রংপুর বিভাগের আট জেলায় মোটরসাইকেল এবং ব্যক্তিগত পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল পেট্রোল-অকটেন উধাও হয়ে গেছে। এজন্য চলছে হাহাকার। পাম্পমালিকরা সরবরাহ না থাকার কথা বলছেন। আর সরবরাহকারীরা বলছেন, গ্যাসফিল্ড থেকে তেল কম পাওয়ার কারণে সরবরাহ নেই। এদিকে খোলাবাজারে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সঙ্কটকে পূজি করে লিটার প্রতি দাম বাড়িয়েঝে ৪০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত।
জ্বালানি তেলের সঙ্কটের কারণ হিসেবে যমুনা অয়েলের চট্টগ্রাম টার্মিনালের ডেপুটি ম্যানেজার (অপারেশনস) নজরুল ইসলাম জানান, বিপিসি থেকেই আমরা পেট্রল কম পাচ্ছি। ফলে ডিপোগুলোয় বণ্টনের ক্ষেত্রে চাহিদার তুলনায় কম পেট্রল দিতে হচ্ছে। এ কারণে সঙ্কট তৈরি হয়েছে। তিনি আরো জানান, তবে মূল কারণ হচ্ছে বিশ্বে তেলের বাজার টালমাটাল। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধির ফলে এক বছর ধরেই দেশে আমদানি করা জ্বালানি তেলের ট্যাংকার কম আসছে।
বিপিসির আওতাধীন জ্বালানি তেল সরবরাহের তিন কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েলের পার্বতীপুর রেলওয়ে অয়েল হেড ডিপোর ইনচার্জ এমরানুল হাসান জানান, ডিপোতে গত ১ সপ্তাহ ধরে কোনো পেট্রোল নেই। ১০ দিন আগে প্রায় তিন লাখ লিটার পেট্রল এসেছিল এই ডিপোতে। তিনি জানান, সপ্তাহখানেক ধরে মৌলভীবাজারের রশিদপুর গ্যাসফিল্ড থেকে হঠাৎ করে পেট্রোল আসা কমে যাওয়ায় ডিপোতে পেট্রোল সঙ্কট দেখা দিয়েছে। পেট্রোল নিতে আসা ট্যাংকলরিগুলো টার্মিনালে ৪/৫ দিন অপেক্ষা করেও পেট্রল পাচ্ছে না।
পেট্রোল সঙ্কটের বিষয়ে মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের ডেপুটি ম্যানেজার কাজী মো. রবিউল আলম বলেন, বর্তমানে গ্যাসফিল্ড থেকে যে পরিমাণ পেট্রোল আসছে তাই আমরা ডিলার ও এজেন্টদের সরবরাহ করছি। আজ-কালের মধ্যেই পার্বতীপুর ডিপোতে প্রায় তিন লাখ লিটার জ্বালানি তেল (পেট্রোল) এসে পৌঁছাবে। বর্তমানে তিন কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনায় প্রায় ৬০ লাখ লিটার ডিজেল এবং সাড়ে চার লাখ লিটার অকটেন মজুদ রয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি পদ্মা অয়েলের পার্বতীপুর ডিপোর উপব্যবস্থাপক (অপারেশন) আজম খান জানিয়েছেন, আমরা গ্যাসফিল্ড থেকে পেট্রোল ও অকটেন কম পাচ্ছি। তাই বিভিন্ন ডিলার ও এজেন্টদের ঠিকমতো সরবরাহ করতে পারছি না। সরবরাহ স্বাভাবিক হলে জ্বালানি তেলের সঙ্কট থাকত না। কবে নাগাদ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে এটা বলতে পারেননি তিনি।
এদিকে যমুনা অয়েল লিমিটেডের দিনাজপুরের পার্বতীপুর ডিপোর ইনচার্জ মো. আহসান বলেন, ‘আমরা খুলনা থেকে পার্বতীপুর ডিপোয় পেট্রোল নিয়ে এসে বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করি। গত মার্চ মাস থেকে তেলের স্বাভাবিক সরবরাহ নেই। চট্টগ্রাম থেকেও তেল আসছে না। তবে কেন আসছে না তা আমরা জানি না।
তিনি আরো জানান, পেট্রল সংকটের কারণে অকটেনের ওপর চাপ বেড়েছে। সে কারণে অকটেনের ওপরও প্রভাব পড়ায় এরও সরবরাহে ব্যাঘত ঘটেছে। কবে নাগাদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য আমার কাছে নেই।
