দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় বর্তমান বিএনপি সরকার ভয়ঙ্কর পথে হাঁটছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম এমপি।
এ সময় তিনি রাজধানীর বাড্ডার স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুড়িয়ে দেয়ার ঘটনা বিএনপি নেত্রী মিষ্টিকে নিয়ে সরকার আইওয়াশ করছে বলেও মন্তব্য করেন।
শনিবার (৩ অক্টোবর) দুপুরে রংপুর মহানগর ও জেলা জামায়াত কার্যালয়ে রংপুর বিভাগীয় উন্নয়ন ফোরাম আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করেন তিনি।
এটিএম আজহার বলেন, ‘সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে ভয় দেখিয়ে বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার যে পথে হাঁটছে, এই পথ অত্যন্ত তাদের জন্য ভয়ঙ্কর পথ, তাদের বিপদের পথ। এই বিপদ তাদেরকে কোথায় নিয়ে যাবে—আমি তাদেরকে চিন্তা করার জন্য অনুরোধ করব।’
রাড্ডার ঘটনায় সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে সরিয়ে দেয়া সরকারের আইওয়াশ দাবি করে এটিএম আজহার বলেন, ‘রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র কিভাবে গুড়িয়ে দেয়া হয়ে হলো। একটা আইওয়াশ করার জন্য একটা মহিলা সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য পদ থেকে বহিষ্কার করলো। কিন্তু দলীয় সিদ্ধান্ত হলো না। যে বেআইনি কাজ করা হলো, একটা হাসপাতালকে গুড়িয়ে দেয়া হলো—তার শাস্তি কোথায় দেয়া হলো? তাকে কেন গ্রেফতার করা হলো না?’
‘উল্টো ওমরাহ ফেরত মানুষকে প্রতিবাদ করায় গ্রেফতার করা হলো’ উল্লেখ করে এটিএম আজহার বলেন, ‘যারা ওমরাহ করে আসার সময় নিজস্ব বিমানবন্দরে তিন-চার ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার পরেও লাগেজ পাওয়া গেলো না। আমাদের আবেগের জিনিস, মক্কা-মদিনা থেকে আসার সময় জমজমের পানি নিয়ে নিয়ে কী তুলকালাম কাণ্ড হয়ে গেল! আমরা কী দেখলাম? যিনি এর প্রতিবাদ করলেন, তদন্ত করার আগেই তার বিরুদ্ধে মামলা হলো। তাকে গ্রেফতার করা হলো। এর তীব্র ধিক্কার জানাই, নিন্দা জানাই আমরা।’
‘আপনারা (সরকার) সমস্যার সমাধান না করে, আওয়ামী লীগের পথেই পুলিশ বাহিনীকে ব্যবহার করে আইনের আশ্রয়ের নামে বিরোধী দলকে দমন করার পথ বেছে নিচ্ছেন, এটা আপনাদের জন্য শুভকর হবে না। দেশে চলছে মাস্তানিতন্ত্র, দখলদারি, চাঁদাবাজি, দলীয়করণ, বৈষম্য। আওয়ামী শাসনে যা ছিল এখনো তাই বহাল আছে। এবং তার চেয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।’
শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে ফাঁসির রায় কার্যকর করার দাবি জানিয়ে এটিএম আজহার বলেন, ‘এখনো জুলাইয়ে শহীদদের বিচার সম্পন্ন হয়নি। বিচার সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে খুব ধীরগতি দেখতে পাচ্ছি। এতে শহীদদের আত্মা কষ্ট পাচ্ছে। জনগণ বিভ্রান্ত হচ্ছে। জনগণ আতঙ্কিত যে আদৌ বিচারটা করা হবে কিনা। বিচারে যাদেরকে ফাঁসির হুকুম দেয়া হয়েছে, বিশেষ করে শেখ হাসিনাসহ যারা বিদেশে পলায়ন অবস্থায় আছেন, তাদেরকে কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে অতি জলদি ফিরিয়ে নিয়ে ফাঁসির রায় কার্যকর করা হোক। এটা আমার না, সারা বাংলাদেশের জনগণের দাবি।’
