পাহাড়িদের বর্ষবরণ বৈসাবি উৎসবে মুখরিত এখন বান্দরবান। চারিদিকে চলছে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়ার নানা আয়োজন। পাড়ায় পাড়ায় চলছে নাচ গান পিঠা পুলি তৈরী আর পূজা-অর্চনা।

শুক্রবার সকালে সাঙ্গু নদীতে ফুল বাসানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের বর্ষবরণ উৎসব বিজু ও বিসু। নানা রঙের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে তঞ্চঙ্গ্যা তরুণ-তরুণীরা নদীতে ফুল ভাসিয়ে উৎসবের সূচনা করে। নদীতে ফুল ভাসানোর পর নতুন বছরের শুভ কামনায় সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করে তারা।

এদিকে তঞ্চঙ্গ্যাদের পাড়ায় পাড়ায় আয়োজন করা হয়েছে ঘিলা খেলা প্রতিযোগিতার। পাহাড়ি এক প্রকার ফুলের শক্ত বিজ এই ‘ঘিলা’কে পবিত্র মনে করে তঞ্চঙ্গ্যারা। তাই এই ফলের বিজ দিয়ে খেলার আয়োজন করা হয়।

অন্যদিকে চাকমারা সকালে তাদের ভগবান বুদ্ধের উদ্যোশে পূজা দিয়ে ঘরবাড়ি মুছে পবিত্র করে নতুন বছরকে বরণ করে নিয়েছে। এছাড়া বয়স্কদের কাছে আর্শিবাদ নিয়েছে। কাল শনিবার চাকমাদের মূল বিজু।

এদিকে শনিবার থেকে বান্দরবানে শুরু হচ্ছে মারমা সম্প্রদায়ের বর্ষবরণ সাংগ্রাই উৎসব। তরুণ-তরুণীরা একে অপরের গায়ে পানি ছিটিয়ে বরণ করে নিবে নতুন বছরকে। পবিত্র পানির ধারা ধুয়ে মুছে দিবে পুরনো বছরের সব দুঃখ-গ্লানি। পাড়ায় পাড়ায় চলবে মৈত্রী পানি বর্ষণের আয়োজন।

ম্রো সম্প্রদায়ের বর্ষবরণ চাংক্রান ও ত্রিপুরাদের বৈসু উৎসবও চলছে বান্দরবানের পাহাড়ি পল্লিগুলোতে।

বান্দরবানের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বৈচিত্রপূর্ণ্য এ বর্ষবরণকে ঘিরে পর্যটকরা ভিড় জমিয়েছেন বান্দরবানে।

আরো পড়ুন :
পাহাড়ে বৈসাবির আমেজ
রাঙ্গামাটি সংবাদদাতা, ১২ এপ্রিল ২০১৯
পাহাড়ে ইতোমধ্যে বিরাজ করছে বৈসাবি উৎসবের আমেজ। চৈত্র সংক্রান্তিতে পুরনো বছরকে বিদায় ও নতুন বছরকে বরণ করতে স্থানীয়রা মেতেছে সামাজিক উৎসব পালনে। ত্রিপুরারা বৈসু,মারমারা সাংগ্রাই, চাকমারা বিঝু আর তংচঙ্গ্যাদের বিষু উৎসব যে নামে হোক সমতলের মানুষের কাছে এ উৎসব বৈসাবি নামে পরিচিত। পার্বত্য এলাকায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জাতিগুলোর ঐতিহ্য রক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশে এবং সব ক্ষুদ্র জাতিকে এক কাতারে নিয়ে আসে এই বৈসাবি উৎসব। আজ শুক্রবার থেকে শুরু হচ্ছে এ উৎসব।

তিন দিনব্যাপী এই উৎসবের প্রথম দিনকে চাকমা ভাষায় ফুল বিঝু, দ্বিতীয় দিনকে ‘মূল বিঝু’ এবং তৃতীয় দিনকে ‘নুয়াবঝর’ বা ‘গোজ্যা পোজ্যা দিন’বলা হয়। এভাবেই ত্রিপুরারা প্রথম দিনকে ‘হারিকুইসুক’ দ্বিতীয় দিনকে ‘বুইসুকমা’ এবং তৃতীয় দিনকে ‘বিসিকাতাল’ নামে অভিহিত করে থাকেন। আর মারমারা নতুন বছরে পালন করে সাংগ্রাই।

