জয়পুরহাট সদর ও পাঁচবিবি এই দুই উপজেলা নিয়ে গঠিত জয়পুরহাট-১ সংসদীয় আসন। আগে এই আসনটি বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত থাকলেও গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগের দখলে থাকায় তৃণমূল থেকে জেলা পর্যন্ত সংগঠনটি অনেক শক্তিশালী হয়েছে। তবে বিএনপি তাদের হারানো দুর্গটি পুনরুদ্ধার করতে চায়। আগামীতে কার হাতে যাবে এই আসন তা নিয়ে চলছে বেশ জল্পনা-কল্পনা।
এ আসনে ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৪২ হাজার ৬০৭ জন। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের এমপি থাকলেও ১৯৭৫ সালের পট-পরিবর্তনের পর তা দখলে চলে যায় বিএনপির। দীর্ঘ দিন থেকে এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন প্রবীণ নেতা আব্বাস আলী মণ্ডল। তিনি ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে জিতে এমপিও হন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আব্বাস আলী মণ্ডল মাত্র ৭৪ ভোটের ব্যবধানে বিএনপির প্রার্থী গোলাম রব্বানীর কাছে পরাজিত হন। আর জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মরহুম আব্বাস আলী খান সে নির্বাচনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলে তৃতীয় হন। এর পর ২০০৮ সাল পর্যন্ত একটানা এ আসনটি দখলে রাখে বিএনপি। ১৯৯১ সালে এ আসনে বিএনপি প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করেন মরহুম গোলাম রব্বানী। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী অধ্যক্ষ খাজা সামছুল আলমকে ৩৪ হাজার ভোটে পরাজিত করেন বিএনপির প্রার্থী মরহুম মোজাহার আলী প্রধান। এ সব নির্বাচনের ফলাফলকে আমলে নিয়ে বিএনপি আগামী নির্বাচনের হিসাব নিকাশ কষছে।
এ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীরা জনসংযোগ চালানোর পাশাপাশি কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে লবিংও করেছেন মনোনয়নের আশায়। বর্তমান সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের সাবেক জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট সামছুল আলম দুদু। তিনি তার নির্বাচনী এলাকায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন পুনরায় মনোনয়ন পাওয়ার আশায়। জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি সাবেক জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আরিফুর রহমান রকেটও আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হতে চান। জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খৃষ্টান ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট নৃপেন্দ্র নাথ মণ্ডলও প্রার্থী হওয়ার জন্য গণসংযোগ করে যাচ্ছেন। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন মণ্ডলও নিজেকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। আবার বর্তমান সদর উপজেলা চেয়ারম্যান এস এম সোলায়মান আলী মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে। কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ডা: রোকেয়া সুলতানার নামও শোনা যাচ্ছে। জয়পুরহাট পৌরসভার বর্তমান মেয়র মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক, পাঁচবিবি পৌরসভার বর্তমান মেয়র হাবিবুর রহমান হাবিব ও জয়পুরহাট সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জহুরুল ইসলামের তৎপরতাও লক্ষণীয়।
এ দিকে গত ১৪ বছর জেলায় দৃশ্যমান উন্নয়ন না হলেও দলের নেতাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে নিয়োগ-ব্যাণিজ্য, টেন্ডারবাজি, ক্ষমতার দাপট খাটিয়ে মাদক কারবার, সরকারি পুকুর লিজ দেয়ার নাম করে দলীয় কর্মীদের টাকা আত্মসাৎসহ নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে দলের অধিকাংশ নেতা-কর্মীই ক্ষুব্ধ বলে জানা গেছে। এতে করে দলের নিবেদিত প্রাণ অনেক নেতা-কর্মী দলীয় কর্মকাণ্ড থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। তবে সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন কমিটিতে পুরনোদের জায়গা করে দেয়ায় অনেক নেতা-কর্মী কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছেন। জেলা আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্ব মিটিয়ে সবাইকে নিয়ে এক হয়ে কাজ করতে না পারলে এই আসনে জয়লাভ করা বেশ কঠিন হবে বলে দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা মনে করেন।
