সোহেল রানা রায়গঞ্জ ও আবুল কাশেম শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ)
যমুনার তীব্র ভাঙনে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার সোনাতনী ইউনিয়নের ধীতপুর, কুরসি, বাঙ্গালা, মাকড়া ও বারপাখিয়াসহ কয়েকটি গ্রামের শত শত পরিবার বসতভিটা ও আবাদি জমি হারিয়েছে। এরই মধ্যে বারপাখিয়া গ্রামের বড় একটি অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। স্থানীয়দের দাবি, গত এক বছরে এসব এলাকায় তিন থেকে চার শতাধিক বাড়িঘর এবং প্রায় তিন হাজার বিঘা আবাদি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে।
ধীতপুর গ্রামের ৭০ বছর বয়সী ফাহিমা বেগমের জীবনেই নদীভাঙনের এই নির্মমতার চিত্র স্পষ্ট। ৪৫ বছরে তিনি ১০ বার বসতভিটা হারিয়েছেন। বর্তমানে অন্যের জমিতে ঘর তুলে থাকলেও সেই আশ্রয়ও ভাঙনের ঝুঁকিতে। তার ছেলে আব্দুর রহমান বলেন, ‘বাড়ি নদী থেকে অনেক দূরে মনে হচ্ছিল। পানি দেখে ভাত খেতে বসেছিলাম। খাওয়া শেষ করার আগেই দেখি আমাদের বাড়ি নদীতে চলে যাচ্ছে।’
স্থানীয়রা জানান, ধীতপুর ও কুরসি এলাকায় দুই শতাধিক বাড়িঘরের পাশাপাশি তিনটি মসজিদ, একটি মাদরাসা, দু’টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পল্লী বিদ্যুতের একটি অভিযোগ কেন্দ্র নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বসতভিটার সাথে ফসলি জমি হারিয়ে অনেক পরিবার ভূমিহীন হয়ে পড়েছে।
ধীতপুর ও কুরসি গ্রামের মোসলেম ও কাদের বলেন, ‘বসতভিটার সাথে সামান্য যে জমিটুকু ছিল, সেটিও নদীতে চলে গেছে। আমাদের গোষ্ঠীর প্রায় সবাই এখন ভূমিহীন। সব হারিয়ে কোথায় গিয়ে দাঁড়াব, বুঝতে পারছি না।’
নদীভাঙনে শুধু বসতভিটা নয়, জীবিকার পথও হারিয়েছেন অনেকে। ধীতপুর গ্রামের সবজি ব্যবসায়ী আবু সোনাতনী ইউনিয়নটি চারদিকে যমুনাবেষ্টিত। ৩১ দশমিক ০৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ ইউনিয়নে ১৭টি গ্রামে ২৪ হাজার ২৩১ জন মানুষের বসবাস। ভাঙনের পাশাপাশি যোগাযোগ ও চিকিৎসাসঙ্কটও রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, উপজেলা বা জেলা সদরে যেতে নৌকাই প্রধান ভরসা। ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগও দুর্বল। জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে নদী পেরিয়ে অন্য এলাকায় যেতে হয়।
ভাঙনের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে। ধীতপুর গ্রামের শিক্ষার্থী সাথী, খাদিজা, সুমাইয়া, সবুজ ও রবিউল জানায়, তাদের বিদ্যালয় নদীতে বিলীন হয়েছে। এখন মাদরাসার টিনের ঘরে ক্লাস করতে হয়। চার দিকে পানি থাকায় নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতেও সমস্যা হয়। ঘরবাড়ি হারিয়েও তারা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চায়।
স্থানীয় ইউপি সদস্য সেলিম হোসেন বলেন, ভাঙনে অনেক পরিবার বসতভিটা ও জমি হারিয়েছে। দ্রুত কার্যকরব্যবস্থা না নিলে ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়বে।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেসুর রহমান বলেন, সোনাতনী ইউনিয়নে বর্তমানে ভাঙনরোধে কোনো প্রকল্প চলমান নেই। তবে চরাঞ্চলের উন্নয়নে একটি প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সেটি বাস্তবায়িত হলে ভাঙন প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ তৈরি হবে। শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাবরিনা শারমিন বলেন, ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বলা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ত্রাণ সহায়তাও দেয়া হচ্ছে।











