হানিফ ফ্লাইওভার। রাজধানীতে যানজট নিরসনে নির্মাণ করা হয়েছিল সাড়ে ১১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এই ফ্লাইওভারটি। এখন সেটি যাত্রীদের গলার কাটা। অনেকে বলছেন, ‘গজব’। টোল দিয়ে উল্টো গজবের মধ্যে পড়তে হয় পথচারীদের। ১০ মিনিটের এই উড়াল সড়কটি পাড়ি দিতে এখন সময় লাগছে ২-৩ ঘণ্টা। অতিষ্ঠ যাত্রীরা একবার ফ্লাইওভারে উঠে যে নেমে যাবেন তারও সুযোগ নেই। বাধ্য হয়ে ভোগান্তি পোহাতে হয় তাদেরকে। অনেকটা হাত-পা বেঁধে নির্যাতনের মতোই।
রাজধানী ঢাকার সাথে চট্টগ্রাম, সিলেটসহ পূর্বাঞ্চলীয় ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ৩০টি জেলার যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ করে তোলার জন্য ২০১৩ সালের অক্টোবরে চালু হয় মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভার। প্রায় সাড়ে ১১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে উড়াল সড়কটি শনির আখড়া ও দোলাইপাড় থেকে যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, গুলিস্তান হয়ে চানখারপুল গিয়ে শেষ হয়েছে। শুরুর দিকে কেবল চট্টগ্রাম, সিলেটসহ পূর্বাঞ্চলীয় জেলার মানুষ ফ্লাইওভারটি দিয়ে যাতায়াত করলেও পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর খুলনা-বরিশালসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাধারণ মানুষ উড়ালসড়কটি ব্যবহার করে যাতায়াত শুরু করে। ফলে সময়ের সাথে সাথে ফ্লাইওভারে গাড়ির চাপও বাড়তে শুরু করে। প্রতিদিন চারটি পয়েন্ট দিয়ে কয়েক হাজার ঢাকামুখী যানবাহন প্রবেশ করে এই ফ্লাইওভারে। এগুলো হলো- শনির আখড়া, ডেমরা, সায়েদাবাদ ও দোলাইপাড়। নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন জেলার পরিবহন, ব্যক্তিগত গাড়ি শনির আখড়া পয়েন্ট দিয়ে হানিফ ফ্লাইওভারে প্রবেশ করে। সিলেট ও উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় জেলার পরিবহন ও যাত্রীরা ডেমরা টোল প্লাজা দিয়ে উড়ালসড়কে প্রবেশ করে। বরিশাল ও খুলনাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যানবাহন দোলাইপাড় পয়েন্ট দিয়ে ফ্লাইওভারে ওঠে। এ ছাড়া সায়েদাবাদ থেকে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন অঞ্চলের গাড়ি এই উড়ালসড়ক ব্যবহার করে ওঠানামা করছে।

প্রতি মিনিটে এই ফ্লাইওভারে ১০০টির বেশি যানবাহন প্রবেশ করলেও বের হতে পারে না তার অর্ধেকও। ফলে ধীরে ধীরে তৈরি হয় তীব্র যানজট। যেটা এক সময় ফ্লাইওভার পাড় হয়ে প্রবেশমুখের প্রধান সড়কেও। যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেঁসে যেতে হয় সাধারণ যাত্রীদের।
হানিফ ফ্লাইওভারে সবসময় ঢাকামুখী অংশে যানজট লেগে থাকে। এর অন্যতম কারণ ফ্লাইওভার থেকে গাড়িগুলো বের হওয়ার প্রধান দুই পয়েন্ট-গুলিস্তান ও চানখারপুলের নাজুক চিত্র! মূলত এই দুটি টোল প্লাজা দিয়ে সাধারণ যাত্রীরা ঢাকায় প্রবেশ করেন। মাত্র দুই লেনের গুলিস্তান ও এক লেনের চানখারপুলের প্রবেশদ্বারে সবসময়ই যানবাহনের ‘জটলা’ লেগে থাকে। যে কারণে টোল প্লাজার সামনে এসে কচ্ছপের গতিতে এগোতে থাকে পরিবহনগুলো। হানিফ ফ্লাইওভারের গোলাপবাগ দিয়ে কমলাপুর, সায়েদাবাদ, মালিবাগ, রামপুরাগামী যানবাহন নামে। গোলাপবাগে নামতে গিয়েও প্রতিদিন যানজটে আটকে থাকতে হয়।

শফিকুল ইসলাম নামের এক যাত্রী বলেন, তিনি শনির আখড়া থেকে ফ্লাইওভারে ওঠার পর আড়াইঘণ্টা লেগেছে চানখারপুল পর্যন্ত যেতে। তিনি বলেন, কষ্টে মনে হচ্ছিল ফ্লাইওভার থেকে লাফ দেই। কোথাও দিয়ে নেমে যাবেন সেই সুযোগও নেই। মীম ওয়ালিউল্লাহ নামে এক পথচারী বলেন, যাত্রাবাড়ী থেকে শনিবার সন্ধ্যা ৭টায় অ্যাম্বুলেসে রোগী ও মাইক্রোতে স্বজনদের নিয়ে রাত পৌনে ১০টায় ঢাকা মেডিক্যালে পৌঁছেছে। আহারে প্রস্রাব, পায়খানার বেগ পাওয়া স্বজনদের নিয়ে যে কষ্ট পেয়েছি তা বর্ণনাতীত।
সাইদুর রহমান নামে এক যাত্রী বলেন, সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি হয় রাতের বেলায়। সারারাত এই ফ্লাইওভারে যানজট থাকে। কখনো কখনো এই যানজট কাঁচপুর ব্রিজ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে। ও দিকে, বুড়িগঙ্গা সেতু পার হয়ে যায় যানজট। যানজটে আটকে পড়া মানুষ এক বোতল পানি খেতে চাইলেও পান না। সবচেয়ে ভোগান্তিতে পড়ে রোগীবাহী গাড়িগুলো। নিচের রাস্তায় আশপাশ কাটিয়ে অন্য রাস্তা দিয়ে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছার সুযোগ থাকলেও ফ্লাইওভারে উঠে যানজটে আটকা পড়লে আর কোনোই সুযোগ থাকে না।
অভিজ্ঞ মহলের ধারণা পরিস্থিতি যেখানে পৌঁছেছে এ থেকে আপাতত পরিত্রাণের কোনো উপায় নেই। বরং গাড়ির সংখ্যা দিন দিন যে বাড়ছে-ভবিষ্যতে এটির ভয়াবহতা আরো তীব্র হবে। অনেকে বলছেন, ক্যাশ এর মাধ্যমে টোল গ্রহণ পদ্ধতি বাতিল করে ক্যামেরা টোল চালু করতে হবে। এতে পরিবহন বা কারের প্লেট নম্বর পড়ে মালিকের অ্যাকাউন্ট থেকে সমপরিমাণ টাকা অ্যাডজাস্ট হয়ে টোল আদায় হয়ে যাবে। এ পদ্ধতিতে গাড়ি নির্ধিদ্বায় চলতে থাকবে। এ ক্ষেত্রে শুধু ট্রাফিক পুলিশকে ফ্লাইওভার থেকে নামা যানবাহন চলাচলের রাস্তা ফাঁকা রাখা নিশ্চিত করতে হবে।