গণ-অভ্যুত্থানকালে ঊনসত্তরের ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) রসায়ন বিভাগের শিক্ষক ও তৎকালীন প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে নিহত হন। এ দিন তিনি বলেছিলেন, কোন ছাত্রের গায়ে গুলি লাগার আগে আমার গায়ে যেন গুলি লাগে। শিক্ষার্থীদের কথা ভেবে নিজের জীবনকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। তিনিই প্রথম নিহত বাংলাদেশী বুদ্ধিজীবী। তাই এই দিনটিকে ঘিরে তাকে বিন¤্র শ্রদ্ধায় স্মরণ রাখতে চায় বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন। তা ছাড়া বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, তার এই হত্যার দিবসটিকে ‘শিক্ষক দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হোক। কিন্তু আজো স্বীকৃতি মেলেনি দেশের ইতিহাসে প্রথম বুদ্ধিজীবী শহীদের। শুধুমাত্র রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের গণ্ডিতে ‘শিক্ষক দিবস’ হিসেবেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে।
জাতীয় শিক্ষক দিবস ঘোষণার প্রতিশ্রুতি পেলেও তা স্বপ্নই থেকে যায়। এ বিষয়ে শিক্ষক সমিতির সভাপতি ড. আমজাদ হোসেন বলেন, মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না। শুধু শিক্ষকরা নয় এ বিশ^বিদ্যালয় পরিবারের শিক্ষার্থী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রাণের দাবি দিনটিকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেয়া হোক।
দিনটি উপলক্ষে প্রতি বছরের মতো এবার নানা কর্মসূচি পালন করে বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন। কর্মসূচির মধ্যে ভোরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রশাসন ভবনসহ অন্যান্য ভবনে কালো পতাকা উত্তোলন, সকাল ৭টায় প্রশাসন শহীদ ড. জোহার সমাধি ও জোহা স্মৃতিফলকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে এক মিনিট নীরবতা পালন ও মুনাজাত করে। এরপর রসায়ন বিভাগ ও শহীদ শামসুজ্জোহা হলসহ অন্যান্য আবাসিক হল, বিভাগ, রাবি প্রেস ক্লাব, পেশাজীবী সমিতি ও ইউনিয়ন ইত্যাদি প্রভাতফেরিসহ শহীদ জোহার সমাধি ও স্মৃতিফলকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে।
পরে সকাল সাড়ে ১০টায় শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সিনেট ভবনে অনুষ্ঠিত হয় জোহা স্মারক বক্তৃতা। এতে ‘চরিতার্থ এক বিজ্ঞানজীবন : নির্মিতি ও সমকালের ভাবনা’ শীর্ষক বক্তৃতা করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক শ্যামল চক্রবর্তী।
বাদ জোহর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে কুরআনখানি ও বিশেষ মুনাজাত, শহীদ শামসুজ্জোহা হলে মাহফিল ও প্রদীপ প্রজ্বলন হয়। উল্লেখ্য, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন গড়ে তোলেন। এতে পাক-বাহিনী পূর্ব-পাকিস্তানে ১৪৪ ধারা জারি করলে ১৮ ফেব্রুয়ারি সকালে এ ধারা উপেক্ষা করে প্রধান ফটকের সামনের মহাসড়কে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। এ সংবাদে প্রক্টর ড. জোহা প্রধান ফটকে ছুটে যান। জোহা পাকবাহিনীর উদ্দেশে বলেন, ‘কোনো ছাত্রের গায়ে গুলি লাগার আগে আমার গায়ে যেন গুলি লাগে।’ ড. জোহা ‘ডন্ট ফায়ার! ডন্ট ফায়ার!’ বলে চিৎকার করতে থাকেন। কিন্তু বেলা ১১টার সময় ক্যাপ্টেন হাদী তার পিস্তল বের করে ড. জোহাকে লক্ষ্য করে গুলি করে। হাসপাতালে নেয়ার পথে ড. জোহা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।