মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
মাসখানেক আগেই ক্ষমতাসীন বিএনপির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব ঘোষণার প্রস্তুতি প্রায় চূড়ান্তই ছিল। বর্তমান কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেদের বিদায়ের বিষয়টিও নিশ্চিত করেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ কোনো ঘোষণা বা কারণ ছাড়াই সেই কমিটি ঘোষণা থমকে যায়। জানা গেছে, সেই থেকে সংগঠনটির নতুন কমিটির বিষয়টি একেবারে ধামাচাপা অবস্থায় রয়েছে। দলটির শীর্ষ একাধিক নেতা জানান, ছাত্রদলের কমিটি নিয়ে ‘কঠিন দ্বিধা’য় রয়েছে বিএনপি। নিজেদের মধ্যে অন্তর্কোন্দল, পকেট কমিটি ও অনুপ্রবেশ আতঙ্কই কমিটি গঠনে বিলম্বের মূল কারণ বলে তারা এ প্রতিবেদককে জানান। নেতারা এও জানান, ছাত্রদলের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে বৈঠকে খোদ বিএনপি চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছাত্রদলে বিশুদ্ধ ছাত্রদল নেতাকর্মী খুঁজে না পাওয়ার কথা জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি ছাত্রদলকে আরো পরিশুদ্ধ ও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন বলেও সূত্রটি জানায়।
সূত্র মতে, ছাত্রদলের খসড়া গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ দুই বছর। ২০২৪ সালের ১ মার্চ রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে সভাপতি ও নাছির উদ্দীন নাছিরকে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাত সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। পরে ১৫ জুন ২৬০ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। সেই হিসাবে চলতি কমিটির নিয়মিত মেয়াদ ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ শেষ হয়েছে। ১ মার্চ ২০২৬ থেকে কমিটিটি মেয়াদোত্তীর্ণ। অর্থাৎ ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ হিসেবে কমিটির নিয়মিত মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় সাত মাস পেরিয়েছে। এর মধ্যে গত কয়েক মাস নতুন কমিটি ঘোষণার প্রস্তুতি চললেও এখন পর্যন্ত সেটি ঘোষণা হয়নি।
১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যদিয়ে দীর্ঘ দেড় যুগ পর রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে বিএনপি। নির্বাচনের পর থেকেই সংগঠনে নতুন নেতৃত্বের দাবি বাড়তে থাকে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে। নতুন কমিটিকে ঘিরে পদ প্রত্যাশী নেতা ও তাদের অনুসারীদের মধ্যে চলে শোডাউনের পাশাপাশি শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের আশীর্বাদ পাওয়ার প্রতিযোগিতাও। নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়, গুলশানে চেয়ারম্যানের কার্যালয়েও সামনেও নেতাকর্মীদের হাজিরা বাড়তে থাকে। তৃণমূল নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা উপলব্ধি করে ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানও নতুন কমিটির পক্ষে সায় দেন। তার নির্দেশনায় ছাত্রদলের কমিটি চূড়ান্ত করণের কাজও শেষ করে আনেন দায়িত্ব প্রাপ্তরা। একপর্যায়ে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছিরসহ সংগঠনটির শীর্ষ পাঁচ নেতা বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে বিদায়ী সাক্ষাৎ করেন। গত ১৩ আগস্ট বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্য দিয়ে রাকিব-নাছির নেতৃত্বাধীন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির বিদায় প্রক্রিয়া শুরু হয়।
সাক্ষাতের পর ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে ছাত্ররাজনীতির অধ্যায় শেষ করার ইঙ্গিত দেন। তিনি লেখেন, অনেক বেশি সম্মান ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটতে চলেছে। দীর্ঘ দায়িত্ব পালনের সময়ে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং বিএনপির সদ্য সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের শীর্ষ নেতাদের দিকনির্দেশনা ও সহযোগিতার কথা স্মরণ করে কৃতজ্ঞতা জানান রাকিব। নিজেদের মেয়াদকালের মূল্যায়নে ছাত্রদল সভাপতি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাথে সমন্বয় করে রাজপথে ভূমিকা পালন, পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ‘মব’ মোকাবেলা এবং অনাকাক্সিক্ষত বিতর্ক এড়িয়ে সততার সাথে নেতৃত্ব দেয়াই ছিল রাকিব-নাছির কমিটির প্রধান অর্জন। দায়িত্ব পালনকালে অনিচ্ছাকৃত কোনো ভুলত্রুটি হয়ে থাকলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ জানিয়ে রাকিব নিজের নতুন জীবনের জন্য সবার কাছে দোয়া চান। একই সাথে ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্বকে সবাই সাদরে গ্রহণ করবেন বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ শীর্ষ পাঁচ নেতার বিদায়ী সাক্ষাতের পর ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া জোরালো হয়। বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ও ছাত্রদলের একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, নতুন নেতৃত্ব ঘোষণার প্রস্তুতি তখন চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। কিন্তু হঠাৎ কোনো ঘোষণা বা কারণ ছাড়াই সেই কমিটি ঘোষণা থমকে যায়। সেই থেকে সংগঠনটির নতুন কমিটির বিষয়টি একেবারে ধামাচাপা অবস্থায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। আর কারণ হিসেবে নিজেদের মধ্যে অন্তর্কোন্দল, ক্যাম্পাসে একাধিক গ্রুপের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা, পকেট কমিটি গঠন, অনুপ্রবেশ আতঙ্ক অন্যতম বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