নতুন করে গণভোটের উদ্যোগকে আরেক প্রহসন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ঐকমত্যের ভিত্তিতে সমস্ত রাজনৈতিক দলকে নিয়ে প্রায় আট মাস আলাপ-আলোচনা করে আমরা জুলাই সনদ তৈরি করলাম। যেখানে আমরা সবাই স্বাক্ষর করলাম, অঙ্গীকার করলাম। আমরা যারাই ক্ষমতায় যাব, তারাই স্বাক্ষরকৃত সমস্ত প্রস্তাব বাস্তবায়ন করব। কিন্তু আফসোসের বিষয়, যখন এই বছরে ১২ই ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হলো, যে নির্বাচনে আমাদের জনগণ দুইটা ভোট দিল। আমরা আমরা সবাই একটা সংবিধান সংস্কার পরিষদ—তার সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার কথা। যথারীতি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ আমরা যারা ১১ দলে এমপি ছিলাম, তারা দুইটা শপথ গ্রহণ করলাম-জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে এবং জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে আমরা শপথ গ্রহণ করলাম। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, জনগণের আকাঙ্ক্ষা ধূলিসাৎ করে তারা (বিএনপি) একটি শপথ নিল শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য সংসদ সদস্য হিসেবে, কিন্তু জুলাই সনদের জন্য যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে তারা শপথ গ্রহণ করলো না। সংবিধান সংস্কার নিয়ে সরকার কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে শোনা যায় তারা নাকি আবার গণভোট আয়োজন করবে। আমরা জানি না কি জন্য গণভোট করবে। এটা জনগণকে ধোঁকা দেয়ার শামিল। আমরা এর প্রতিবাদ করব ইনশাআল্লাহ সংসদে এবং রাজপথে।’
আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকার কথা উল্লেখ করে এ জামায়াত নেতা বলেন, ‘দেশে আইনশৃঙ্খলা নাই। আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সব মন্ত্রণালয়ের খবর রাখেন; উনার মন্ত্রণালয়ের কোনো খবর নাই। উনি ওইটা ছাড়া সবটারই খবর রাখেন।’
পরে তিনি রংপুর বিভাগের উন্নয়নবঞ্চনা ও বৈষম্যের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং এই অঞ্চলকে একটি আধুনিক, উন্নত ও বৈষম্যহীন বিভাগে রূপান্তর করতে ২১ দফা দাবি জানান। দাবিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, খনিজসম্পদ উত্তোলন, সৈয়দপুর বিমানবন্দর আধুনিকীকরণ, গাইবান্ধায় দ্বিতীয় যমুনা সেতু দ্রুত বাস্তবায়ন, প্রত্যেক উপজেলায় রাস্তাঘাট ব্রিজ-কালভার্ট পাকাকরণ, বিভাগের সকল উপজেলার মহিলা কলেজকে সরকারীকরণ, সকল জেলায় নারীদের কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা, বিভাগের প্রতিটি জেলায় আইটি পার্ক স্থাপন, চিনিকলসহ সকল বন্ধ কলকারখানা চালু, গ্যাস নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং শিল্পকারখানায় গ্যাস সংযোগ, ইডিজেড স্থাপন, বিএসটিআই’র স্থায়ী কার্যালয় স্থাপন, রংপুর ও দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালকে এক হাজার বেডে উন্নীত করা এবং চিকিৎসা সেবার মান বৃদ্ধি ও দালালের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা, দিনাজপুরে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন নতুন যুগোপযোগী বিষয় চালু করা, সৈয়দপুর টেক্সটাইল কলেজকে পূর্ণাঙ্গ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর, পর্যাপ্ত আলুর কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন।
সংবাদ সম্মেলনে রংপুর বিভাগ থেকে নির্বাচিত ১৪ জন এমপি উপস্থিত ছিলেন। তারা হলেন, রংপুর-৩ আসনের মাহবুবুর রহমান বেলাল, রংপুর-৫ আসনের গোলাম রব্বানী, রংপুর-১ আসনের রায়হান সিরাজী, নীলফামারী-১ আসনের আব্দুস সাত্তার, নীলফামারী-২ আসনের আল ফারুক আব্দুল লতিফ, নীলফামারী-৩ আসনের ওবায়দুল্লাহ সালাফী, নীলফামারী-৪ আসনের আব্দুল মুত্তাকিম, কুড়িগ্রাম-১ আসনের আনোয়ারুল ইসলাম, কুড়িগ্রাম-৪ আসনের মোস্তাফিজুর রহমান, গাইবান্ধা-১ আসনের মাজেদুর রহমান, গাইবান্ধা-২ আসনের আব্দুল করিম, গাইবান্ধা-৩ আসনের নজরুল ইসলাম লেবু, গাইবান্ধা-৫ আসনের মো: আব্দুল ওয়ারেছ। এছাড়াও রংপুর মহানগর আমির এটিএম আজম খান, সেক্রেটারি আনোয়ারুল ইসলাম, জেলা সেক্রেটারি এনামুল হকসহ মহানগর ও জামায়াত নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।





