ময়মনসিংহে প্রায় ৮০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধা মায়ের সম্পত্তি প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে লিখে নেয়ার পর ভরণপোষণ বন্ধ করে দেয়া, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ উঠেছে নিজের মেয়ের বিরুদ্ধে। মেয়ের স্বামী একজন অতিরিক্ত সচিব হওয়ায় প্রভাব খাটিয়ে তাকে আইনি পদক্ষেপ থেকেও বিরত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী বৃদ্ধা।

রোববার (৪ অক্টোবর) ময়মনসিংহ প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন সদর উপজেলার বাঘমারা এলাকার বাসিন্দা রহিমা খাতুন।

লিখিত বক্তব্যে রহিমা খাতুন অভিযোগ করেন, তার বড় মেয়ে ফারজানা সুলতানা কাবেরি ও মেয়ের স্বামী হায়দার জাহান ফারাশ প্রায় ২০ থেকে ২৫ বছর আগে নানা কৌশলে তার মালিকানাধীন সাত শতক জমির ওপর নির্মিত পাঁচতলা বাড়ির চার তলা নিজেদের নামে লিখে নেন। সম্পত্তি নিজেদের নামে নেয়ার পর থেকেই মেয়ের আচরণে পরিবর্তন আসে এবং তার দায়িত্ব নেয়া বন্ধ করে দেয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

পাঁচ-ছয বছর ধরে ভরণপোষণ দেন না
বৃদ্ধা রহিমা খাতুন বলেন, ‘গত প্রায় পাঁচ-ছয় বছর ধরে তার মেয়ে খাবার, ওষুধ কিংবা জীবনধারণের ন্যূনতম খরচও দিচ্ছেন না।’ এমনকি তাকে ঠিকমতো খেতেও দেয়া হয় না বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তার দাবি, ভরণপোষণের পাশাপাশি তিনি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। প্রতিবাদ করতে গেলে দুর্ব্যবহার করা হয়। তার পক্ষে কেউ কথা বললে তাকেও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা এবং প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হয় বলে অভিযোগ করেন বৃদ্ধা।

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে নিজের বাড়িতেই তিনি চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন। প্রতিবাদ করলে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া এবং মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হচ্ছে।’

জামাই অতিরিক্ত সচিব, তাই ক্ষমতার ভয় দেখানো হয়
সংবাদ সম্মেলনে রহিমা খাতুন অভিযোগ করেন, মেয়ের স্বামী হায়দার জাহান ফারাশ সরকারি কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত সচিব হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়ার সাহস পাচ্ছেন না তিনি।

তার অভিযোগ, আইনি পদক্ষেপ নেয়ার চেষ্টা করলে তার মেয়ের স্বামী বারবার বাড়িতে পুলিশ পাঠান এবং লোকজনের মাধ্যমে তাকে চুপ থাকার জন্য চাপ দেয়া হয়। অন্যথায় তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

তবে সংবাদ সম্মেলনে করা সব অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন অভিযুক্ত মেয়ে ফারজানা সুলতানা কাবেরী। তার দাবি, তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের হেয়প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যেই এসব অভিযোগ করা হয়েছে। তিনি অভিযোগগুলোর সত্যতা অস্বীকার করে বলেন, ‘সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত বক্তব্যের সাথে বাস্তবতার কোনো মিল নেই।’

অভিযোগগুলোর স্বাধীন সত্যতাও তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সম্পত্তি ফেরত ও নিরাপত্তা চান বৃদ্ধা
রহিমা খাতুন বলেন, ‘জীবনের শেষ বয়সে নিজের সম্পত্তি হারিয়ে এবং আপন সন্তানের কাছ থেকেই নির্যাতনের শিকার হয়ে তিনি মানসিক ও শারীরিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। এই বয়সে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে তা তিনি কখনো কল্পনাও করেননি।’

সংবাদ সম্মেলনে তিনি প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে লিখে নেয়া সম্পত্তির দলিল বাতিল করে তা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেয়ার দাবি জানান। একই সাথে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইন অনুযায়ী যথাযথ ভরণপোষণের ব্যবস্থা করার জন্য স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও আদালতের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

তিনি আরো দাবি করেন, তার ওপর শারীরিক নির্যাতন, ভরণপোষণ না দেয়া এবং সম্পত্তি নিয়ে প্রতারণার অভিযোগ তদন্ত করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

প্রশ্ন উঠেছে বৃদ্ধ মা-বাবার নিরাপত্তা নিয়ে
একদিকে বৃদ্ধ মা-বাবার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে আইন রয়েছে, অন্যদিকে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে বয়োবৃদ্ধ মা-বাবার নির্যাতনের অভিযোগও মাঝেমধ্যে সামনে আসে। রহিমা খাতুনের অভিযোগ সত্য হলে বিষয়টি শুধু পারিবারিক বিরোধ নয়; বরং একজন অসহায় বৃদ্ধার নিরাপত্তা, সম্পত্তির অধিকার ও আইনগত সুরক্ষার প্রশ্নও এর সাথে জড়িত।

এ অবস্থায় অভিযোগটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্যতা উদঘাটন এবং বৃদ্ধা রহিমা খাতুনের নিরাপত্তা ও আইনগত অধিকার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ দাবি করেছেন তিনি।