বিএনপির একাধিক নেতা জানান, ছাত্রদলের কমিটি নিয়ে ‘কঠিন দ্বিধা’য় রয়েছে বিএনপি। সিনিয়রদের মধ্য থেকে ছাত্রদলের শীর্ষ নেতৃত্বে আসতে ২০০৮-০৯ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাবর্ষ থেকে ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষেরও অন্তত দেড়ডজন নেতা আলোচনায় রয়েছেন। নেতা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ৫ আগস্টের আগে-পরে রাজনৈতিক ভূমিকা বিবেচনায় নেয়া হচ্ছিল। তবে আলোচনায় থাকা একাধিক নেতার অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আসায় নড়েচড়ে বসেছে নীতিনির্ধারক। সূত্র জানায়, নতুন কমিটির বিষয়ে মাঠ পর্যায়ের জরিপে নিয়মিত ছাত্রদের মধ্য থেকে নেতৃত্বের বিষয়টি উঠে এসেছে। সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও বিএনপির হাইকমান্ডের নিজস্ব ও বিশ্বস্ত লোকদের মাঠ পর্যায়ের রিপোর্ট অনুযায়ী ছাত্রদের মধ্যে গ্রহণযোগ্য, নিয়মিত শিক্ষার্থী, মেধাবী ও পরিচিত মুখের চিত্র ফুটে উঠেছে। বর্তমান প্রজন্ম ‘জেন-জি’ প্রজন্ম হিসেবে পরিচিত। তারা নিজেদের মতামত অকপটে প্রকাশ করতে ন্যূনতম চিন্তাভাবনা করে না। এসব জেন-জিরা অপেক্ষাকৃত বয়স্ক, অনিয়মিত শিক্ষার্থী ‘আদুভাই’দের তাদের নেতা হিসেবে গ্রহণ করবে না বলে এসব রিপোর্টে উঠে এসেছে।
সূত্র জানায়, নতুন কমিটি ঘোষণার ক্ষেত্রে পকেট কমিটি গঠনের বিষয়টিও সামনে আসে। নব্বইয়ের দশকের পর থেকেই ছাত্রদল নিয়ন্ত্রণ করে বিএনপির একটি শক্তিশালী বলয় বা সিন্ডিকেট। এবারও অপেক্ষাকৃত তরুণ ও নিয়মিত ছাত্রদের মধ্য থেকে কমিটি দিলে বিরোধী ছাত্রসংগঠনের সাথে মাঠ পর্যায়ের রাজনীতি মোকাবেলায় তাদের অনভিজ্ঞতায় বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে হাইকমান্ডকে বোঝাতে সক্ষম হয় ওই সিন্ডিকেট। এছাড়া নিয়মিত শিক্ষার্থীরা যেহেতু জেন-জি, তাদের মতাদর্শ সহজে অনুমান করা যায় না। যেকোনো সময় তাদের মত যুক্তির প্রশ্নে বদলে যায়। যেখানে দলীয় রাজনীতির চেয়ে এই জেন-জিরা যুক্তি বা বৃহত্তর অধিকারকে প্রাধান্য দেয়। তারা দেখে না, দাবিটি কোন সংগঠন বা কোন মতাদর্শের শিক্ষার্থীর পক্ষ থেকে উঠেছে। যৌক্তিক মনে হলে তারা সেই দাবির পক্ষে অবস্থান নেয়। আর রাজনীতির মাঠে তুলনামূলক অনভিজ্ঞতার অভাবে নতুন কমিটিতে পকেট কমিটি থাকার সম্ভাবনা কম। তাই অনেক আগে ছাত্রত্ব শেষ হওয়া, নিজেদের পক্ষের ছাত্রদের নিয়ে কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেয় ওই সিন্ডিকেট। বিষয়টি বিএনপি চেয়ারম্যানের নজরে আনা হলে আটকে যায় নতুন নেতৃত্ব। এ ছাড়া কমিটি ঘোষণার সম্ভাব্য সময়ের আগ মুহূর্তে জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ও ঢাকা আলিয়ায় ছাত্রদলের সাথে শিবিরের অনাকাক্সিক্ষত মারামারির বিষয়টিও চেয়ারম্যানের নজরে আনেন সংশ্লিষ্টরা। এখানে ছাত্রদলের অনেকেই আগ বাড়িয়ে সংঘর্ষে জড়ান বলে শীর্ষ নেতাদের কাছে রিপোর্ট আসে। কমিটি না হওয়ার পেছনে এটিও একটি কারণ বলে জানা গেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের এক নেতা নয়া দিগন্তকে বলেন, ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণার ক্ষেত্রে বিগত ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সংগঠনের ফল হাইকমান্ডের বিবেচনায় নেয়া উচিত। একইসাথে দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত পোড় খাওয়া সিনিয়রদের পাশাপাশি নবীনদের সমন্বয়ে ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব আসা উচিত। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বলয়ভিত্তিক রাজনীতির অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে রয়েছে, তাদের কমিটিতে না রাখাই উচিত।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী নয়া দিগন্তকে বলেন, বিএনপির অঙ্গদলগুলোর কমিটি গঠন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। ছাত্রদলও এর বাইরে নয়। বিএনপি অনেক বড় একটি দল। তাদের অনেক বিষয় সামনে রেখেই কাজ করতে হয়। তিনি বলেন, যেকোনো কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে দলের যাদের অবদান রয়েছে তাদের মূল্যায়ন করা হয়। ছাত্রদলের ক্ষেত্রেও আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত, মেধাবী, শিক্ষার্থীবান্ধব, পরিশ্রমী ও সৎ নেতৃত্বকেই বেছে নেয়া হবে। তিনি বলেন, দল যখন প্রয়োজন মনে করবে তখনই কমিটি ঘোষিত হবে। তবে সেটি খুব বেশি বিলম্বিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।





