তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেছেন, চলনবিলের মানুষ যে অতিথি পরায়ন তা এই কুটুম বাড়ি দিয়ে ছড়িয়ে দিতে হবে। দীর্ঘদিনের অবহেলিত এই চলনবিলকে আমরা মাত্র দশ বছরেই একটি পরিবেশে আনতে পেরেছি। আজ চলনবিলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সকল ক্ষেত্রে উন্নয়ন ঘটেছে। চলনবিলের কুটুম বাড়ি নামটা শুধু ধারণ করবেন না লালন-পালনও করবেন।
চলনবিলের কুটুম বাড়ি একটি সৃজনশীল ও রুচিশীল রেষ্টুরেন্টে পরিণত করতে হবে।

রোববার রাত ৮টায় সিংড়ার পৌর বাসটার্মিনাল এলাকায় “চলনবিলের কুটুম বাড়ি” রেষ্টুরেন্টের শুভ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আদেশ আলীর পরিচালনায় উপস্থিত ছিলেন নাটোর সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলাম রমজান, সিংড়া পৌরসভার মেয়র জান্নাতুল ফেরদৌস, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আবুল খয়ের, আলহাজ্ব আনোয়ার সাদাত, চলনবিলের ডাহিয়া ইউপি চেয়ারম্যান এমএম আবুল কালাম, চৌগ্রাম ইউপি চেয়ারম্যান জাহেদুল ইসলাম ভোলা প্রমূখ।

চলনবিলের কুটুম বাড়ি রেষ্টুরেন্টের স্বত্তাধিকারী ও চৌগ্রাম ইউপি চেয়ারম্যান জাহেদুল ইসলাম ভোলা বলেন, চলনবিলে ভ্রমণ পিপাসুদের আপ্যায়ন করবে। এতে সিংড়ার মর্যাদা ও সমৃদ্ধিকে আরো বৃদ্ধি করবে। সারাদেশে চলনবিলের নাম ছড়িয়ে দিতে ব্যতিক্রমধর্মী এই রেষ্টুরেন্ট উদ্বোধন করা হল।
যেখানে স্বল্প মূল্যে ও ভেজাল মুক্ত বাংলা-চাইনিজ ও ফাস্টফুড এর ব্যবস্থা থাকছে।

পরে রাত সাড়ে ৯টায় প্রায় ৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে সিংড়া শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক।

আরো পড়ুন: ঐতিহ্য হারাতে বসেছে চলনবিল জাদুঘর

আতাহার হোসেন গুরুদাসপুর (নাটোর) ২৭ আগস্ট ২০১৮

চলনবিলের প্রাণকেন্দ্র নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজীপুর বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের সুরম্য অট্টালিকার পাশে প্রতিষ্ঠিত চলনবিল জাদুঘরটি কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা আর অযন্ত-অবহেলায় হারাতে বসেছে আপন গৌরব ও ঐতিহ্য।

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর চলনবিল জাদুঘর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন চলনবিলের অগণিত প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা বিলচলনী বলে খ্যাত অধ্যক্ষ এম এ হামিদ। দেশের বিভিন্ন স্থানের পুরাকীর্তি ও ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো সংরক্ষণ ও পরিচর্যার মাধ্যমে চলনবিল জাদুঘরটি টিকিয়ে রাখা সম্ভব হলেও কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে হারিয়ে যেতে বসেছে এর ঐতিহ্য।

চলনবিলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অগণিত ঐতিহাসিক নিদর্শন। যেমন চাটমোহর উপজেলার মাসুম খাঁ কাবুলির মসজিদ (কাকশালের মসজিদ ১৫১৮ খ্রি:), হান্ডিয়ালের জগন্নাথ পাইকপাড়া মসজিদ ও পাঠান আমলের বুড়াপীরের দরগা, সমাজগ্রামের সম্রাট শেরশাহের পুত্র সুলতান সেলিমের নির্মিত শাহি মসজিদ (১৫৪৯ খ্রি:), তাড়াশের প্রাচীন মন্দিরগুলো (১৬৩৫ খ্রি:), সুলতান নসরৎ শাহের রাজত্বকালে নির্মিত নওগাঁর শাহ শরীফ জিন্দানীর রহ: মাজার, বিনসারা গ্রামে মহাকালের কিংবদন্তি বেহুলা সুন্দরীর পিত্রালয়, বারুহাসের ইমামবাড়া, নিমগাছি, বুরুজ, ভোলা দেওয়ানের মাজার, রাজা অচ্যুত সেন খননকৃত জয়সাগর দিঘি, শেরশাহের সেনাপতি আনোয়ার খাঁ খননকৃত আনু খাঁর দিঘি, পাগলা পীরের মাজার, তিশিখালি ঘাসিদেওয়ানের দরগা, বুড়া পীরের মাজার, ঐতিহাসিক কলম ও তালম গ্রাম, চাপিলায় মোগল আমলের শাহি মসজিদ এবং সমসাময়িক কাচারি ও নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ।

