রংপুরের গংগাড়ার হিন্দু পল্লীতে হামলা ভাঙচুরের ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পৃথক পৃথকভাবে সাতদিনের করে রিমান্ডের আবেদন করলে আদালত আজ (বৃহস্পতিবার) শুনানির দিন ধার্য করেন। অন্যদিকে ঘটনাস্থলের অধিবাসীরা এখন সবাই বাড়িতে ফিরেছেন। অন্যদিকে গ্রেফতারদের স্বজনরা অভিযোগ করেছেন তাদের সন্তানদের ধনে নিয়ে যাওয়ার পর ব্যাপক মারধোর করা হয়েছে। সেকারণে তারা আদালতে ওঠার সময় খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাটছিলেন।
বুধবার (৩০ জুলাই) বিকেলে রংপুর আমলী আদালত-গঙ্গাচড়ার বিচারক কৃষ্ণকমল রায় এই আদেশ দেন।
রংপুর আদালতের ইন্সপেক্টর আমিনুল ইসলাম জানান, বুধবার (৩০ জুলাই) দুপুর দেড়টায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলাম এবং কোরআন শরীফ নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য এবং ইমেজ পোস্ট করার জেরে আলদাদপুর ছয় আনি বালাপাড়া হিন্দু পল্লীতে ভাঙচুরের ঘটনায় গ্রেফতার পাঁচজনকে হাজত খানায় নেয়া হয়। এসময় মামলার তদৗল্প কর্মকর্তপা গঙ্গাচড়া থানার ওসি আল এমরান তাদের বিরুদ্ধে পৃথক পৃথকভাবে সাতদিনের জন্য রিমান্ডের আবেদন করেন। বিকেলে তাদের রংপুর আমলি আদালত গঙ্গাচড়ায় তোলা হলে বিচারক কৃষ্ণকমল রায় জামিন না মঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এছাড়াও আজ (বৃহস্পতিআর) রিমান্ডের ওপর শুনানির দিন ধার্য করেন।
এর আগে মঙ্গলবার (২৯ জুলাই) মধ্যরাতে রংপুর এবং নীলফামারীর জেলা পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে পাঁচ যুবককে বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেফতার করে যৌথবাহিনী।
গ্রেফতাররা হলেন- নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার সিংগের গাড়ি মাঝাপাড়া এলাকার লাভলু মিয়ার ছেলে ইয়াসিন আলী (২৫), মাগুরা ধনিপাড়া এলাকার নুর আলমের ছেলে স্বাধীন মিয়া (২৮), দক্ষিণ চারখানা মাঝাপাড়া এলাকার গোলাম মোস্তফার ছেলে আশরাফুল ইসলাম (২৮), সিঙ্গের গাড়ি পাঠানপাড়া এলাকার মরহুম বাবলু খানের ছেলে এম এম আতিকুল ইসলাম খান আতিক এবং দক্ষিণ সিঙ্গের গাড়ি চওড়াপাড়া এলাকার মোজাম্মেল হোসেনের ছেলে সাদ্দাম হোসেন সেলিম (২২)।
রংপুর জেলা পুলিশ সুপার আবু সাইম জানান, আলদাদপুর ছয় আনি বালাপাড়া হিন্দু পল্লীতে ভাঙচুর ও লুটপাট এর ঘটনায় ওই পল্লীর বাসিন্দা রবীন্দ্রনাথ রায় (৫০) বাদি হয়ে ১ হাজার দুইশ জন অজ্ঞাত উশৃংখল জনতার নামে মামলা করেন। মামলার প্রেক্ষিতে রাতে নীলফামারী জেলা পুলিশের সহযোগিতায় রংপুর পুলিশ কিশোরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকেযৌথ বাহিনী ওই পাঁচজনকে গ্রেফতার করেছে।
পুলিশ সুপার জানান, হামলার সময় ফুটেজ, স্থিরচিত্র দেখে দেখে তথ্যপ্রযুক্তির সহযোগিতায় তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। কোন নিরীহ সাধারণ মানুষ গ্রেফতার ও হয়রানির আওতায় আসবে না। যারা হামলা চালিয়েছে তারা দুর্বৃত্ত। তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান। বর্তমানে ঘটনাস্থলে পুলিশ ও সেনাবাহিনী মোতায়েন আছে। সবাই বাড়ি ফিরেছেন। আশা করছি আর কেউ সেখানে কোন ঘটনা ঘটানোর দুঃসাহস পাবে না।
