সাঘাটা (গাইবান্ধা) সংবাদদাতা
কাগজে-কলমে শিক্ষার্থী ২৬৬ জন। শিক্ষক-কর্মচারী ১২ জন। অথচ মাদরাসায় গিয়ে শ্রেণিকক্ষে একজন শিক্ষার্থীকেও দেখা যায়নি।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) মাদরাসাটিতে গিয়ে এই চিত্র পাওয়া গেছে। এর আগে গত ২ এপ্রিল, ২ সেপ্টেম্বর গিয়েও একই চিত্র দেকা যায়। এমপিওভুক্ত এ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও পাঠদান কার্যক্রম নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার শ্যামপুর নাসির উদ্দিন প্রধান দাখিল মাদরাসায় এমন চিত্র দেখা গেছে। ২০১৯ সালে মাদরাসাটি এমপিওভুক্ত হয়। বর্তমানে শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন মোট ১২ জন। এর মধ্যে শিক্ষক আটজন ও অন্যান্য কর্মচারী চারজন।
মাদরাসায় গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ শ্রেণিকক্ষ ফাঁকা। বেঞ্চগুলো এলোমেলো পড়ে আছে। ল্যাব কক্ষে তালা ঝুলছে। কোথাও বেঞ্চে শিক্ষককে বিশ্রাম নিতে দেখা যায়। ব্ল্যাকবোর্ডেও নিয়মিত পাঠদানের চিহ্ন নেই। বিভিন্ন স্থানে দেখা যায় মাকড়সার জাল।
তবে মাদরাসাটির হাজিরা খাতা পর্যালোচনা করে পাওয়া গেছে ভিন্ন চিত্র। যে দিনগুলোতে শ্রেণিকক্ষে একজন শিক্ষার্থীকেও পাওয়া যায়নি, অন্যান্য মাসের হাজিরা খাতায় অনেক শিক্ষার্থীকে নিয়মিত উপস্থিত বা ‘প্রেজেন্ট’ দেখানো হয়েছে। খাতায় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি থাকলেও স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে তাদের অনেকেরই নিয়মিত মাদরাসায় আসার তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে। ফলে হাজিরা খাতায় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি দেখানো এবং বাস্তবে শ্রেণিকক্ষে তাদের উপস্থিতির মধ্যে বড় ধরনের অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে।
মাদরাসা সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটিতে প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ২৬০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। প্রথম শ্রেণিতে ১১, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১৯, তৃতীয় শ্রেণিতে ১২, চতুর্থ শ্রেণিতে ২৩, পঞ্চম শ্রেণিতে ৩৩, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৩৬, সপ্তম শ্রেণিতে ৩১, অষ্টম শ্রেণিতে ৩০, নবম শ্রেণিতে ২৫ এবং দশম শ্রেণিতে ৪০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটি থেকে ২৬ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে মাত্র আটজন পাস করেছে বলে প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে।
মাদরাসাটির সাবেক শিক্ষার্থীর অভিভাবক ফজলুল হক বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে মাদরাসাটিতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম। নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত না হলে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।’
স্থানীয় বাসিন্দা হারুন বলেন, ‘মাদরাসায় এতসংখ্যক শিক্ষার্থী থাকার কথা থাকলেও শ্রেণিকক্ষগুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিস্থিতি চললে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।’
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা মান্নান মিয়া বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাসে আসছে কি না এবং শিক্ষকরা যথাযথভাবে পাঠদান করছেন কি না। এসব বিষয় কর্তৃপক্ষের তদারকি করা প্রয়োজন। মাদরাসাটির প্রকৃত অবস্থা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া উচিত।’
স্থানীয়দের অনেকের অভিযোগ, শিক্ষকরা প্রতিষ্ঠানে এলেও নিয়মিত পাঠদান হচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয়ে বই নিয়ে চলে যায়, কিন্তু ক্লাসে আসে না। বছরের পর বছর এভাবে প্রতিষ্ঠানটি চললেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। কাগজে-কলমে ২৬০ শিক্ষার্থী থাকলেও শ্রেণিকক্ষে যদি একজন শিক্ষার্থীও উপস্থিত না থাকে, অথচ হাজিরা খাতায় অনেক শিক্ষার্থীকে উপস্থিত দেখানো হয়। তাহলে ওই উপস্থিতির সত্যতা কতটা?
মাদরাসার সাবেক ভারপ্রাপ্ত সুপার ফুলআরা বেগম বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকদের মধ্যে দু’টি গ্রুপ রয়েছে। গ্রুপিংয়ের কারণে প্রতিষ্ঠানে নানা সমস্যা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি। এখানে শিক্ষকও কম। শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয়ে বই নিয়ে চলে যায়, নিয়মিত ক্লাসে আসে না।’
বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সুপার সহকারী মাওলানা মো: হামিদুর রহমান বলেন, ‘এখানে ইংরেজি ও গণিতের শিক্ষক নেই। সুপারও নেই। তিনজন সহকারি মাওলানার মধ্যে বর্তমানে তিনি একাই আছেন। অধিকাংশ শিক্ষক না থাকায় প্রতিষ্ঠানের এমন হযবরল অবস্থা হয়েছে। প্রতিবছর শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন হয়। কিন্তু ক্লাস করার মতো শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নেই।’
এ বিষয়ে সাঘাটা উপজেলা অ্যাকাডেমিক সুপারভাইজার আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘কোনো শিক্ষার্থী উপস্থিত না থাকলেও যদি হাজিরা খাতায় তাকে প্রেজেন্ট করে রাখা হয়, তাহলে এটি চরম অপরাধ। বর্তমানে ইউএনও স্যার নেই। তিনি দায়িত্বে আসার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করব। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
জেলা শিক্ষা অফিসার আতাউর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘আমি বিষয়টি অবগত আছি। সরেজমিনে তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’








