আলজাজিরা
বিরোধপূর্ণ ফকল্যান্ডস দ্বীপপুঞ্জের কাছে তেল উত্তোলন প্রকল্প বন্ধ না করলে ব্রিটেনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইনি পদক্ষেপ নেয়ার হুমকি দিয়েছেন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই। ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত এই দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের বিরোধ চলছে। নতুন তেল প্রকল্পকে কেন্দ্র করে সেই বিরোধ আবার তীব্র হয়ে উঠেছে।
সোমবার রাতে ব্রিটিশ সরকারকে দুই সপ্তাহের সময়সীমা বেঁধে দেন মিলেই। এই সময়ের মধ্যে ‘সি লায়ন’ তেল প্রকল্পের সব কার্যক্রম বন্ধ না হলে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনবিষয়ক ট্রাইব্যুনালে (আইটিএলওএস) যাওয়ার হুমকি দিয়েছেন তিনি। জার্মানির হামবুর্গভিত্তিক এই আদালতের কাছে প্রকল্প বন্ধের জরুরি নির্দেশনা চাওয়া হবে বলে জানিয়েছেন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট। মিলেই প্রকল্পটির কার্যক্রমকে আর্জেন্টিনার প্রাকৃতিক সম্পদের ‘অবৈধ লুণ্ঠন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার দাবি, যুক্তরাজ্যের এই কর্মকাণ্ডের কারণে ‘অপরিবর্তনীয় ও অপূরণীয়’ ক্ষতি হচ্ছে এবং আর্জেন্টিনা নীরব দর্শক হয়ে থাকবে না।
‘সি লায়ন’ প্রকল্পটি যৌথভাবে পরিচালনা করছে ইসরাইলি প্রতিষ্ঠান নাভিতাস পেট্রলিয়াম ও ব্রিটিশ কোম্পানি রকহপার এক্সপ্লোরেশন। প্রকল্পে নাভিতাসের অংশীদারত্ব ৬৫ শতাংশ এবং রকহপারের ৩৫ শতাংশ। কোম্পানি দু’টি আর্জেন্টিনার হুমকি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, ফকল্যান্ডস সরকারের দেয়া বৈধ তেল অনুসন্ধান ও উৎপাদন লাইসেন্সের আওতায় তারা কাজ করছে এবং ব্রিটেন সরকারের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।
নাভিতাসের তথ্য অনুযায়ী, ফকল্যান্ডস দ্বীপপুঞ্জের প্রায় ২২০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত সি লায়ন তেলক্ষেত্রে উৎপাদন শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে ২০২৮ সালের মার্চে। প্রকল্পের প্রথম ধাপে ১১টি সমুদ্রতলীয় কূপ খননের পরিকল্পনা করা হয়েছে। রকহপারের তথ্য অনুযায়ী, সি লায়ন এলাকায় প্রায় ১৭০ কোটি ব্যারেল তেল মজুদ থাকতে পারে এবং স্বাধীন মূল্যায়নে প্রায় ৫০ কোটি ব্যারেল উত্তোলনযোগ্য মজুদের হিসাব পাওয়া গেছে।
আর্জেন্টিনা যে আদালতে যাওয়ার হুমকি দিয়েছে, সেই আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল ১৯৮২ সালের জাতিসঙ্ঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক কনভেনশনের অধীনে প্রতিষ্ঠিত একটি স্বাধীন আদালত। জরুরি পরিস্থিতিতে আদালত আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নির্দেশ দিতে পারে। তবে আদালত কোনো প্রকল্প বন্ধের নির্দেশ দিলেও সেটি কার্যকর করানোর জন্য যুক্তরাজ্য সরকারের ওপর সরাসরি বলপ্রয়োগের ক্ষমতা ট্রাইব্যুনালের নেই। ফলে আর্জেন্টিনা আইনি পদক্ষেপ নিলে তার বাস্তব প্রভাব কতটা হবে, সেটি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
ফকল্যান্ডস দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়ে আর্জেন্টিনা ও ব্রিটেনের বিরোধ বহু পুরনো। আর্জেন্টিনা দ্বীপগুলোকে ‘মালভিনাস’ নামে অভিহিত করে এবং নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে। অন্য দিকে ব্রিটেন দ্বীপগুলোর ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্বের দাবি বজায় রেখেছে। ব্রিটেনের অবস্থান হলো, ফকল্যান্ডসের বাসিন্দাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার রয়েছে। ২০১৩ সালের এক গণভোটে দ্বীপটির বাসিন্দারা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ব্রিটিশ ওভারসিজ টেরিটরি হিসেবে থাকার পক্ষে ভোট দেন। আর্জেন্টিনা অবশ্য ওই গণভোটের বৈধতা ও দ্বীপবাসীদের অবস্থান নিয়ে ভিন্ন মত পোষণ করে। ব্রিটিশ সরকারও ফকল্যান্ডসের আশপাশে কাজ করা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পাশে থাকার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে।
মিলেই প্রশাসন এরই মধ্যে ফকল্যান্ডসের কাছে ব্রিটিশ অনুমোদিত তেল প্রকল্পের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে। আর্জেন্টিনার দাবি, দ্বীপগুলোর সার্বভৌমত্বের বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত একতরফা কোনো পদক্ষেপ না নেয়ার আহ্বান জানানো জাতিসঙ্ঘের প্রস্তাবের সাথে প্রকল্পটি সাংঘর্ষিক। সেপ্টেম্বরের শুরুতেও মিলেই ফকল্যান্ডসের কাছে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের সাথে যুক্ত বিভিন্ন কোম্পানির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দেন। এরপর থেকেই প্রকল্পটি নিয়ে দুই দেশের কূটনৈতিক উত্তেজনা আরো বেড়েছে।
ফকল্যান্ডস ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিকভাবে নিরপেক্ষ অবস্থান পুনর্বিবেচনার সম্ভাবনা নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যের পর আর্জেন্টিনা নিজেদের সার্বভৌমত্বের দাবি আরো জোরালো করেছে। মিলেই সম্প্রতি জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদেও ফকল্যান্ডস নিয়ে আর্জেন্টিনার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন এবং দ্বীপগুলোর কাছে তেল অনুসন্ধানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। অন্য দিকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের কার্যালয় জানিয়েছে, ফকল্যান্ডসের বাসিন্দাদের ব্রিটিশ পরিচয় ও নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার রক্ষায় ব্রিটেন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ফকল্যান্ডস নিয়ে দুই দেশের বিরোধ ১৯৮২ সালে যুদ্ধে রূপ নেয়। ওই বছরের এপ্রিলে আর্জেন্টিনা দ্বীপপুঞ্জে সামরিক অভিযান চালিয়ে নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর ব্রিটেন পাল্টা সামরিক অভিযান শুরু করে। কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধে ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন সেনা, ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনা এবং তিনজন দ্বীপবাসী নিহত হন। চার দশকের বেশি সময় পরও সার্বভৌমত্বের বিরোধের সমাধান হয়নি। এখন সি লায়ন তেল প্রকল্পকে ঘিরে নতুন করে মুখোমুখি হয়েছে দুই দেশ। আর্জেন্টিনার দুই সপ্তাহের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর প্রকল্পটি নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, সেটিই এখন দেখার।





