মো: আজিজুল হক গাজীপুর
সবুজ শালবনের আড়ালে বাড়ছে অনিরাপত্তা। নিয়মিত টহল ও নজরদারি না থাকায় গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের বিভিন্ন স্থানে ছিনতাই, মাদকসেবন ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে। দর্শনার্থীদের জন্য বিশ্রামাগার ও শৌচাগার বেহাল, নেই পর্যাপ্ত সুপেয় পানির ব্যবস্থা। বছরের পর বছর তালাবদ্ধ ক্যান্টিন। বন্ধ রাজস্ব আয়ের একাধিক খাত। বন বিভাগ বলছে, প্রয়োজনের তুলনায় জনবল অপ্রতুল হওয়ায় উদ্যানটির ব্যবস্থাপনায় সমস্যা হচ্ছে।
একসময় ছুটির দিনে হাজারো দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখর থাকলেও নিরাপত্তাহীনতা ও সেবার ঘাটতিতে এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, শাপলা বিশ্রামাগার, চিড়িয়াখানা সংলগ্ন লেকপাড়, বনশ্রী-১ থেকে ৪, পানির ঘর, ৭ থেকে ৯ নম্বর এলাকা, পলাশ, সোনালু ও ২ নম্বর গেটসহ কয়েকটি স্থান ছিনতাইপ্রবণ হয়ে উঠেছে। নির্জনতার সুযোগে দর্শনার্থীদের টাকা, মোবাইল ও মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। অতীতে ছিনতাইকারীদের হামলায় দর্শনার্থী আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
বিভিন্ন নির্জন পয়েন্টে মাদকসেবন ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, স্কুল-কলেজের পোশাক পরা কিশোর-কিশোরীদের একটি অংশ অভিভাবক ছাড়াই উদ্যানে প্রবেশ করে। তাদের কেউ কেউ মাদক ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। নিয়মিত নজরদারি থাকলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না বলে দর্শনার্থীরা মনে করেন।
উদ্যানে চম্পা, শাপলা, অর্কিড, জেসমিন ও রজনীগন্ধা নামে পাঁচটি বিশ্রামাগার রয়েছে। এর মধ্যে চম্পা সংসদ সদস্য, সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও ভিআইপিদের জন্য নির্ধারিত। সেখানে হাই কমোড, গিজার, টাইলসসহ আধুনিক সুবিধা রয়েছে। নিয়মিত সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধনেও অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে।
অন্য দিকে সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত শাপলা, জেসমিন ও রজনীগন্ধা বিশ্রামাগারের অবস্থা নাজুক। ছাদের পলেস্তরা খসে পড়ছে, আসবাবপত্র ভাঙাচোরা, শৌচাগার ব্যবহারের অনুপযোগী। পানির সংযোগও ঠিক নেই। প্রাঙ্গণজুড়ে ঝোপঝাড়। ফলে একই উদ্যানে ভিআইপি ও সাধারণ দর্শনার্থীদের সেবায় বড় বৈপরীত্য দেখা গেছে। চম্পা বিশ্রামাগারের সৌন্দর্যবর্ধনে দেশীয় গাছ কেটে বিদেশী প্রজাতির গাছ লাগানোর অভিযোগও রয়েছে।
উদ্যানের রাজস্ব আয়ের অন্যতম খাত ছিল লেকে সৌখিন মাছ শিকারের টিকিট। একসময় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মৎস্য শিকারিরা এলেও বর্তমানে তা বন্ধ। টিকিটের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপরে নির্দেশে মাছ শিকার বন্ধ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
এ ছাড়া একমাত্র ক্যান্টিনটি কয়েক বছর ধরে তালাবদ্ধ। পর্যাপ্ত সুপেয় পানি ও শৌচাগারের ব্যবস্থা নেই। রণাবেণের অভাবে লেকের সৌন্দর্যও কমেছে। অতীতে কয়েকটি কটেজের চালের টিন খুলে বিক্রি করে দেয়ার অভিযোগও রয়েছে। এতে বন বিভাগের অসাধু কর্মচারীদের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠলেও এর সুনির্দিষ্ট তদন্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানটি মাস্টারবাড়ী থেকে রাজেন্দ্রপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত বিস্তৃত। শালবনের জন্য পরিচিত এ উদ্যানের আয়তন প্রায় দুই হাজার হেক্টর বলে জানিয়েছেন রেঞ্জ কর্মকর্তা মো: আরিফুল ইসলাম। তিনি বলেন, উদ্যানে কমপে ৪০ জন জনবল থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে আছেন ১৪ জন। জনবল সঙ্কটের কারণে উদ্যান দেখভালে সমস্যা হচ্ছে।
তবে জনবল সঙ্কটের পাশাপাশি দর্শনার্থীসেবা, নিরাপত্তা, বিশ্রামাগার রণাবেণ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের ঘাটতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রকৃতি সংরণের জন্য পিকনিক, মাইক-সাউন্ড সিস্টেম ও আগুন জ্বালিয়ে রান্না বন্ধ করা হলেও প্রয়োজনীয় বিকল্প সেবা গড়ে ওঠেনি। ফলে সম্ভাবনাময় এ পর্যটনকেন্দ্রটি ধীরে ধীরে হারাচ্ছে তার পুরনো জৌলুশ।