এস এম রহমান পটিয়া-চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম)

দেশের একমাত্র স্বয়ংসম্পূর্ণ শিল্প লবণশিল্প রক্ষায় জাতীয় লবণ নীতিমালা-২০২২-এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং উৎপাদিত লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন চাষিরা। নতুন লবণ মৌসুম শুরুর আগে মাঠে বিপুল পরিমাণ অবিক্রীত লবণ মজুদ থাকার পরও দেড় লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত বোল্ডার লবণ আমদানির উদ্যোগে উপকূলের চাষিদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বিসিক সূত্রে জানা গেছে, গত সপ্তাহ পর্যন্ত শুধু চাষিদের কাছেই অবিক্রীত রয়েছে ৪ লাখ ৯০ হাজার ২৩ মেট্রিক টন লবণ। এর বাইরে মিলারদের কাছেও রয়েছে এক লাখ টনের বেশি। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে লবণ আমদানি হলে উৎপাদিত লবণের দাম আরো কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন চাষিরা।
চাষিরা জানান, বর্তমানে প্রতি মণ লবণ উৎপাদনে প্রকারভেদে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকার বেশি খরচ হচ্ছে। অথচ মৌসুমের শুরু থেকে গতকাল পর্যন্ত গড়ে প্রতি মণ লবণ ৩৪০ থেকে ৩৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে উৎপাদন খরচ, জমির বর্গা ও অন্যান্য ব্যয় বিবেচনায় চাষিরা কাক্সিক্ষত লাভ পাচ্ছেন না।
চলতি বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আমদানি ও রফতানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দফতর থেকে দেড় লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত বোল্ডার লবণ আমদানির অনুমতি দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। শিল্প মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের পর বিসিকের নিবন্ধিত মিলগুলোর অনুকূলে এ লবণ আমদানির সুপারিশ করা হয়েছে।
অন্য দিকে চলতি ২০২৬-২৭ মৌসুমে অপরিশোধিত লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ লাখ ৩৪ হাজার মেট্রিক টন। পরিশোধিত লবণের চাহিদা ধরা হয়েছে ২১.০৩ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ভোজ্য লবণের চাহিদা ৭.৫ লাখ মেট্রিক টন, শিল্প খাতে ৯.৫৬ লাখ, মৎস্য খাতে ০.৩৭২ লাখ এবং প্রাণিসম্পদ খাতে ৩.৬ লাখ মেট্রিক টন।
গত ২০২৫-২৬ মৌসুমে লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৭ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন। এর বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৯ লাখ ৪৪ হাজার ৯২৪ মেট্রিক টন। উৎপাদন ঘাটতি ছিল ৭ লাখ ৭০ হাজার ৭৬ মেট্রিক টন। ওই মৌসুমে ৬৭ হাজার ৭৫৭ একর জমিতে ৪০ হাজার ১৫০ জন চাষি লবণ উৎপাদনে যুক্ত ছিলেন। লবণ মৌসুম সাধারণত ১৫ নভেম্বর শুরু হয়ে পরবর্তী বছরের ১৫ মে পর্যন্ত চলে।
লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা কমে যাওয়ার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের লবণ সেলের প্রধান সরোয়ার আলম বলেন, দেশে স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়ায় মানুষের মধ্যে লবণ খাওয়ার প্রবণতা কমেছে। ফলে পরিশোধিত লবণের চাহিদা কমে যাওয়ায় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ও চাহিদা দু’টিই কমেছে। লবণ আমদানির বিষয়ে তিনি বলেন, লবণ মৌসুম শুরু হতে এখনো কিছুটা সময় বাকি রয়েছে। আবহাওয়ার পরিস্থিতি বিবেচনা করেই আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
তবে চাষিদের অভিযোগ, কস্টিক সোডা ও বিভিন্ন রাসায়নিক তৈরির নামে দীর্ঘদিন ধরে বিদেশ থেকে অতিরিক্ত লবণ আমদানি হচ্ছে। তাদের দাবি, সোডিয়াম সালফেট ও সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানির সুযোগ কাজে লাগিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে মিসডিক্লারেশনের মাধ্যমে অতিরিক্ত লবণ দেশে ঢুকছে। রাসায়নিক তৈরির পর উদ্বৃত্ত লবণ বাজারে চলে আসায় দেশীয় লবণের সরবরাহ বেড়ে যাচ্ছে। এতে চাষিদের উৎপাদিত লবণ অবিক্রীত থেকে যাচ্ছে এবং পাইকারি দাম কমছে।
চাষিরা জানান, দেশে প্রতি মাসে গড়ে সোয়া দুই লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত লবণের চাহিদা রয়েছে। সেই হিসাবে মাঠে বিপুল পরিমাণ লবণ মজুদ থাকা অবস্থায় নতুন করে আমদানির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাদের মতে, আমদানি অব্যাহত থাকলে নতুন মৌসুমে অনেক চাষি লবণ উৎপাদনে আগ্রহ হারাতে পারেন।
এর আগে গত ২৯ আগস্ট নয়া দিগন্তে ‘অতিরিক্ত লবণ আমদানির কারণে হুমকিতে দেশের  লবণ শিল্প’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ৭ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদন ঘাটতি নিয়ে মৌসুম শেষ হলেও দেশে তখনো ৬ লাখ টনের বেশি লবণ মজুদ ছিল।
বাঁশখালীর লবণচাষি মো: কলিম উদ্দিন ও মো: বেলাল বলেন, মাঠে এখনো প্রচুর অবিক্রীত লবণ রয়েছে। এ অবস্থায় ফের লবণ আমদানি হলে পাইকারি দাম আরো কমে যাবে। এতে চাষিরা উৎপাদনে উৎসাহ হারাবেন। লবণশিল্প রক্ষায় আমদানি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি উৎপাদিত লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
জাতীয় লবণ নীতিমালা-২০২২-এ লবণ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য নতুন নতুন এলাকা চিহ্নিত ও সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে। নীতিমালায় প্রকৃত লবণ চাষিদের কাছে চাষের জমি বরাদ্দ, লবণ চাষের জমি সংরক্ষণ এবং জমির ইজারা বা বর্গামূল্য নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা রয়েছে। একই সাথে দেশীয় লবণশিল্প সুরক্ষায় আমদানি শুল্কহার সমন্বয়ের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার কথাও বলা হয়েছে।
চাষিদের অভিযোগ, নীতিমালার এসব নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় উপকূলের লবণ চাষযোগ্য জমি দিন দিন সঙ্কুচিত হচ্ছে। অনেক এলাকায় স্থানীয় প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে জমির বর্গা ও লাগিয়ত মূল্য বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বাড়ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতি ৪০ শতক জমির বার্ষিক লাগিয়ত ৭০-৮০ হাজার টাকার নিচে পাওয়া যায় না। 
চাষিদের দাবি, লবণশিল্প রক্ষায় এখনই উৎপাদিত লবণের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ, শিল্পকারখানার নামে লবণ আমদানিতে কঠোর নজরদারি এবং জাতীয় লবণ নীতিমালা-২০২২-এর সুপারিশগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। তাদের মতে, দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি হাজার হাজার মানুষের জীবিকার সাথে যুক্ত এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে দেশীয় উৎপাদন ও বাজার সুরক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।