এদিকে আদালতে তোলার সময় যুবকদের খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাটতে দেখা গেছে। তাদেন অভিভাবকরা অভিযোগ করেছেন সন্তানদের গ্রেফতার করার পর ব্যাপক মারধোর করা হয়েছে। এর প্রতিবাদ জানিয়ে জামিন চেয়েছেন তারা।
এদিকে এ প্রতিবেদকদের হাতে থাকা তদন্ত কর্মকর্তা কর্তৃক আদালতে পাঠানোর ফরওয়াডিংয়েও দেখে গেছে গ্রেফতারকৃতদের নামে চিকিৎসা পত্রের কপি সংযুক্ত করার কথা লেখা রয়েছে।
এ ব্যপারে পুলিশ সুপার জানান, অসুস্থ থাকায় ফরওয়ার্ডিয়ে তাদের চিকিৎসাপত্র সংযুক্ত করা হয়েছে। কোনো ধরণের মারধোর কিংবা নির্যাতন করা হয় নি।
প্রসঙ্গত: রংপুর মহানগরীর আইডিয়াল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী গংগাচড়ার আলদাদপুর ছয় আনি বালা পাড়া গ্রামের বাসিন্দা রঞ্জন কুমার রায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে মহানবী করীম সাঃ, ইসলাম এবং কোরআন শরীফ নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য ও ইমেজ পোস্ট করলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় শনিবার (২৬ জুলাই) রাতেই গ্রেফতার করা হয় রঞ্জন কে। এ সময় পাশের উপজেলা থেকে আসা একদল দুর্বৃত্ত রঞ্জনের চাচার বাড়িতে হামলা চালায়।
পরের দিন রোববার (২৭ জুলাই) বিকেলে ঘটনাস্থলের পাশের জেলা নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার মাগুরা, ধনীপাড়া, সিংহেরগাড়ি, বাংলাবাজার, হাজীহাট, পাড়েরহাট, চাদখানা এবং একতার বাজার থেকে একদল উশৃংখল জনতা মিছিল নিয়ে এসে ওই হিন্দু পল্লীটির বিভিন্ন বাড়ি ঘরে হামলা চালায় এবং ভাঙচুর করে। এ সময় সেখানে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা বাধা দিয়ে আটকাতে পারিনি। উশৃংখল জনতাকে থামাতে গিয়ে আহত হয় কয়েকজন পুলিশও। পরে সেনাবাহিনী গিয়ে ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনে।
এরপর থেকে হিন্দু পল্লীর লোকজন আতঙ্কিত ছিল। পরবর্তীতে ডিসিসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা স্থানীয়দের সহযোগিতায় হিন্দু পল্লীর প্রত্যেকটি মানুষের সাথে কথা বলেন। তাদের নিরাপত্তায় পাশে দাঁড়ান। গ্রেফতার যুবককে আদালতের মাধ্যমে সাইবার সুরক্ষা আইনে জামিন নামঞ্জুর করে কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে পাঠায় আদালত।
মঙ্গলবার দিনভর ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর গুলো পুরো নির্মাণ করে দেয় উপজেলা প্রশাসন। আতঙ্ক কেটে গেছে। নিজ নিজ বাড়িতে অবস্থান করছেন পল্লীর সবাই। নিরাপত্তা নিশ্চিতে আলতাপুর নতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আনসার এবং পুলিশ ক্যাম্প মোতায়েন করেছে কর্তৃপক্ষ। এছাড়াও সেখানে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
রংপুরের ডিসি মোহাম্মদ রবিউল ফয়সাল জানান, হিন্দু পল্লী থেকে অন্যত্র চলে যাওয়া দুটি পরিবারের সবাই এখন বাড়িতে একত্রে বসবাস করছেন। তাদের নিরাপত্তায় সকল ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। সেখানে আর কোন আতঙ্ক নাই। দুর্বৃত্তদের ধরতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিধান অব্যাহত রেখেছে।








