মৃত্যু ও নিখোঁজের সংখ্যা বাড়লেও মাদারীপুরে কিছুতেই কমছে না মানবপাচার। উচ্চ বেতনে চাকুরি আর পরিবার নিয়ে একটু ভালো থাকার আশায় প্রতিনিয়ত অবৈধভাবে সমুদ্রপথে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিতে দিয়ে সর্বশান্ত হচ্ছে অনেক পরিবার। প্রায়ই বন্দিশালায় আটকে পরিবার থেকে লাখ লাখ হাতিয়ে নিচ্ছে মাফিয়াচক্র।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দৃশ্যমান বিচার না হওয়ায় আরো বেপারোয়া হয়ে উঠছে অপরাধীরা।

পুলিশের দাবি, এ ব্যাপারে জিরো টলারেন্সে রয়েছে তারা।

সরেজিমনে কথা হয়, মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার হাসানকান্দি গ্রামের বাসিন্দা রাজ্জাক খানের সাথে। পেশায় কসমেটিক্স ব্যবসায়ী। তার একমাত্র ছেলে রাকিব খানকে ইতালি নেয়ার প্রলোভন দেখায় একই এলাকার কুদ্দুস মাতুব্বরের ছেলে লিটন ও রিপন মাতুব্বর। ১৫ লাখ টাকায় চুক্তি হয় সরাসরি কোনো ঝক্কিঝামেলা ছাড়াই রাকিবকে বিমানপথে পৌঁছে দিবে স্বপ্নের দেশ ইতালি। পুরো টাকা পরিশোধ করলে ২০২৪ সালের ৫ এপ্রিল তাকে ইতালির পরিবর্তে নিয়ে যাওয়া হয় মৌরিতানিয়ায়।

স্বজনদের অভিযোগ, সেখানে আটকে নির্যাতন করে ভয় দেখিয়ে পরিবার থেকে আদায় করা হয় মুক্তিপণের ২৫ লাখ টাকা। এরপর ওই বছরের ১০ এপ্রিল থেকে আর কোনো হদিসই নেই রাকিবের। বিচারের আশায় আদালতে মামলা করলে উল্টো দালালচক্র রাজ্জাকের বিরুদ্ধে মাদারীপুর ও ফরিদপুরে দিয়েছে দুটি মামলা। একমাত্র ছেলে সন্ধান তো দূরের কথা উল্টো দুটি মামলায় ব্যাপক হয়রানীর শিকার তিনি ও তার পরিবার।

জানা যায়, একই দালালের মাধ্যমে বন্দিশালায় আটক থেকে নিখোঁজ ইশিবপুরের পিয়াস মাতুব্বর, চরমুগরিয়া এলাকার মীর ফরিদ উদ্দিন ও আল আমিন মিয়া। এই ঘটনায় রফিক সরদার, শরিফ উদ্দিন বেপারীও আছে জড়িত বলে দাবি ভুক্তভোগীর পরিবারের।

লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ হাতিয়ে নেয়ার পর লাপাত্তা চক্রের সদস্যরা। মাফিয়ারার টাকা হাতিয়ে নেয়ার ভুক্তভোগী পরিবারের সাথে বন্ধ করে দিয়েছে সব ধরনে যোগাযোগ।

এমন পরিস্থিতিতে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদারীপুরের ৫টি থানা ও মানবপাচার দমন ট্রাইব্যুনাল আদালতে গড়ে প্রতিমাসে ৩০-৩৫ মামলা দায়ের হয়। দোষীদের দৃশ্যমান বিচার না হওয়ায় বাড়ছে এমন ঘটনা। অবশ্য অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে পুলিশ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এই মাফিয়াচক্র এক সময়ে যুবকদের লিবিয়ার ভিসা দিয়ে সেখান নিয়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ইতালি পাঠাতো। মাঝপথে নৌকাডুবিতে অনেকের মৃত্যু হতো। বিষয়টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে একাধিকবার খবর প্রকাশের পর লিবিয়ার ভিসা বন্ধ করা হয়। বিকল্প হিসেবে দালালরা এখন সৌদিআরবের ভিসা করে যুবকদের সেখানে নিয়ে যায়। পরে সৌদিআরব থেকে লিবিয়ার ভিসা প্রস্তুত করে নিয়ে যাওয়া হয় লিবিয়ায়। এরপর যুবকদের বন্দিশালায় আটকে শুরু হয় অত্যাচার আর নির্যাতন। নির্যাতনের ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠিয়ে মাফিয়াররা আদায় করে মুক্তিপণের লাখ লাখ টাকা।

ভুক্তভোগী রাজ্জাক খান বলেন, ‘আমার ছেলের সন্ধান নেই প্রায় দুই বছর। আমি মামলা করলে আসামিপক্ষের লোকজন উল্টো আমার বিরুদ্ধে দুটি মামলা করেছে। আমি নিরুপায় হয়ে গেছি। ৪০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে দালালচক্র। আমার ছেলেরও কোনো খোঁজ নাই, আর ধারদেনা করে দেয়া টাকা নিয়ে লাপাত্তা মাফিয়ারা। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।’

নিখোঁজ পিয়াসের মা খাদিজা বেগম বলেন, ‘রিপন মাতুব্বর ও লিটন মাতুব্বরসহ আমার ছেলেকে ইউরোপের একটি দেশে পাঠাবে বলে প্রথমে আশ্বাস দেয়। পরে লাখ লাখ হাতিয়ে নেয় তারা। ছেলেকে জিম্মি করে আদায় করে মুক্তিপণ। কিন্তু দুইবছর ধরে আমার ছেলের কোনো সন্ধানই পাচ্ছি না। দালালরাও এলাকাছাড়া। আমি এই ঘটনার কঠিন বিচার চাই। পাশাপাশি আমার ছেলেকে ফিরে পেতে সরকারের কাছে সহযোগিতা চাই।’

মাদারীপুর আদালতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ বলেন, ‘অবৈধভাবে সমুদ্রপথে ইতালি যাওয়ার সময় প্রায়ই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। এসব ঘটনায় প্রতিনিয়ত মানবপাচার আইনে মামলা হচ্ছে। মামলা হলে গ্রেফতারও হয় বেশ কয়েকজন। এরপর আসামিরা জামিনে বেড়িয়ে এসে হয়ে ওঠে আরো বেপারোয়া। মামলাগুলোর বিচার না হওয়ায় অপরাধ কমছে না।’

মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো: জাহাঙ্গীর আলম জানান, মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে পুলিশ। মামলা হলে তাদের ধরতে তথ্য প্রযুক্তির সহায়তা নেয়া হয়। পরে গ্রেফতারকৃতদের পাঠানো হয় আদালতে। এমন ঘটনায় কোনো অপরাধীকে ছাড় দিচ্ছে না পুলিশ।

প্রসঙ্গত, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অবৈধভাবে সমুদ্রপথে পাড়ি দিতে দিয়ে গড়ে প্রতিবছর মৃত্যু হয় অর্ধশত যুবকের। নিখোঁজের সংখ্যা ছাড়ায় শতাধিক।