আজ সকাল সাড়ে ৭টায় রাজবাড়ী ঘাটে আর শহরের ত্রিপুরা পল্লী খ্যাত গর্জনতলীতে সকাল ৮টায় রয়েছে ফুল ভাসানো অনুষ্ঠান।
১৩ এপ্রিল হচ্ছে পাহাড়িদের মূল অনুষ্ঠান বৈসাবি। রান্না হবে ঐতিহ্যবাহী পাজন। ১৫ এপ্রিল সোমবার প্রতি বছরের মতো এবারো বৈসাবি উপলক্ষে মারমা সাংস্কৃতিক সংস্থার (মাসস) উদ্যোগে রাঙ্গামাটির কাপ্তাইয়ের রাইখালীতে অনুষ্ঠিত হবে মারমাদের ঐতিহ্যবাহী জল উৎসব ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এ উৎসববে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন রাঙ্গামাটির সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদার এমপি।

উৎসব প্রিয় পাহাড়িরা সারা বছর মেতে থাকেন নানান অনুষ্ঠানে। তবে তার সব কিছুকে ছাপিয়ে যায় চৈত্র সংক্রান্তির বৈসাবি উৎসবের মাধ্যমে। বৈসাবিকে কেন্দ্র করে তিন দিন ধরে উৎসব করার কথা থাকলেও তা চলবে সপ্তাহ ধরে।

নদীতে ফুল ভাসানো, বয়স্ক স্নান আর পানি খেলার পাশাপাশি পাহাড়ি সংস্কৃতি মেলা, ঐতিহ্যবাহী খেলাধূলার মধ্য দিয়ে সপ্তাহ ধরে চলবে এ উৎসব।

চাকমাদের বিঝু। উৎসবরে প্রথম দিনকে চাকমারা বলে ‘ফুল বিঝু’। ১২ এপ্রিল চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিনকে বলা হয় ফল বিজু। উৎসবের প্রথম দিনে চাকমা, ত্রিপুরা ও মারমারা বন থেকে ফুল আর নিমপাতা সংগ্রহ করে সেই ফুল দিয়ে ঘর সাজায় ও গঙ্গা দেবীর উদ্দেশে নদীতে ফুল ভাসায়।

এই দিন বিঝুর ফুল তোলা হয় এবং ফুল দিয়ে ঘর সাজানো হয়। পরে সে ফুল দিনান্তে নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। বিঝুর সময় ছোট ছেলেমেয়েরা পরিচ্ছন্ন কাপড় পরে দলবেঁধে বাড়ি বাড়ি বেড়াতে যায়। ১৩ এপ্রিল আর চৈত্র সংক্রান্তির দিনকে বলা হয় মূল বিজু।

ত্রিপুরাদের উৎসব বৈসু। বৈসু উৎসবের প্রথম দিন ত্রিপুরারা ফুল তোলে। ফুল দিয়ে ঘর সাজায়।

মারমাদের উৎসব হলো সাংগ্রাই। মারমারা সাধারণত মঘীসনের চান্দ্র মাস অনুসারে এই দিনটি পালন করে থাকে। বছরের শেষ দুই দিন এবং নববর্ষের প্রথম দিন এই তিন দিন পালিত হয় এই উৎসব। সাংগ্রাই উৎসব উদযাপনের সময় মারমা যুবক-যুবতীরা পিঠা তৈরি করার জন্য চালের গুঁড়া তৈরি করে। এই সময় ‘পানি খেলা’ হয়।

১৪ এপ্রিল ১ বৈশাখ উৎসবের তৃতীয় দিন থেকে শুরু হয় মারমা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী জলকেলি তথা পানি খেলা উৎসব। সপ্তাহজুড়ে এই পানি খেলা উৎসবের মধ্যে দিয়ে শেষ হবে পাহাড়ের বৈসাবি উৎসব।