নতুন অ্যাকাডেমিক ভবন, বিভাগ, আবাসিক হল, বাস, ক্যাম্পাসের যাতায়াত ব্যাবস্থারউন্নয়ন ও নিরাপত্তা জোরদারসহ ৩৭ দফা দাবিতে কারমাইকেল কলেজ শাটডাউন অব্যাগত থাকবে। তবে কর্মসূচি চালার সময় এইচএসসি পরীক্ষা এবং মাস্টার্স ও অনার্স প্রথম বর্ষের ভর্তি কার্যক্রম আওতামুক্ত রেখেছে আন্দোলনকারীরা। কিন্তু ক্লাস ও পরীক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। এদিকে ডিসির পক্ষ থেকে শিক্ষা উপদেষ্টার কাছে প্রতিনিধি দল যাওয়ার ব্যাপারে তথ্য জানানো হলেও কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি শিক্ষার্থীরা। তারা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও শিক্ষা উপদেষ্টাকে স্বশরীরে ক্যাম্পাসে এসে দাবি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেয়ার দাবিতে এখনো অনড় রয়েছেন।

মঙ্গলবার (২৪ জুন) কর্মসূচি থেকে আগেই ঘোষণা ছিল দাবি আদায়ে বুধবার (২৫ জুন) আবারো সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করবে কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা। এমন ঘোষণায় বুধবার সকাল থেকেই লালবাগ রেলগেট থেকে কলেজের প্রধান ফটক পর্যন্ত সেনাবাহিনীর এই ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায়। সাথে মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত টিম।

সকাল ৯টার দিকে প্রধান ফটক তালা দিয়ে সামনে অবস্থান নেয় আন্দোলনকারীরা। দাবি আদায়ে দিতে থাকেন নানা শ্লোগান, চলে সমাবেশ। মিছিল নিয়ে সড়কে আসার প্রস্তুতি নেয়ার আগ মুহুর্তেই বেলা ১১টার দিকে সেখানে উপস্থিত হন কলেজ অধ্যক্ষ প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান। এরপরে ডিসি মোহাম্মদ রবিউল ফয়সাল, মহানগর পুলিশ কমিশনার মো: মজিদ আলী,৭২ ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনালের হুমায়ুন কাইয়ুমসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এসময় তাদের ক্যাম্পাসে বাধা দেন শিক্ষার্থীরা। এক পর্যায়ে তারা ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে শিক্ষার্থীদের সমাবেশে যোগ দেন। এসময় শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে ১২ দফার সমাধানে ডিসি উপদেষ্টার সাথে অধ্যক্ষসহ ছয় শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদলকে ঢাকায় আলোচনার জন্য ডেকেছেন বলে জানান। অন্যদিকে ২১ দফা সমাধানের টাইমলাইন ঘোষণা করেন অধ্যক্ষ।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমাদের অভ্যন্তরীন উৎস দিয়ে যে কাজগুলো করা সম্ভব সেগুলোর আমরা একটা টাইম লাইন দিয়ে শিক্ষার্থীদের জানিয়ে দিয়েছি। এরমধ্যে কিছু কাজ এক সপ্তাহ লাগবে। কিছু কাজ দুই সপ্তাহ বা তারও বেশি লাগবে। সেগুলো আমরা বাস্তবায়নও শুরু করেছি। সেটা লিখিতভাবে আমার স্বাক্ষরিত কাগজ শিক্ষার্থীদের দিয়েছি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সেগুলো বাস্তবায়ন করতে পাররো ইনশাআল্লাহ।

শিক্ষার্থীদের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রবিউল ফয়সাল বলেন, ‘আমরা বিগত তিনদিন ধরে কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের দাবি দাওয়া নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ রাখি। আজকে (বুধবার) সকালে শিক্ষা সচিব স্যার জানিয়েছেন শিক্ষা উপদেষ্টা মহোদয় অধ্যক্ষ এবং ৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দলকে ঢাকায় ডেকেছেন। সেখানে শিক্ষা উপদেস্টা, ভিসি, ইউজিসি, সচিব, মাউশি মহাপরিচালক, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলীসহ শিক্ষা সংক্রান্ত সকল দফতরের প্রধানরা উপস্থিত থাকবেন। যেহেতু বিষয়টি সমন্বিতভাবে সমাধান করতে হবে। সেকারণে ঢাকায় ডেকেছেন। আর রংপুরে আসলে যেহেতু শিক্ষা উপদেষ্টা স্যার একাই আসবেন।

এসময় শিক্ষোর্থীদের নিরাপত্তার বিষয়ে ‍পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করাসহ বিভিন্ন বিষয়তুলে ধরেন মহানগর ‍পুলিশ কমিশনার। আর ৭২ ব্রিগেড কমান্ডার বলেন, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনেও দাবি আদায় সম্ভব সেটি প্রমাণ করেছে কারমাইকেলের শিক্ষার্থীরা।

