গোপালগঞ্জে বাজারের চেয়ে সরকারী মূল্য কম হওয়ায় খাদ্য গুদামে ধান ও চাল বিক্রিতে কৃষকদের মাঝে দেখা দিয়েছে অনাগ্রহ। ফলে জেলার ছয়টি গুদামের মধ্যে পাঁচটি খাদ্য গুদামই কৃষকের কাছ থেকে এক ছটাক ধানও কিনতে পারেনি।

চলতি মৌসুমে গোপালগঞ্জ জেলার ছয়টি খাদ্য গুদামে ৯০৬ মেট্রিক টন ধান ও তিন হাজার ৪২৯ মেট্রিক টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়। এছাড়াও প্রতি কেজি চালের দাম ৪৭ ও প্রতি কেজি ধানের দাম ৩৩ টাকা নির্ধারণ করা হয়। অথচ বাজারে প্রতি কেজি চাল ৫৫ টাকা থেকে ৭০ টাকা এবং ধান প্রতি কেজি ৩৫ থেকে ৩৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এতে খাদ্য গুদামে ধান ও চাল বিক্রিতে কৃষকদের সাড়া মিলছে না।

টুঙ্গিপাড়া খাদ্য গুদামে এখনো পর্যন্ত ২৪ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া জেলার চার উপজেলা মুকসুদপুর, কোটালীপাড়া, গোপালগঞ্জ সদর, কাশিয়ানীর দুটি খাদ্য গুদাম রামদিয়া ও ভাটিয়াপাড়াসহ মোট পাঁচটি গুদামে ধান বিক্রি করেনি কৃষকরা।

সংগ্রহ বিবরণী থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, ১৬ ফেব্রয়ারি পর্যন্ত জেলায় ৯০৬ মেট্রিক টন ধান লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে মাত্র ২৪ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। ধান সংগ্রহের হার তিন শতাংশ।

অন্যদিকে, তিন হাজার ৪২৯ মেট্রিক টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সিদ্ধ চাল সংগৃহীত হয়েছে দুই হাজার ৭৬৯ মেট্রিক টন। সিদ্ধ চাল সংগ্রহের হার ৮১ শতাংশ।

একই সময়ে ৮৭ মেট্রিক টন আতপ চাল সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৩৭ মেট্রিক টন ৫৫০ কেজী আতপ চাল সংগৃহীত হয়েছে। আতপ চাল সংগ্রহের হার ৪৩ শতাংশ।

গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার গোবরা গ্রামের কৃষক কালু শেখ ও আলমগীর শেখ জানান, সরকারী গুদামে ধান বিক্রি করতে গিয়ে আর্দ্রতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে ঝামেলা পোহাতে হয়। আবার ধান বিক্রির টাকা নিতে গেলে ব্যাংক হিসাব খুলতে হয়। তাই এসব ঝামেলার কারণে কৃষকরা সরকারী খাদ্য গুদামে ধান বিক্রিতে অনীহা দেখাচ্ছেন। এছাড়া সরকারী মূল্যের চেয়ে বাজার মূল্য বেশি হওয়ায় কেউ ধান দিতে চাইছেন না।

প্রগতি গ্রীন অটো রাইস মিলের ম্যানেজার অমৃত সাহা বলেন, ‘সরকার চালের দাম নির্ধারণ করেছেন ৪৭ টাকা কেজি। ধানের যে বাজার তাতে গাড়ি ভাড়া, লেবার খরচসহ এক কেজি চাল তৈরিতে আমাদের খরচ হচ্ছে ৫৫ টাকা। কেজিতে আট টাকা লোকসান দিতে হচ্ছে আমাদের। তারপরও আমরা লোকসান মেনে নিয়ে এ পর্যন্ত খাদ্য গুদামে ৮৪ মেট্র্রিক টন চাল দিয়েছি। আগামী রোববার আরো দেবো।’

গোপালগঞ্জ জেলা চালকল মালিক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মেজবাহ উদ্দীন সিকদার বলেন, ‘বর্তমান বাজারদরের সাথে সরকার নির্ধারিত বাজারের তারতম্য থাকায় মিল মালিকরা চাল দিতে চাচ্ছে না। লাইসেন্স রক্ষায় বাধ্য হয়ে লোকসান জেনেও সরকারকে চাল দিতে হচ্ছে। আমাদের যে হারে লোকসান হচ্ছে তাতে কোনো অবস্থাতেই এই লোকসান কভার করা সম্ভব হবে না।’

এ প্রসঙ্গে মুকসুদপুর সিন্দিয়াঘাট খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি এলএসডি) জুয়েল আহম্মেদ জানান, এখন পর্যন্ত গুদামে এক ছটাক ধানও কেনা সম্ভব হয়নি।

একই কথা বলেন, কোটালীপাড়া খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি এলএসডি) প্রভু চন্দ্র রাজভর।

গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ইসমাইল হোসেন জানান, চলতি বছর এ উপজেলায় সরকারী খাদ্যগুদামে কোনো ধান কেনা সম্ভব হয়নি। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, সরকারি মূল্যের চেয়ে খোলা বাজারে দাম ভালো পাওয়ায় কৃষকদের সাড়া মিলছে না।

তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।

ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়া প্রসঙ্গে গোপালগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) মো: মোশারফ হোসেন বলেন, ‘ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান ব্যর্থ হয়েছে এটা বলা যাবে না। তবে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। এখনো ধান-চাল কেনা হচ্ছে। বাজারে ধানের দাম সরকারী মূল্যের চেয়ে কিছুটা বেশি হওয়ায় কৃষক সরকারী গুদামে ধান দিচ্ছে না। যদিও চাল সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি রয়েছে।’