জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘আমাদের আন্দোলন ছিল সুন্দর বাংলাদেশ বিনির্মানে একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। একটি দল পরিবর্তনের আন্দোলন ছিল না জুলাই বিপ্লব। আমাদের মধ্যে হতাশা রয়েছে। কারণ, আমরা বিচার এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে যে আন্দোলন করেছিলাম, সেটা এখনো পাইনি।’

মঙ্গলবার (১ জুলাই) বেলা ১১টার দিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের গুলিতে নিহত শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত শেষে ব্রিফিংয়ে একথা বলেন তিনি।

অন্যদিকে দলটির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেছেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে তাদেরকে বিচারের আওতায় আনতে হবে, সংবিধান বাতিল করে গণপরিষদ নির্বাচন দিতে হবে। এর কোনো বিকল্প নাই।’

এর আগে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, সদস্য সচিব আখতার হোসেন, মুখপাত্র নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী, দক্ষিণাঞ্চল মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ, উত্তরাঞ্চল মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, যুগ্ম-আহ্বায়ক সামান্থা শারমিন, যুগ্ম-সদস্য সচিব তাসনিম জারা, যুগ্ম-মূখ্য সংগঠক দক্ষিণাঞ্চল মাহমুদা মিতু, যুগ্ম-মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সাদিয়া ফারজানা দিনা ও আসাদুল্লাহ আল গালিব, কেন্দ্রীয় সদস্য রফিকুল ইসলাম কনকসহ কেন্দ্রীয় নেতাদেরকে নিয়ে শহীদ আবু সাঈদের কবরের পাশে আসেন। সেখানে ফাতেহাপাঠসহ কবর জিয়ারত করেন। পরে নেতারা আবু সাঈদের বাড়িতে গিয়ে তার বাবা-মা এবং পরিবারের লোকজনের সাথে কথা বলেন। এ সময় তারা আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের পরিবারের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন। কবর জিয়ারতের মাধ্যমেই শুরু হয় তাদের দেশ গড়তে জুলাই পদযাত্রা।

কবর জিয়ারত শেষে শহীদ আবু সাঈদের কবরের পাশেই সাংবাদিবদের সাথে কথা বলেন এনসিপি নেতারা। এ সময় আখতার হোসেন বলেন, ‘আবু সাঈদ আমাদের দ্রোহের জায়গা, তার কবরের পাশ থেকে আমরা নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখি। আমরা আবু সাইদের কবর ছুঁয়ে শপথ করছি যতক্ষণ পর্যন্ত নতুন বন্দোবস্তের ভিত্তিতে, মৌলিক সংস্কারের ভিত্তিতে নতুন বাংলাদেশ গঠিত না হবে বৈষম্যবিরোধী বাংলাদেশ গঠিত না হবে। বাংলাদেশে সামাজিক ন্যায় বিচার এবং মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপির এই সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।’

আখতার আরো বলেন, ‘বিচার সংস্কার এবং নতুন সংবিধানের দাবিতে দেশ গড়তে জুলাই পদযাত্রার সূচনা আমরা করলাম জুলাই বিপ্লবের প্রথম শহীদ বীর যোদ্ধা শহীদ এর সাইদের কবর জিয়ারতের মাধ্যমে। হাজার হাজার মানুষের আত্মত্যাগ, হাজার হাজার মানুষের রক্তদানের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদের আমরা কবর রচনা করেছি। এজন্য অবশ্যই পুরনো কাঠামোকে ভেঙে নতুন বন্দোবস্ত বিনির্মাণ করতে হবে। মৌলিক সংস্কার করতে হবে। জুলাই বিপ্লবে যারা হামলা চালিয়েছে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে তাদের বিচার করতে হবে। একই সাথে বাংলাদেশের পুরনো যে মুজিববাদী সংবিধান সেই সংবিধানকে ফেলে দিয়ে গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সংবিধান তৈরি করতে হবে। সবমিলিয়ে একটা নতুন বাংলাদেশ পুনর্গঠিত করতে হবে।’

এসময় নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমাদের দাবি ছিল বিচার, সংস্কার ও নতুন সংবিধান। সেই তিনটি দাবি শহীদ আবু সাঈদের কবর থেকে পুনর্ব্যক্ত করছি। বাংলাদেশ পুনর্গঠন করতে হবে বিচার সংস্কার এবং গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে আমাদের নতুন সংবিধানের দিকে যেতে হবে।’

