২০ জুন, বিশ্ব শরণার্থী দিবস। বিশ্বের অন্য শরণার্থীদের মতো কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে অবস্থানরত ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাও দিনটিতে স্মরণ করছেন নিজেদের অন্ধকার ভবিষ্যতের কথা। মানবিক সহায়তার আশ্রয়ে ক্যাম্পে আট বছর কাটানো দিনগুলো যেন তাদের জীবনে বয়ে এনেছে কেবল ক্ষত। আশার আলো নেই বললেই চলে!

ক্যাম্পের একটি ছাপড়াঘরে বসে চোখের পানি মুছতে মুছতে রোহিঙ্গা সেতারা বেগম বলেন, ‘মিয়ানমারের সেনা ও মগ যুবকদের হাতে আমার দুই মেয়েকে হারিয়েছি। বর্ষায় পাহাড় ধস, জঙ্গল পথে মাদক চোরাচালান, আর ক্যাম্পের ভেতরে সহিংসতা- সব মিলিয়ে খারাপ অবস্থায় জীবন পার করছি আমরা। আট বছর ধরে বাংলাদেশে আছি, কিন্তু এখনো ফিরতে পারছি না জন্মভূমিতে।’

ষাটোর্ধ্ব জিয়াউর রহমান জানান, ‘আমার চোখের সামনে বড় ছেলেকে হত্যা করে ঘরে আগুন দিয়েছে মিয়ানমারের সৈন্যরা। তখন থেকে আজ পর্যন্ত আমি দেশহীন। কোনো বিচার নেই, প্রত্যাবর্তনের কোনো আশ্বাসও নেই।’

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মানবিক সহায়তা প্রদানকারী বিভিন্ন সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসনের সাথে কথা বলে জানা যায়, আশ্রিতদের মধ্যে ক্রমেই বাড়ছে মানসিক ও সামাজিক অসন্তোষ। খাদ্য ও চিকিৎসা সেবার ঘাটতি, নিরাপত্তার অভাব, কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকা ও শিক্ষার সঙ্কট তাদের দীর্ঘমেয়াদি সঙ্কটে পরিণত করেছে।

বিশ্ব শরণার্থী দিবস উপলক্ষে জাতিসঙ্ঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এক বিবৃতিতে জানায়, রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সহায়তা যেমন স্থবির হয়ে পড়েছে, তেমনি প্রত্যাবাসনের কোনো রাজনৈতিক অগ্রগতিও দৃশ্যমান নয়। বাংলাদেশ সরকারও দীর্ঘসময় ধরে বিশাল এ জনগোষ্ঠীকে মানবিক কারণে আশ্রয় দিলেও তাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনই একমাত্র টেকসই সমাধান।

বিশ্লেষকরা বলছেন, রোহিঙ্গা সঙ্কট এখন আর শুধু মানবিক ইস্যু নয়। এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সঙ্কটে রূপ নিয়েছে। মিয়ানমারের ভেতরকার সামরিক রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক চাপের অভাবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ প্রায় থমকে গেছে। একটি মানবিক সঙ্কট কেবল ত্রাণ দিয়ে সমাধান করা যায় না, এর জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত কূটনৈতিক চাপ, ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও আশ্রিতদের স্বদেশে ফেরার নিশ্চয়তা।

আর ক্যাম্পে নয়, নিজেদের মাটিতে ফিরতে চাই নিরাপদে-সম্মানে। বিশ্ব শরণার্থী দিবসে এমন আবেদনই ভেসে আসছে প্রতিটি রোহিঙ্গাদের কণ্ঠে।