সরেজমিনে এবং মাঠ থেকে পাওয়া তথ্যমতে, কর্তৃপক্ষ যখন এমন কথা বলছে তখন বাইরের ফিলিং স্টেশনগুলোতে থেকে উধাও হয়ে গেছে পেট্রোল, অকটেন। কোথাও ডিসপেনসার ইউনিট মেশিন (ডিইম) মেশিন কালো কাপড়ে মুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কোথাও লিখে দেয়া হয়েছে পেট্রোল অকটেন নেই। এই সুযোগে খোলা বাজারে পেট্রোল অকটেন বিক্রি হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা লিটারে। ভোগান্তিতে পড়েছেন মোটরসাইকেল, কারসহ পেট্রোল, অকটেন নির্ভর পরিবহন মালিকরা।
সূত্রমতে, রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল বিপণনকারী মেঘনা, পদ্মা ও যমুনা পেট্রোলিয়ামের আওতায় রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে ১৫২টি ফিলিং স্টেশন আছে। এর মধ্যে রংপুরে রয়েছে ৮৫টি। চার জেলায় প্রতিমাসে পেট্রোল ২৫ লাখ ৫০ হাজার ও অকটেন চার লাখ ৪০ হাজার লিটার প্রয়োজন। অন্যদিকে দিনাজপুরের পার্বতীপুর রেলহেড অয়েল ডিপোতে পেট্রোলের দৈনিক চাহিদা এক লাখ ৮০ হাজার লিটার। এ ডিপো থেকে প্রতিদিন উত্তরাঞ্চলের আট জেলা ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নীলফামারী, দিনাজপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর ও গাইবান্ধাসহ ৪১০টি পেট্রোল পাম্পে পেট্রোল সরবরাহ করা হয়ে থাকে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স ডিস্ট্রিবিউটর্স এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন রংপুর শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজ শহিদ শোভন বলেন, পার্বতীপুর ও বাঘাবাড়ি ডিপোয় জ্বালানি তেল না পাওয়ায় ভোগান্তি পোহানোর পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন ফিলিং স্টেশন মালিকরা। চট্টগ্রাম থেকে রেলের ওয়াগনে করে জ্বালানি তেল রংপুরের ডিপোয় আনা হয়। প্রতি মাসে তিন-চারবার ওয়াগনে করে জ্বালানি তেল আনার কথা থাকলেও আনা হয় এক-দুবার। এ কারণে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দেয়।
রংপুর বিভাগীয় পেট্রোল মালিক সমিতির দফতর সম্পাদক এবং মহানগরীর সাতমাথায় আব্দুল্লাহ ফিলিং স্টেশনের মালিক আতিক জানান, সরবরাহ না থাকায় আমার ফিলিং স্টেশনে পেট্রোল অকটেন বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছি। শুধু আমার পাম্প নয়, রংপুরের ৮৫টিসহ লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার ১৫২টি ফিলিং স্টেশনের একই অবস্থা। পেট্রোল অকটেরের জন্য হাহাকার চলছে। মাসখানেক থেকে এই সঙ্কট চলছিল। ঈদের পরের তিন থেকে তা ভয়াবহ অবস্থায় পৌছেছে।
এছাড়াও বদরগঞ্জের নাগেরহাটের কুতুববাবা ফিলিংস্টেশনের মালিক উত্তম সাহা জানান, প্রতি পাঁচ দিন পর সাড়ে চার হাজার লিটার পেট্রোল ও সাড়ে হাজার লিটার অকটেন আনেন তিনি। কিন্তু মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় এবং ডিপো থেকে সরবরাহ না পাওয়ায় শুক্রবার বিকেল থেকে পাম্প বন্ধ করে দিয়েছেন।
রংপুরের ডিসি আসিব আহসান জানান, পেট্রোল অকটেনের সঙ্কটের বিষয়টি আমরা বিপিসিকে জানিয়েছে। তারা ২/৩ দিনের সম্ভব সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার কথা জানিয়েছেন।