নাহিদ বলেন, ‘জুলাই ঘোষণাপত্র ও জুলাই সনদ নিয়ে টালবাহনা শুরু হয়েছে। আমরা স্পষ্টভাবে হুশিয়ারী দিতে চাই। যদি সরকার বা অন্য কোনো পক্ষ মনে করে থাকেন যে হাজারো লাখ মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিল। তারা ঘরে ফিরে গিয়েছে। তাহলে আপনারা ভুল ভাবছেন। আবু সাঈদেও কবর থেকে ঘোষণা করছি। আমরা বাংলার প্রতিটি পথে প্রান্তরে যাবো। আমরা বাংলার ছাত্র, জনতা, শ্রমিক, কামারকুমার, জেলে তাঁতি সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে আবারো রাজপথে নেমে আসার আহ্বান জানাবো। ৩ আগস্ট আমরা বাংলাদেশের সব মানুষকে সাথে নিয়ে ঢাকায় ঢুকবো এবং জুলাই ঘোষণাপত্র ও জুলাই সনদ আদায় করেই ছাড়বো, ইনশাআল্লাহ।’

নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘ঠিক এক বছর আগে আজকের দিনে কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলণ গণ বিস্ফোরণে, গণ-অভ্যুত্থানে রুপ নেয় এবং স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদি সরকারের পতন ঘটায়। এই পতন ঘটাতে ক্রীড়ানকের ভূমিকা পালন করেছিল আবু সাঈদের মৃত্যু। তার মৃত্যুর ঘটনা পুরো বাংলাদেশ ও বিশ্ববাসীর শোককে দ্রোহে রুপ দিয়েছিল। তার মৃত্যুর ঘটনায় আন্দোলন ভিন্নমাত্রায় মোড় নেয়।’

নাহিদ বলেন, ‘আমরা ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটিয়েছি। ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ চেয়েছি। কিন্তু দেশ গড়ার জন্য যে উদ্যোগ দরকার। যে রাষ্ট্রগঠনের জন্য আমাদের কাজ করা দরকার। সেই রাষ্ট্রগঠনের জন্যই আমাদের এই জুলাই পদযাত্রা। আমরা সারাদেশের মানুষের সাথে এই একমাসে কথা বলবো। তাদের কথা শুনবো। আবু সাঈদের মারা যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আমরা তাদের কাছে তুলে ধরবো।’

পরে গাইবান্ধার উদ্দেশ্যে রওনা দেয় জুলাই পদযাত্রা। চতরা-পীরগঞ্জ-মাদারগঞ্জ হয়ে পদযাত্রাটি যায় গাইবান্ধার সাদুল্যাপুরে। সেখানে ট্রাক সমাবেশ করে পদযাত্রা যায় গাইবান্ধার সদরের পৌর পার্কমার্কেটে। সেখানে পথসভাশেষে পলাশবাড়িতে গিয়ে পথসভায় মিলিত হয় জুলাই পদযাত্রা। সেখান থেকে বিকেলে রংপুর মহানগরীতে এসে দুপুরের খাবার খায়। পরে সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে জুলাই পদযাত্রা মিলিত হয় রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ আবু সাঈদ চত্বরে। সেখানেই পুলিশের গুলিতে মারা গিয়েছিলেন আবু সাঈদ। সেখান থেকে মিছিল নিয়ে পদযাত্রাটি লালবাগ, খামার মোড়, বিকন মোড়, শাপলা চত্বর, গ্রান্ড হোটেল মোড়, দাবানল মোড়, জীবনবীমা মোড়, প্রেস ক্লাব, পায়রা চত্বর, জেলা পরিষদ সুপার মার্কেট মোড়, কৈলাশরঞ্জণ স্কুল মোড়, সিটি ভবন, পুলিশ লাইন্স মোড়, কাচারী বাজার হয়ে রাত সাড়ে ৮টার দিকে ডিসির মোড়ে গিয়ে শেষ হয় পদযাত্রা।

পরে সেখানে আবারো ব্রিফিং করেন এনসিপি নেতারা। পথে পথে তাদের শুভেচ্ছা জানান এনসিপি নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। প্রতিটি সমাবেশে নাহিদ ইসলাম, আখতার হোসেন বক্তব্য রাখেন। বক্তব্য ছাড়াও নাহিদ ইসলাম শ্লোগান দেন, ‘ ক্ষমতা না জনতা, জনতা জনতা,’ ক্ষমতা না রাজপথ, রাজপথ রাজপথ, আবু সাঈদের বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই।’ জুলাই সনদ, জুলাই সনদ ঘোষণা করো করতে হবে। জুলাই ঘোষণাপত্র জুলাই ঘোষণা পত্র, দিতে হবে দিতে হবে। বিচার ও সংস্কার, করতে হবে করতে হবে। মুজিববাদী সংবিধান বাতিল, কর করতে হবেসহ নানা শ্লোগান।