নয়া দিগন্ত ডেস্ক
নিরাপত্তা সতর্কতা থাকায় মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর সমালোচনা সত্ত্বেও প্রথম ধাপে প্রায় ১,৫০০ শরণার্থীকে ফেরত পাঠাচ্ছে মালয়েশিয়া। জাতিসঙ্ঘ ও মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর সতর্কবার্তা সত্ত্বেও মালয়েশিয়া তাদের এই প্রত্যাবর্তনকে স্বেচ্ছামূলক বলছে। এএফপি সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, মঙ্গলবার উত্তর-পশ্চিম মালয়েশিয়ার লুমুত নৌঘাঁটির কাছে একটি স্টেডিয়ামে পুলিশের পাহারায় কয়েক ডজন বাস এসে পৌঁছায়। সাংবাদিকদের স্টেডিয়ামের ভেতরে প্রবেশে বাধা দেয়া হয়। যাত্রীদের ঘাঁটিতে নিয়ে যাওয়ার আগে তাদের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হবে এবং সেখান থেকে জাহাজে করে মিয়ানমারে পাঠানো হবে।
মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গাদের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যেই এই প্রত্যাবাসনের বিষয়টি সামনে এসেছে। গত জুলাই মাসে পেনাংয়ের একটি অনানুষ্ঠানিক বসতি থেকে উচ্ছেদের শিকার হওয়ার পর কুয়ালালামপুরে ইউএনএইচসিআরের কার্যালয়ের সামনে জড়ো হওয়া শতাধিক ব্যক্তিকে কর্তৃপক্ষ আটক করেছিল। এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাদের কাছে জাতিসঙ্ঘের নথিপত্র থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর পরে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। উল্লেখ্য, মালয়েশিয়া ১৯৫১ সালের শরণার্থীবিষয়ক সনদের কোনো পক্ষ নয় এবং তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ‘শরণার্থী’র মর্যাদাও স্বীকৃতি দেয় না।
প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে মিয়ানমারের সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং-কে মালয়েশিয়ায় আমন্ত্রণ জানানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন আনোয়ার। উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে চালানো দমন-পীড়নের সময় এই জেনারেলই দেশটির সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
মিয়ানমার সেনাবাহিনী দেশটির রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের ওপর বারবার দমন-পীড়ন চালিয়েছে, যার মধ্যে ২০১৭ সালের সহিংসতাও অন্তর্ভুক্ত, যাকে অনেক মানবাধিকার গোষ্ঠী গণহত্যা হিসেবে বর্ণনা করেছে। এই ঘটনার ফলে একটি বড় শরণার্থী সঙ্কট তৈরি হয়, যার কারণে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, ভারত এবং অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলোতে পালিয়ে যায়। মিয়ানমার আনুষ্ঠানিকভাবে রোহিঙ্গাদের স্থানীয় বংশোদ্ভূত একটি জাতিগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না বরং তাদের “বাঙালি” হিসেবে আখ্যায়িত করে - কার্যত তাদের বাংলাদেশী অভিবাসী বলে অভিহিত করে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় ১,২৬,১৪৪ জনেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী ছিল। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছে- ১২ লাখেরও বেশি। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম জুলাই মাসে বলেছিলেন যে মিয়ানমার ৫,০০০ রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে, তবে কাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে তা নিয়ে একটি প্রশ্ন থেকে যায়। মঙ্গলবার প্রত্যাবাসনের জন্য বাছাই করা প্রায় ১,৫০০ জন এই দলেরই অংশ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মিয়ানমারের দু’টি নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ এবং একটি হাসপাতাল জাহাজ ব্যবহার করা হবে।
জাতিসঙ্ঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর) বলেছে, এই অভিযানে তাদের কোনো ভূমিকা নেই এবং সতর্ক করেছে যে মিয়ানমারে চলমান সঙ্ঘাত ও সহিংসতার কারণে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। যেকোনো শরণার্থীর প্রত্যাবর্তন অবশ্যই স্বেচ্ছায়, একটি অবহিত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এবং নিরাপত্তা ও মর্যাদার সাথে সম্পন্ন হতে হবে।
মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই সতর্কবার্তার বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং তাদের পূর্ববর্তী বিবৃতির কথা উল্লেখ করেছে, যেখানে বলা হয়েছিল যে এই প্রত্যাবর্তনগুলো স্বেচ্ছায় হচ্ছে। মানবাধিকার কর্মীরা প্রশ্ন তুলেছেন, আটক থাকা মানুষরা যে দেশ থেকে পালিয়ে এসেছে, সেখানে স্বাধীনভাবে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে কি না।
রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্বকারী একটি সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল কাউন্সিলের (এআরএনসি) সহসভাপতি নায়ে সান লুইন আলজাজিরাকে বলেন, “গণহত্যা কখনো থামেনি। রোহিঙ্গাদের এখানে ফেরত পাঠানো প্রত্যাবাসন নয়। এটা মানুষকে একটি হত্যা ক্ষেত্রে ফেরত পাঠানো। আমরা মালয়েশিয়ার প্রতি আহ্বান জানাই, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের সকল প্রত্যাবর্তন বন্ধ করতে, যতক্ষণ না তা নিরাপদ হচ্ছে।”
তিনি যুক্তি দেন যে, সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মিসহ বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে যখন তীব্র লড়াই চলছিল, ঠিক সেই সময়েই শরণার্থীদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর মালয়েশিয়ার এই সিদ্ধান্ত এসেছে। তিনি বলেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা মাতৃভূমির বেশির ভাগ অংশের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে এবং আরাকান আর্মির সাথে তাদের লড়াই এখনো চলছে, যার মাঝে রোহিঙ্গারা আটকা পড়েছে। সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মি উভয়ই রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংসতা চালাচ্ছে।
বাংলাদেশের কক্সবাজারে অবস্থিত ‘সেন্টার ফর রোহিঙ্গা ক্রাইসিস স্টাডিজ’-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান রো মায়্যু ইসলামও বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রত্যাবাসনের বিরোধিতা করেছেন। আলজাজিরাকে তিনি বলেন, “প্রত্যাবাসনকে সমাধানের সাথে গুলিয়ে ফেলবেন না। মালয়েশিয়ার আটক কেন্দ্রগুলো থেকে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে স্থানান্তর করা রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধান করে না। যে পরিস্থিতিগুলো আমাদের পালাতে বাধ্য করেছে, সেগুলোর সমাধান করুন এবং তারপর প্রত্যাবর্তনকে সত্যিকারের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই করুন। আমরা বিশ্বকে আমাদের শরণার্থী হিসেবে রাখার জন্য বলছি না। আমরা নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মৌলিক অধিকারসহ সমান মানুষ হিসেবে ঘরে ফেরার অধিকার দাবি করছি।”





