৪৩ লাখ কৃষককে কার্ডের আওতায় আনার পর ধাপে ধাপে দেশের ৬৪ জেলার ৫০৩ উপজেলা এবং ১৮ হাজার ১৮০টি কৃষি ব্লকের কৃষকদের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে প্রায় দুই কোটি ৪০ লাখ কৃষককে কৃষক কার্ড দেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই তথ্যভাণ্ডারে একজন কৃষকের জমির পরিমাণ, ফসলের ধরন, উৎপাদন, ব্যাংক হিসাব, কৃষি উপকরণ গ্রহণ এবং সরকারি সহায়তা পাওয়ার তথ্য এক জায়গায় সংরক্ষিত থাকবে। ভবিষ্যতে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা, রোগবালাইসহ বিভিন্ন দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক শনাক্ত করে দ্রুত সহায়তা দেয়া, সার-বীজ বিতরণ, কৃষিঋণ, সেচসুবিধা, কৃষিবীমা ও অন্যান্য সরকারি সহায়তা প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রেও এ তথ্য কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে।





