গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় প্রায় ৭০ ভাগ রাস্তা এখনো কাঁচা। বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টি হলেই এসব রাস্তা কাদাপানিতে একাকার হয়ে পড়ে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নসহ পৌরসভার লাখ লাখ মানুষ। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, রোগী, কৃষক ও রিকশা-ভ্যানচালকরা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ কাঁচা রাস্তার অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। টানা বৃষ্টিতে অনেক রাস্তা কাদায় চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও হাঁটুসমান কাদা জমে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি পায়ে হেঁটেও চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়ে। স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের অনেকেই জুতা হাতে নিয়ে কাদার মধ্য দিয়ে বিদ্যালয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে। আবার রাস্তার বেহাল অবস্থার কারণে কেউ কেউ বিদ্যালয়ে যেতেই পারছে না। রোগী নিয়ে বিপাকে পড়তে হয় অনেকের।

স্থানীয়দের অভিযোগ, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও সুন্দরগঞ্জ উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার অনেক রাস্তা এখনো পাকা হয়নি। বিভিন্ন নির্বাচনের সময় জনপ্রতিনিধিরা এসব রাস্তা পাকা করার প্রতিশ্রুতি দিলেও অনেক ক্ষেত্রেই তা বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে বছরের পর বছর ধরে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

তারাপুর ইউনিয়নের ঘগোয়া গ্রামের বাসিন্দা ও কলেজ শিক্ষক নুর মিয়া বলেন, ‘আমার বয়স এখন ৫৫ বছর। আমি যখন থেকে বুঝতে শিখেছি, তখন থেকেই শুনে আসছি আমাদের বাড়ির সামনে গংগার যাওয়ার রাস্তা পাকা হবে। কিন্তু আজও রাস্তাটি পাকা হয়নি। কবে এই রাস্তা পাকা হবে, তা আল্লাহই ভালো জানেন।’

শান্তিরাম ইউনিয়নের বাসিন্দা মো: সাইফুল ইসলাম লাবলু বলেন, ‘শান্তিরাম ইউনিয়নের প্রায় ৯৫ শতাংশ রাস্তা কাঁচা। আমার মনে হয়, উপজেলার মধ্যে এই ইউনিয়নটি সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। দীর্ঘদিন ধরে এখানকার মানুষ কাঁচা রাস্তার দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।’

রাজীবপুর ইউনিয়নের নিজপাড়া গ্রামের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মহসিন জানায়, ‘বৃষ্টি হলে আমি স্কুলে যেতে পারি না। আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে স্কুলে যাওয়া যায় না। এত কাদা হয় যে প্রায় হাঁটু পর্যন্ত কাদা থাকে। এতে প্যান্টও নষ্ট হয়ে যায়।’

তারাপুর ইউনিয়নের নিজাম খাঁ গ্রামের রিকশা-ভ্যান চালক সামাদ মিয়া বলেন, ‘আমি দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর যাবত কাঁচা রাস্তা দিয়ে রিকশা চালাই। বৃষ্টি হলে কাঁচা রাস্তায় রিকশা-ভ্যান চালানো যায় না। টানা বৃষ্টি হলে রিকশা-ভ্যান বন্ধ করে রাখতে হয়। তখন মানুষের কাছে ধারদেনা করে সংসার চালাতে হয়। বৃষ্টি বেশি দিন থাকলে অনেক সময় না খেয়েও থাকতে হয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের নিজেদের জন্য কিছু চাই না। সরকার যদি কাঁচা রাস্তাগুলো পাকা করে দেয়, তাহলে আমরা ভালোভাবে রিকশা চালাতে পারব। আমাদের ছেলে-মেয়েরাও সুন্দরভাবে স্কুল-কলেজে যেতে পারবে। এলাকার লোকজন রোগী নিয়ে সহজে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারবে।’

উপজেলা প্রকৌশলী দফতর সূত্রে জানা যায়, সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় বর্তমানে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০টি কাঁচা রাস্তা রয়েছে। পর্যায়ক্রমে এসব রাস্তার উন্নয়নকাজ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

বেলকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো: ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ বলেন, ‘আমাদের ইউনিয়নে প্রায় ২০ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা রয়েছে।’

সর্বানন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো: জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের ইউনিয়নে প্রায় ২৪ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা রয়েছে।’

স্থানীয়দের দাবি, জনদুর্ভোগ লাঘবে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাঁচা রাস্তাগুলো দ্রুত সংস্কার ও পর্যায়ক্রমে পাকা করার উদ্যোগ নেয়া হোক। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে যেসব রাস্তা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে, সেগুলো দ্রুত সংস্কার করা প্রয়োজন। এতে শিক্ষার্থী, রোগী, কৃষক, ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষের চলাচলে স্বস্তি ফিরবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতেও গতি আসবে।

গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য অধ্যাপক মাজেদুর রহমান জানান, ‘আমি উপজেলা ইঞ্জিনিয়ার অফিস থেকে সমস্ত কাঁচা রাস্তার তথ্য নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করেছি এবং মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়কে অনুরোধ করেছি।’

তিনি আমাকে আশ্বস্ত করেছেন আমার সংসদীয় আসনের সমস্ত কাঁচা রাস্তাগুলো পর্যায়ক্রমে বরাদ্দ দিয়ে পাকা করে দেবেন। আমি আশাবাদী খুব শীঘ্রই পাকাকরণের কাজ শুরু হবে ইনশাআল্লাহ।