দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার তিস্তা ব্যারাজ সংলগ্ন পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অত্যন্ত সংবেদনশীল কী পয়েন্ট ইনস্টলেশনভুক্ত (কেপিআই) অতি গুরুত্বপূর্ণ ‘সিল্টট্রাপ’ (পলি পৃথকীকরণ জলাধার) এলাকায় চলছে নিয়মবহির্ভূত বালু ও মাটি বিক্রির তাণ্ডব। ইজারার শর্ত তোয়াক্কা না করে নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে তিন থেকে চার গুণ বেশি বালু তুলে নেয়ায় নদী ও জলাধার এলাকায় নদীর স্বাভাবিক তলদেশের চেয়েও ১০ থেকে ১২ ফুট গভীর খাদের সৃষ্টি হয়েছে।

একদিকে দিন-রাত সমানতালে অতিরিক্ত ওজনের অতি ভারী ডাম্প ট্রাক ও ট্রাক্টর চলাচলের কারণে ভেঙে চুরমার হওয়ার উপক্রম স্থানীয় গ্রামীণ সড়ক, পাউবোর পরিদর্শন সড়ক ও তিস্তার প্রধান সেচ ক্যানেলের সুরক্ষা বলয়। অন্যদিকে, সরকারি বালুমহাল ও নদী আইন বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চালানো এ অবৈধ তাণ্ডবের ফলে তিস্তার ডান তীর, ভাঙনপ্রবণ বাইশপুকুর মৌজা এবং সরকার নির্মিত ‘তুহিন বাঁধ’ নদীগর্ভে সম্পূর্ণ বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় দিন গুনছেন স্থানীয় অধিবাসীরা।

পাউবো ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সিল্টট্রাপের খননকৃত মাত্র ১১ লাখ সেফটি পলিযুক্ত বালু ও মাটি প্রকাশ্যে নিলামের মাধ্যমে প্রায় ২২ লাখ টাকায় ইজারা পান ডালিয়া গ্রামের বাসিন্দা ও তিস্তা কলেজের প্রদর্শক মো: জয়নাল আবেদীন। গত ২১ মে তৎকালীন নিলাম কমিটির সভাপতি ও ডিমলার ইউএনও মো: ইমরানুজ্জামানের তত্ত্বাবধানে এ ইজারা দেয়া হয়।

ইজারার চুক্তি অনুযায়ী, নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করে কেবল দিনের বেলায় ট্রলিতে ঢেকে বালু পরিবহন করার স্পষ্ট বাধ্যবাধকতা ছিল। তবে সরজমিনে দেখা গেছে চুক্তিপত্রের উল্টো চিত্র। শক্তিশালী ইজারাদার সব নিয়মকানুন বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ১০ চাকার ভারী ডাম্প ট্রাক ও ড্রাম ট্রাকে করে দিন-রাত শত শত ট্রিপ বালু ও মাটি পাচার করছেন। 

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ইজারার নামে পুরো নদীই যেন বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। কারিগরি পরিমাপ করলেই থলে থেকে বিড়াল বেরিয়ে আসবে। ১১ লাখ সেফটির অনুমোদিত স্থানে ইতোমধ্যেই তুলে নেয়া হয়েছে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ লাখ সেফটি বালু ও মাটি।

ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত ওজনের ডাম্প ট্রাক চলাচলের কারণে ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরিদর্শন সড়কসহ আশপাশের গ্রামীণ সড়কগুলোর কালভার্ট ও পাকা রাস্তা ধসে বড় বড় খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। একই সাথে তিস্তার প্রধান সেচ ক্যানেল ও বাঁধের সুরক্ষা দেওয়াল ভেঙে পড়ছে। বিকট শব্দ ও বাতাসে ছড়িয়ে পড়া ধুলাবালিতে গোটা এলাকার জনজীবন এখন স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে।

উল্লেখ্য, ডালিয়া পাউবোর এ সিল্টট্রাপ মূলত শুষ্ক মৌসুমে সেচ ক্যানেলে পানি প্রবেশের আগে নদীর বালু ও পলি পৃথকীকরণে ব্যবহৃত সেচ প্রকল্পের অন্যতম প্রধান কারিগরি অংশ। এমন এক স্পর্শকাতর কেপিআই এলাকায় এ ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হচ্ছে, যখন পাউবো বাইশপুকুর এলাকায় নদীভাঙন ঠেকাতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে প্রতিরক্ষামূলক কাজ করে চলেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের পূর্বাভাস ও স্থানীয়দের আশঙ্কা অনুযায়ী, কৃত্রিমভাবে তৈরি করা ১০-১২ ফুট গভীর এ খাদে বর্ষার পানি ঢুকলেই তৈরি হবে প্রবল ঘূর্ণিস্রোত। এতে তিস্তার ডান তীর রক্ষাবাঁধ ধসে মুহূর্তেই নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হতে পারে। নতুন চ্যানেল সৃষ্টি হলে খালিশা চাপানি ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ তুহিন বাঁধ, বাইশপুকুর গ্রাম এবং ঝুনাগাছ চাপানি ইউনিয়নের ভেন্ডাবাড়িসহ বিস্তীর্ণ এলাকার আবাদি জমি ও বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। একই সাথে স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয়, মুজিব কেল্লা ও আশ্রায়ণ প্রকল্পের ঘরবাড়িও চূড়ান্ত ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে।

বাইশপুকুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল জলিল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘তিস্তা নদীর পাড় ঘেঁষে গভীর করে মাটি কাটায় বড় বড় কৃত্রিম জলাধার তৈরি হয়েছে। তিস্তার পানি সামান্য বাড়লেই এসব খাদ দিয়ে পানি ঢুকে পুরো এলাকা ধসে যাবে। এলাকার প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম তুহিন বাঁধ রক্ষা করতে আমরা ইউএনও সাহেবের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি।’

ডালিয়া নতুন বাজারের লুৎফর রহমান ও তমিজ উদ্দিন জানান, ১০ চাকার ভারী ডাম্প ট্রাকে দিন-রাত মাটি পরিবহনে পরিদর্শন সড়ক ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। বালু উত্তোলনের নামে তৈরি কৃত্রিম খাদগুলো এখন শিশু ও গবাদিপশুর জন্য মৃত্যুর ফাঁদে পরিণত হয়েছে।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে ইজারাদার জয়নাল আবেদীনের ফোনে কল করা হলে তিনি সাংবাদিক পরিচয় পেয়েই কথা না বলে সংযোগ কেটে দেন। পরে বারবার চেষ্টা করলেও তিনি আর ফোন রিসিভ করেননি।

যোগাযোগ করা হলে ডালিয়া পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, ‘বিষয়টির ভয়াবহতা বিবেচনা করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল সরজমিনে পরিদর্শন করেছেন। নিয়মবহির্ভূতভাবে তৈরি হওয়া এ বিশাল খাদ দ্রুত সময়ের মধ্যে নিজ খরচে ভরাট করে দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ইজারাদারকে কড়া নির্দেশ দেয়া হয়েছে।’

এদিকে নিলাম কমিটির সভাপতি ও ডিমলার ইউএনও মো: ইমরানুজ্জামান বলেন, ‘ডালিয়া পাউবোর সিল্টট্রাপের বালু-মাটি ইজারাদার যদি নিলামের শর্ত ভঙ্গ করে থাকেন বা অতিরিক্ত বালু ও মাটি তুলে থাকেন, তবে তদন্ত সাপেক্ষে তার ইজারা অবিলম্বে বাতিল করা হবে ও তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলাসহ বিধি অনুযায়ী কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’