রংপুর মহানগর ‍পুলিশ কমিশনার মো: মজিদ আলী জানান, ক্যাম্পাসটি অনেক বড়। কিন্তু দীর্ঘদিন থেকে এখানে বৈষম্য চলেই আসছে। একটা চরম দৈন্যদশা। ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তায় এখানে পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়ে আমি কলেজ কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। যেহেতু একটি অস্ত্রাগার থাকবে। সেহেতু একটি শক্ত শেড দরকার। কলেজ কর্তৃপক্ষ এখনো আমাদের সেটির ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তারপরেও অস্থায়ীভাবে আমরা একটা ক্যাম্প করেছি। ক্যাম্পাসে টহল বাড়ানো হয়েছে। সার্বিক নিরাপত্তায় পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক থেকে এখানে কাজ করছে।

শিক্ষার্থীদের ৬৬ পদাতিক ডিভিশনের ৭২ ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হুমায়ুন কাইয়ুম বলেন, ‘স্যালুট জানাতে চাই সকল শিক্ষার্থীদের। কারণ আপনারা গত চারদিন ধরে আন্দোলন করছেন। বাট আপনারা প্রমাণ করেছেন শান্তিপুর্ণভাবে সহনশীলতার সাথে আন্দোলন করেও দাবি আদায়ের পথ খোলা যায়। শিক্ষা মানুষকে সহনশীল হতে শেখায়। আমি বোধ করি কারমাইকেল কলেজ সেই কাজটি করতে সমর্থ হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা নিরাপত্তার বিষয়টা দেখি। রাজনৈতিক চর্চা আমরা করি না। বা বুঝি না। অধ্যক্ষ, পুলিশ কমিশনার এবং জেলা প্রশাসক মহোদয় যেভাবে কথা বলেছেন তাতে আমি সম্ভাবনার দুয়ার দেখতে পাচ্ছি। আমি মনে করি তাদের কথার বলিষ্ঠতায় এটা আশা করে যায় রাইটস অব নাউ। নট রাইটস অব টুডে দ্যাটস অব নাউ এটা ফলাফলে আমরা দেখতে পারবো।’

শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলার পর অধ্যক্ষ ডিসি, পুলিশ কমিশনার ও ব্রিগেড কমান্ডারকে নিয়ে ক্যাম্পাসের দৈন্যদশা পরিদর্শনে যান। তারা ক্যান্টিনে গিয়ে খাবারও খান। হল, রাস্তা, একাডেমিক ভবনসহ বিভিন্ন স্থাপনা পরিদর্শন করেন।

এরই মধ্যে প্রধান ফটকের সামনে কমপ্লিট শাট ডাউন নিয়ে কথা বলেন, আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়কারী রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষাথী সাজ্জাদ হোসেন। তিনি উপস্থিত আন্দোলনকারীদের বলেন, ‘আমরা এইচএসসি পরীক্ষাকে বিবেচনা করে, যেহেতু এখানে ১৬০০ শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিবে। সেহেতু বিভিন্ন প্রস্তুতির বিষয় রয়েছে। স্যারেরা আমাদের অনুরোধ করেছেন। প্রশাসন থেকে আমাদের অনুরোধ করা হয়েছে। আমরা এইচএসসি পরীক্ষাটা ক্যাম্পাসে হতে দিবো। এবং আমাদের যে ভর্তি কার্যক্রম চলছে মাস্টার্স ও অনার্স প্রথম বর্ষের এই ভর্তি কার্যক্রমটাও কমপ্লিট শাট ডাউনের আওতামুক্ত থাকবে।’

সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের যে শাট ডাউন কর্মসুচি ক্লাস বর্জন, পরীক্ষা বর্জনসহ প্রশাসনের অন্য কার্যক্রমগুলো বন্ধ থাকবে। যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের উপদেস্টা ক্যাম্পাসে সরাসরি না আসছেন। আমাদের দাবিগুলোর বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি না দিচ্ছেন। ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের শাটডাউন কর্মসূচি চলবে। যদি যথাসময়ে এগুলো বাস্তবায়িত না হয় আমরা আরো কঠোর থেকে কঠোরতর কর্মসূচি এমনকি রংপুর বিচ্ছিন্ন করার মতো কর্মসূচি দিতে বাধ্য থাকবো। তখন কিন্তু আমরা প্রশাসনের কারো কথা শুনবো না। তখন কেউ আর আমাদের থাকাতে পারবে না।

শিক্ষা উপদেষ্টার সাথে ঢাকায় বৈঠকের প্রস্তাবনার বিষয়ে সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘আমরা বিষয়টি নিয়ে বৈঠক করবো। সম্মিলিত প্রস্তাবনার মাধ্যমে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।‘

গত বছর ৫ আগস্টের পর থেকে শতবর্ষি ও ঐতিহ্যবাহি কারমাইকেল কলেজের সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন আন্দোলন চললেও দাবি পূরণ না হওয়ায় গেলো কমপ্লিট শাট ডাউনের কর্মসূচিতে নামে শিক্ষার্থীরা। এরই অংশ হিসেবে গত ২২ জুন দাবি আদায়ে শিক্ষার্থীরা ৩ ঘণ্টা লালবাগে সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করে। পরের তিনি থেকে ক্যাম্পাসের সকল ভবনে তালা লাগিয়ে কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচিতে যায় শিক্ষার্থীরা।