মাধ্যমিক স্তরে অতিরিক্ত পাঠ্যবইয়ে দিশেহারা শিক্ষার্থী আর অভিভাবক। ষষ্ঠ শ্রেণীর একজন শিক্ষার্থীকে বর্তমানে পড়তে হচ্ছে ১৪টি সরকারি পাঠ্যবই। সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের সরকারি বইয়ের সংখ্যাও একই। ষষ্ঠ শ্রেণীতে ১৪টি সরকারি পাঠ্যবইয়ের মধ্যে ১০টি বিষয়ের পরীক্ষা নেয়া হয়। কোনো কোনো স্কুলে ১২টি বিষয়েও পরীক্ষা নেয়া হয়। বাকি তিনটি বিষয়ে পরীক্ষা না থাকলেও সেগুলো থেকে চাপমুক্ত নয় শিক্ষার্থীরা। কারণ সারা বছর ক্লাসের পাশাপাশি সেগুলোরও অ্যাসাইনমেন্ট করতে হয় শিক্ষার্থীদের।
মাধ্যমিকে অতিরিক্ত পাঠ্যবই যেমন একটি বড় বোঝা শিশু শিক্ষার্থীদের জন্য তেমনি বিভিন্ন বইয়ে পাঠ্যকৃত বিষয় নিয়েও তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে অভিভাবকদের মধ্যে। বিশেষ করে বিভিন্ন শ্রেণীর গণিত বইয়ের বিষয় নিয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা। ষষ্ঠ শ্রেণীর গণিত বইয়ে এমন অনেক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা আগে সপ্তম, অষ্টম এমনকি নবম শ্রেণীতে পড়ানো হতো বলে জানিয়েছেন অনেক অভিভাবক ও শিক্ষক। ষষ্ঠ শ্রেণীতে বীজগণিত, পুরো মাত্রায় জ্যামিতি, পরিসংখ্যানসহ গণিতের বিভিন্ন জটিল বিষয় নিয়ে আসা হয়েছে, যা তাদের জন্য অনুপযুক্ত বলে মনে করেন অনেকে।
তৃতীয় শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত বর্তমানে সরকারি পাঠ্যবই ছয়টি। কিন্তু এক লাফে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ১৪টি বই পাঠ্য করা হয়েছে সরকারিভাবে। এটা অনেকেই মেনে নিতে পারছেন না। অতিরিক্ত পাঠ্যবই, তীব্র পড়ার চাপ আর অতিরিক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে শিশুদের ভালোর চেয়ে ক্ষতিই বেশি হচ্ছে বলে মনে করেন অনেক অভিভাবক।
বর্তমানে রাজধানীসহ সারা দেশে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষা চলছে। রাজধানীর অনেক স্কুলে গতকাল বুধবার বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে। অনেক স্কুলে এখনো পরীক্ষা চলছে। ষষ্ঠ শ্রেণীর ১০টি বিষয়ের মধ্যে বাংলা ও ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে ৫০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা। বাকি বিষয়গুলোতে এক শ’ নম্বরের পরীক্ষা। বিভিন্ন স্কুলে নেয়া হচ্ছে টানা পরীক্ষা। কোনো কোনো স্কুলে ১০টি পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে মাত্র ১২ দিনে। এ নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবক চূড়ান্ত নাজেহাল হচ্ছেন। বিশেষ করে যাদের একাধিক স্কুলগামী সন্তান রয়েছে, তাদের অবস্থা বেশি শোচনীয়।
গতকাল পরীক্ষা শেষ হয়ে যাওয়া রাজধানীর একটি স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণীর এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, ১২ দিনে ১০টি পরীক্ষা নেয়া হয়েছে। শুধু দু’টি বিষয়ের আগে একদিন করে বন্ধ ছিল। বাকি আটটি বিষয়ে টানা পরীক্ষা হয়েছে। টানা পরীক্ষা নেয়ার কারণে অনেক বিষয়ে আগে পড়া থাকলেও পরীক্ষার আগে পড়ার কোনো সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে না সময় স্বল্পতার কারণে। পরীক্ষা দিয়ে বাসায় ফেরার সাথে সাথে আবার তাদের পড়তে বসাতে হয়। রাতে ঠিকমতো ঘুমানোরও সুযোগ পায় না। তার পরও সব বিষয় পড়ে শেষ করা যায় না। এত ছোট শিশুদের এভাবে সারা দিন রাত টানা পড়ানো যায় না। কিন্তু করার তো কিছু নেই।
আরেকজন অভিভাবক জানান, তার দুই সন্তানের পরীক্ষা একসাথে শুরু হয়েছে। একজন দ্বিতীয় শ্রেণীতে আরেকজন ষষ্ঠ শ্রেণীতে। দ্বিতীয় শ্রেণীর সন্তানের পরীক্ষা শুরু হয় সকাল ৯টায় আর শেষ হয় ১১টা। ষষ্ঠ শ্রেণী পড়ুয়া সন্তানের পরীক্ষা শুরু হয় দেড়টায় আর শেষ হয় সাড়ে ৪টায়। তাদের আনা-নেয়ার জন্য মোট চারবার স্কুলে যেতে হয়। কিন্তু আমার অফিস থাকার কারণে শুধু ৯টার সময় ছেলেকে স্কুলে পৌঁছে দিতে পারি। বাকি তিনবার সন্তানের মাকে স্কুলে যেতে হয় কোলের সন্তান সাথে নিয়ে। এটি তার জন্য ভীষণ হয়রানি। সাড়ে ৪টায় পরীক্ষা শেষ করে সন্তান নিয়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে বর্তমানে সন্ধ্যা হয়ে যায়। পরীক্ষার সংখ্যা কম হলে হয়রানি একটু কমতো বলে জানান তিনি।
ষষ্ঠ শ্রেণীর একজন শিক্ষার্থীকে বর্তমানে সরকারিভাবে যেসব পাঠ্যবই বাধ্যতামূলকভাবে পড়তে হয় সেগুলো হলো বাংলা প্রথম পত্র ও দ্বিতীয় পত্র, ইংরেজি প্রথম পত্র ও দ্বিতীয় পত্র, গণিত, ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা, বিজ্ঞান, বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়, আনন্দ পাঠ, চারু ও কারুকলা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, কৃষি শিক্ষা/গার্হস্থ্য বিজ্ঞান, কর্ম ও জীবনমুখী শিক্ষা ও শারীরিক শিক্ষা। এসব বইয়ের বাইরে প্রতি বিষয়ে একাধিক গাইড পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের।