এদিকে কুড়িগ্রামের মেসার্স সাহা ফিলিং স্টেশনের স্বত্বাধিকারী সমরজিৎ সাহা রিন্টু জানান, পদ্মা অয়েল কোম্পানি আওতাধীন আমাদের দুটি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। এর মধ্যে ত্রিমোহনী এলাকায় অবস্থিত ফিলিং স্টেশনে ১৫ হাজার লিটার পেট্রোল এবং ১০ হাজার লিটার অকটেন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন দুটি ট্যাংকার রয়েছে। এখানে শনিবার দুপুরে পেট্রোলের মজুত ৭০০ লিটার এবং অকটেনের মজুত ৫০০ লিটারে নেমে আসায় বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, আদর্শ পৌরবাজার সংলগ্ন এলাকায় আমাদের মেসার্স সাহা ফিলিং স্টেশন নামে আরেকটি পাম্প রয়েছে। এ পাম্পে সাড়ে ১৪ হাজার লিটার পেট্রোল ও ১০ হাজার লিটার অকটেন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন দু'টি ট্যাংকার রয়েছে। শনিবার সকালে এখানকার মজুত পেট্রোল ৪ হাজার লিটার আর অকটেন দেড় হাজার লিটারে নেমে আসে। এখানে দৈনিক দেড় হাজার লিটার পেট্রোল ও ৫০০ লিটার অকটেন বিক্রি হয়ে থাকে। এ অবস্থায় সরকারি যানবাহন এবং মোটরসাইকেলে রেশনিং করে পেট্রোল ও অকটেন দেয়া হচ্ছে। এর বাইরে জেরিকেনে কোনো পেট্রোল ও অকটেন দেয়া হচ্ছে না।
তিনি জানান, গত ৫ মে বাঘাবাড়ী ডিপো থেকে সাড়ে চার হাজার লিটার পেট্রল আনা হয়েছিল। সেখান থেকে পেট্রোল ও অকটেন আনার জন্য এখনো দুটি ট্যাংক লরি অপেক্ষা করছে। কিন্তু মিলছে না।
কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, চাহিদা অনুযায়ী পেট্রোল ও অকটেনের সরবরাহ কম থাকায় ডিপো থেকে সরবরাহ চাহিদামত পাওয়া যাচ্ছে না। সার্বিক পরিস্থিতি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করেছেন। দ্রুত এ অবস্থার অবসান হবে বলে আশা করছি।
এদিকে দিনাজপুরের হিলির সাদুড়িয়া গ্রামে মেসার্স হিলি ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার গোলাম রব্বানি জানিয়েছেন, ‘ডিপোতে তেল না পাওয়ায় গত কয়েক দিন ধরেই আমরা গ্রাহকদের ঠিকমতো তেল দিতে পারছি না। প্রায় এক সপ্তাহ হলো আমাদের ফিলিং স্টেশনে পেট্রোল নেই। শনিবার থেকে অকটেনও তেল শেষ হয়ে গেছে। আমরা পার্বতীপুর ও বাঘাবাড়ি ডিপো থেকে তেল আনতে যোগাযোগ করে যাচ্ছি। কিন্তু তারা বলছে, তাদের ডিপোতেই তেলের সরবরাহ নেই।
দিনাজপুরের বটতলী এলাকার সমতা ফিলিং স্টেশনেরসহকারী ম্যানেজার তোফাজ্জল হোসেন বলেন, বিভাগীয় শহরের বিভিন্ন ডিপোতে তেল সঙ্কট। ঈদের দুই দিন পর থেকেই আমাদের তেল দেয়া হচ্ছে না। এজন্য আমাদের পাম্পে তেল শেষ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, তেলের প্রধান ডিপো থেকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে পেট্রোল ও অকটেন নেই। তাই আমরাও তেল বিক্রি করতে পারছি না। এজন্য ‘পেট্রল ও অকটেন নেই’ লেখা কাগজ ঝুলিয়ে দিয়েছি।
বিরল বাজারের এশিয়া ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার খায়রুল ইসলাম বলেন, ‘ডিপো থেকে আমাদের পেট্রল ও অকটেন দেয়া হচ্ছে না। এজন্য আমরা তেল বিক্রি করতে পারছি না। আমাদের কাছে মজুত করা কোনো তেল নেই।
দিনাজপুর জেলা পেট্রল পাম্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এ টি এম হাবিবুর রহমান শাহীন জানান, পার্বতীপুর রেলহেড অয়েল ডিপোতে প্রায় ১৫ দিন ধরে পেট্রলের সঙ্কট চলছে। আমরা চাহিদার চার ভাগের মাত্র এক ভাগ পেট্রল সরবরাহ পাচ্ছি। পার্বতীপুর তেল ডিপোতে জ্বালানি তেল পেট্রল সঙ্কটের বিষয়টি আমরা বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী এবং সচিবকে জানিয়েছি।’








