বিশেষ সংবাদদাতা
দেশে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান প্রসার এবং ডিজিটাল লেনদেনের জনপ্রিয়তার মধ্যে ইসলামী ক্রেডিট কার্ড কার্যক্রমকে একটি সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় আনতে নির্দেশিকা প্রণয়ন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ইসলামী ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে শরিয়াহসম্মত লেনদেন নিশ্চিত করার পাশাপাশি গ্রাহকের অধিকার সংরক্ষণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ জোরদার করাই এ নির্দেশিকার অন্যতম লক্ষ্য।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দেশে গত কয়েক বছরে ইসলামী ব্যাংকিং সেবার পরিধি বাড়ার পাশাপাশি আধুনিক ডিজিটাল আর্থিক সেবার ব্যবহারও বৃদ্ধি পেয়েছে। মোবাইল ও অনলাইনভিত্তিক লেনদেনের পাশাপাশি কার্ডের ব্যবহারও সাধারণ মানুষের মধ্যে বিস্তৃত হচ্ছে। এর ফলে শরিয়াহসম্মত কার্ডভিত্তিক পেমেন্ট ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকগুলোর ক্রেডিট কার্ডে লেনদেনের জন্য একটি নিয়ন্ত্রক কাঠামো হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ইসলামী ক্রেডিট কার্ড সেবার সাথে সংশ্লিষ্ট সব পণ্য, চুক্তি, লেনদেন, ফি, চার্জ এবং পরিচালনাগত কার্যক্রম ইসলামী শরিয়াহর নীতিমালা ও বিধিবিধানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে; অর্থাৎ কার্ডের কাঠামো থেকে শুরু করে গ্রাহকের সাথে চুক্তি এবং লেনদেন পরিচালনা পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে শরিয়াহর বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। নির্দেশনায় ব্যাংকগুলোর শরিয়াহ গভর্ন্যান্স ব্যবস্থার ওপরও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ইসলামী ক্রেডিট কার্ডের কার্যক্রম শরিয়াহসম্মতভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি পণ্য ও সেবার কাঠামো তৈরির সময় শরিয়াহর নীতিমালা যথাযথভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।
ইসলামী ক্রেডিট কার্ড ব্যবস্থায় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকেও বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কার্ডভিত্তিক লেনদেনে আর্থিক ঝুঁকির পাশাপাশি প্রযুক্তিগত, পরিচালনাগত ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি থাকতে পারে। এসব ঝুঁকি মোকাবেলায় ব্যাংকগুলোকে কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। একই সাথে অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার নির্দেশনা রয়েছে। লেনদেনের সঠিক হিসাব সংরক্ষণ, লেনদেন পর্যবেক্ষণ, অনিয়ম ও জালিয়াতি প্রতিরোধ এবং তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ডিজিটাল লেনদেনের পরিমাণ বাড়ার সাথে সাথে গ্রাহকের আর্থিক তথ্য ও ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ কারণে ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম কার্যকর হওয়া প্রয়োজন।
নির্দেশিকায় গ্রাহক সুরক্ষা ও স্বচ্ছতার বিষয়েও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ইসলামী ক্রেডিট কার্ডের ফি, চার্জ, শর্তাবলি, ব্যবহারবিধি ও গ্রাহকের দায়-দায়িত্ব সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য দিতে হবে। একজন গ্রাহক যেন কার্ড গ্রহণ ও ব্যবহারের আগে সংশ্লিষ্ট খরচ ও শর্ত সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পান, তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এর ফলে গ্রাহক ও ব্যাংকের মধ্যে আস্থা বৃদ্ধির পাশাপাশি ভুল বোঝাবুঝির ঝুঁকিও কমতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১ এর ৪৫ ধারা, সংশোধিত বিধানের অধীনে প্রাপ্ত ক্ষমতাবলে এই নির্দেশিকা জারি করেছে। ইসলামী ক্রেডিট কার্ড সেবা প্রদানকারী ব্যাংকগুলোকে এই নির্দেশিকার পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যান্য প্রযোজ্য আইন, বিধি, প্রবিধান ও নির্দেশনাও মেনে চলতে হবে। নির্দেশিকাটি জারির সাথে সাথে কার্যকর হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশের সাথে সাথে শরিয়াহসম্মত আধুনিক আর্থিক সেবার চাহিদাও বাড়ছে। ইসলামী ক্রেডিট কার্ডের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকলে ব্যাংকগুলো আরো কাঠামোবদ্ধভাবে এ ধরনের সেবা পরিচালনা করতে পারবে। একই সাথে গ্রাহকদের জন্য শরিয়াহসম্মত কার্ডভিত্তিক পেমেন্ট ব্যবস্থার সুযোগ বাড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্দেশিকার কার্যকর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর শরিয়াহ গভর্ন্যান্স, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, হিসাব ও তথ্য প্রকাশ এবং গ্রাহক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে কার্যকর করা গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে যথাযথ নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে ইসলামী ক্রেডিট কার্ড কার্যক্রম আরো সুশৃঙ্খল ও স্বচ্ছভাবে পরিচালনার সুযোগ তৈরি হবে। বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল আর্থিক ব্যবস্থায় ইসলামী ক্রেডিট কার্ড ভবিষ্যতে শরিয়াহসম্মত ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশিকা এ ধরনের সেবার জন্য প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন এর কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে গ্রাহক সুরক্ষা, স্বচ্ছতা ও শরিয়াহসম্মত ব্যাংকিং কার্যক্রম কতটা নিশ্চিত করা যায়, সেটিই হবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।





