হুমায়ুন কবির জুশান, উখিয়া (কক্সবাজার)
বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রম চরম সংকটে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক দাতাদের অনুদান হ্রাসের ফলে হাজার হাজার শিশু শিক্ষার সুযোগ হারাচ্ছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।
বৃহস্পতিবার (২৬ জুন) সংস্থাটির পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের শুরু থেকে জুন মাস পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের অনুদান ৩০ কোটি ডলার থেকে নেমে মাত্র ১ কোটি ২০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অপর্যাপ্ত অর্থের কারণে এই মাসের ৩ তারিখ থেকে ইউনিসেফ পরিচালিত শত শত ‘লার্নিং সেন্টার’ বন্ধ করে দেয়া হয়। এতে করে প্রায় তিন লাখ শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
বর্তমানে রোহিঙ্গা শিবিরে অবস্থানরত চার লাখ ৩৭ হাজার শিশুর মধ্যে যারা এখনো কোনো রকম শিক্ষা পাচ্ছে, তারা মূলত রোহিঙ্গাদের নিজস্ব উদ্যোগে পরিচালিত কমিউনিটি-নেতৃত্বাধীন স্কুলে যাচ্ছে। তবে এসব স্কুলের নেই কোনো সরকারি স্বীকৃতি, নেই দাতাদের অর্থায়ন, আবার অনেক ক্ষেত্রে রয়েছে মাসিক ফি। ফলে অভাবী পরিবারগুলো সন্তানদের পড়াশোনার বদলে কাজে পাঠাতে বাধ্য হচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ইউনিসেফ ৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে ঊর্ধ্বতন শ্রেণির পাঠ কার্যক্রম ২৯ জুন থেকে সীমিত পরিসরে চালুর পরিকল্পনা করলেও—পুরো শিক্ষাব্যবস্থা সচল রাখতে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ না পেলে তা সম্ভব নয়। শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলাফল ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানায়, শিক্ষার আলো থেকে দূরে থাকা শিশুদের অপরাধচক্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর টার্গেটে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। এ বছরের প্রথম তিন মাসেই অন্তত ৫১টি শিশু অপহরণের তথ্য পাওয়া গেছে।
সংস্থাটির শিশু অধিকারবিষয়ক পরিচালক বিল ভ্যান এসভেলড বলেন, ‘রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য শিক্ষা একটি মৌলিক অধিকার। যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দাতারা যেন এই শিশুদের ভুলে না যায়, সেদিকে নজর দিতে হবে। পুরো একটি প্রজন্ম যেন ঝরে না পড়ে—এটি এখন বৈশ্বিক দায়িত্ব। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের দিকেও সুস্পষ্ট বার্তা দেয়া হয়েছে। বলা হয়, দেশের ভেতর থাকা শরণার্থীদের শিক্ষার অধিকার রক্ষায় সরকারকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। বিশেষ করে, শিবিরের বাইরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রোহিঙ্গা শিশুদের পড়াশোনার সুযোগ দেয়ার মতো নীতি গঠন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের কাঁধে রোহিঙ্গা সংকট একটি দীর্ঘমেয়াদী মানবিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। এই সংকট শুধু খাদ্য ও বাসস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—বরং শিক্ষা, নিরাপত্তা ও মানবাধিকার রক্ষার বিষয়েও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও জোরালো ও টেকসই ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে।