অন্য দিকে জয়পুরহাট-১ আসনটি বিএনপির শক্তিশালী ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত হলেও ২০১৪ সালের নির্বাচনে না যাওয়ায় আসনটি তাদের হাতাছাড়া হয়ে যায়। ২০০৭ সালের আগে এখানে দলের নেতৃত্বে ছিলেন এ আসনের এমপি মরহুম আব্দুল আলীম। পরবর্তীতে ২০০৮ এর নির্বাচনে তিনি মনোনয়ন না পাওয়ায় এবং যুদ্ধাপরাধী মামলায় গ্রেফতার হওয়ায় তৎকালীন জেলা সভাপতি মরহুম মোজাহার আলী প্রধান এমপির নেতৃত্বে চলছিল বিএনপি। তবে ২০১৮ সালে ৫ জানুয়ারি মোজাহার আলী প্রধান মারা যাওয়ার পর দলটিতে অনেক বড় ধাক্কা লাগে। তার পর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হন জয়পুরহাট শহীদ জিয়া ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ সামছুল হক। তিনিও মারা যাবার পর ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক হিসেবে দলের দায়িত্ব দেয়া হয় গোলজার হোসেনকে। তিনি জেলার সব ইউনিয়ন, থানা ও ওয়ার্ড কমিটিগুলো নতুন করে গঠন করে বিএনপিকে গতিশীল করার চেষ্টা করছেন। বিগত সময়ের বিএনপির চেয়ে বর্তমানের বিএনপি অনেক শক্তিশালী হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তাই তিনি দলের মনোনয়ন চাইবেন। এ ছাড়া বিএনপির প্রার্থী হতে কাজ করে যাচ্ছেন ২০১৮ সালের নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পাওয়া জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পৌর মেয়র শিল্পপতি ফজলুর রহমান। প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে আছেন সাবেক এমপি মোজাহার আলী প্রধানের ছেলে জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদ রানা প্রধান। এ ছাড়া জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মমতাজ আলী মণ্ডলের ছেলে শিল্পপতি আনোয়ারুল হক আনু আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন। অপর দিকে সাবেক এমপি ও মন্ত্রী আব্দুল আলীমের ছেলে ফয়সাল আলীমও প্রার্থী হতে কাজ করে যাচ্ছেন।
হাতছাড়া হওয়া আসনটি উদ্ধারের জন্য চেষ্টা চালাচ্ছেন বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। ২০১৩-১৪ সালে সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় সহিংস ঘটনার কারণে বিএনপির অনেক নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। সেই সাথে রয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-বিবাদের ঘটনা। এসব না মিটিয়ে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী না দিলে জয়লাভ অনেকটা কঠিন হবে বলে মনে করছেন স্থানীয় বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা।
এ দিকে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে জেলা জামায়াত। জোটবদ্ধ নির্বাচন হলে জামায়াতের জেলা আমির ডা: ফজলুর রহমান সাঈদ জোটের পক্ষে মনোনয়ন চাইবেন বলে জানিয়েছেন। আর স্বতন্ত্রভাবে ভোট করলেও তিনিই হবেন জামায়াতের প্রার্থী। এ আসনে জামায়াতে ইসলামীর নির্দিষ্ট ভোট ব্যাংক রয়েছে।
এলাকার সচেতন ভোটাররা মনে করেন এ আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলের জন্য বড় সমস্যা হচ্ছে অভ্যন্তরীণ কোন্দল। জেলা আওয়ামী লীগের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকট। কোনো মিটিং-মিছিলে এক গ্রুপ থাকলে অপর গ্রুপ থাকে না। এক গ্রুপ বড় শোডাউন করলে অপর গ্রুপ আরো বড় শোডাউন করে নিজেদের জানান দেয়। অপর দিকে জেলা বিএনপির কমিটি ঘোষণা নিয়ে ক্ষুব্ধ দলের একাংশ। তারা বিএনপির যে কোনো দলীয় কর্মসূচি আলাদা আলাদা স্থানে পালন করে। জয়পুরহাটের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় দুই দলেই অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও দ্বন্দ্ব আছে। তবে এসব মেটানো না গেলে কোনো দলই আশানুরূপ ফলাফল করতে পারবে না বলে তৃণমূল পর্যায়ে নেতা-কর্মীদের বদ্ধমূল ধারণা।
জয়পুরহাট-১ আসনে নির্বাচনী ভাবনা
আগের চেয়ে শক্ত অবস্থানে আ’লীগ, বিএনপি চায় দুর্গ পুনরুদ্ধার
জয়পুরহাট সদর ও পাঁচবিবি এই দুই উপজেলা নিয়ে গঠিত জয়পুরহাট-১ সংসদীয় আসন। আগে এই আসনটি বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত থাকলেও গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগের...