এসব ঐতিহাসিক স্থানের পুরাকীর্তি নিদর্শনগুলো সংরক্ষণের লক্ষ্যে চলনবিলের প্রাণকেন্দ্র গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজীপুর গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয় চলনবিল জাদুঘর। এখানে রক্ষিত আছে প্রাচীন প্রত্মরাজি, শিলালিপি, টেরাকোটা, মাছ ও ঝিনুকসহ বিভিন্ন দর্শনীয় সামগ্রী, চলনবিলের অতীত ও বর্তমান সাংস্কৃতিক উপাদান ও উপকরণ, দেশী ও বিদেশী দুষ্প্রাপ্য মুদ্রা, ডাকটিকিট, মানচিত্র, নকশা, দলিলদস্তাবেজ, দানপত্র, তাম্রশাসন, চলনবিলের বিভিন্ন অঞ্চলের মাটি, আকরিক, প্রস্তরখণ্ড, শিলা, নুড়ি, ফসিল, প্রাকৃতিক ও জলজ তৃণলতা, গুল্মরাজি, অ্যাকোরিয়াম, গবেষণালব্ধ মূল্যবান গ্রন্থ, মোগল আমলের তরবারি, বাংলা অক্ষরের জন্মক্রম, সূর্যদেব, বিষ্ণু ও রাধাগোবিন্দ মূর্তি, তিনমাথা বিশিষ্ট বাঁশ, খড়ম, প্রাচীন মৃৎপাত্র, রোমান টাইপে ছাপার নমুনা, বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থ, সাহিত্য ও গবেষণামূলক পত্রপত্রিকা, পুঁথিসাহিত্য, শাহি আমলের হস্তলিখিত কুরআন শরিফ, তুলট কাগজ ও বৃক্ষছালে লিখিত হস্তলিপি, রাজা নারদ প্রসাদশাস্ত্রীর পাথরে নির্মিত প্রতিকৃতি, বেহুলা সুন্দরীর মনসা দেবীর পূজার ঘর, চলনবিল অঞ্চলের কৃতী সন্তান ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের সচিত্র জীবনবৃত্তান্ত।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রতিষ্ঠার তিন বছর পর্যন্ত চলনবিল জাদুঘরের জন্য সরকারিভাবে কোনো আর্থিক সহায়তা পাওয়া যায়নি। তার পর থেকে যতটুকু পাওয়া গেছে তাও প্রয়োজনের চেয়ে অপ্রতুল। একমাত্র স্থানীয় আর্থিক অনুদান ও সাহায্য সহযোগিতার মাধ্যমেই এই গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠানটি গড়ে উঠেছে।

চলনবিল জাদুঘরকে সমৃদ্ধশালী করে চালু রাখার লক্ষ্যে নব্বইয়ের দশকে একে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার জন্য বহু দেনদরবার ও তদবিরের পর একে নাটোরের রাজবাড়িতে স্থানান্তর করার উদ্যোগ নেয়া হয়।

কিন্তু প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ এর বিরোধিতা করায় বগুড়া মহাস্থান জাদুঘরের নিয়ন্ত্রণে চলনবিল জাদুঘর পরিচালনা করার ব্যবস্থা করা হয়। অতীতে চলনবিল জাদুঘরে দেশ-বিদেশের হাজারো পর্যটক ও দর্শনার্থী বিভিন্ন ঋতু বিশেষ করে বর্ষাকালে ভিড় জমালেও অব্যবস্থাপনার কারণে এখন জাদুঘরটিতে তেমন ভিড় দেখা যায় না।