মে বল। সারা বছর ভূ-গর্ভে ঘুমিয়ে থাকার পর গ্রীষ্মের শুরুতে কালবৈশাখীর মেঘের ডাকে ঘুম ভাঙে। এরপর শরৎ-হেমন্ত-শীতে ইস্পাতকঠিন ভূ-তল ফুঁড়ে মাথা তোলে মে বল। এর কয়েকদিনের মধ্যেই ফুল ফুটিয়ে তপ্ত গ্রীষ্মকে রাঙিয়ে দেয়।
‘মে বল’ নামটি শুনতে একটু অন্যরকম। চট করে অনেকে হয়তো ধরতেই পারবেন না যে নামটি আসলে একটি ফুলের। ফুলটির স্বভাবের কারণেই ব্যতিক্রম এই নামকরণ। কেবল মে মাসেই দেখা মেলে বিশেষ এই ফুলের। বলের আকৃতির এই ফুলকে দেশের বিভিন্ন স্থানে ‘বল ফুল’ বলেও ডেকে থাকেন অনেকে।
মে মাসে এই ফুল ফুটে বলে সারা বিশ্বে ‘মে ফুল’ নামেও জনপ্রিয় এটি। দেখতে গোলাকার হওয়ায় ফুলটিকে বল লিলিও বলা হয়। আবার শুধু লিলি, পাউডার পাফ লিলি, আফ্রিকান বাড লিলি নামেও পরিচিত এই ফুল। তবে উদ্ভিদ বিজ্ঞানীদের দেওয়া নাম হলো ‘মে বল’। বছরের পর বছর ধরে একই নিয়মে মে মাসেই হাসিমুখে মাথা তোলে এই ফুল।
বিদেশী ফুল হলেও অনেক আগে থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মে বলের দেখা মেলে। তেমনই ঠাকুরগাঁওয়ের নারগুন উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুল জলিলের বাড়িতে দেখা দিয়েছে মে বল।
আব্দুল জলিল জানান, গত ১৬ বছর ধরে গ্রীষ্মে প্রথম বৃষ্টির পরই মাটি ভেদ করে বের হয় মে বলের কাণ্ড। এর কিছুদিন পর দেখা যায় ফুল। প্রতিটি কন্দ থেকে গাছ বেরিয়ে গোলাপি রঙের ফুলে ছেয়ে যায় বাগান।
‘প্রথম যখন আমাদের বাড়িতে মে বলের কন্দ লাগানো হয়, তখন ঠিক বুঝতে পারিনি, কী ধরনের ফুল এটি। এরপর মে মাস আসার আগেই টবের মাটির নিচে পেঁয়াজের গুঁড়ির মতো একটি অংশ দেখতে পেয়েছিলাম। তখন মনে হচ্ছিল এ থেকে আবার কোন গাছ বের হবে! কিন্তু আশ্চর্য! মাসের শুরুতেই কন্দগুলো থেকে ডাটা বের হয়। এরপর তার মাথায় দেখা দেয় কলি।’
‘এরপর তো আরো অবাক হওয়ার পালা। কাঁঠালের ফুল যেমন শুরুতে দু’টি খোঁসার আবরণে ঢাকা থাকে, তেমনই আবরণযুক্ত খোঁসা এড়িয়ে ধীরে ধীরে আঁকশির মতো বেরিয়ে আসতে থাকে। এরপর তা লাল-গোলাপি হাজারো মাকড়সার দলের মতো গোল আকৃতিকে বিকশিত হতে থাকে। একটা সময় মনে হয়, লাল-গোলাপি অনিন্দ্যসুন্দর একেকটি বল ফুটে আছে একেকটি ডাটার ওপর। ফুলগুলো দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়।’
একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে তিনি কথাগুলো বলছিলেন আব্দুল জলিল।
জলিল বলেন, ‘এর ঘ্রাণ নেই বললেই চলে। কিন্তু তার যে রূপের মাধুরী, তা এসবকিছুকে ছাপিয়ে যায়।’
এই শিক্ষকের মতে, তার বাগানের অন্যান্য ফুলগুলোও যেন মে মাসের এই বিশেষ অতিথিকে দেখার জন্যে অপেক্ষার প্রহর গোনে।
এই ফুলের পাপড়ি অন্যান্য ফুলের মতো হয় না। এমনকি পাপড়ি হয় না বললেও চলে। গড়নের দিক থেকে কদম ফুলের সাথে কিছুটা মিল রয়েছে। তবে কদমের চেয়ে আকারে বেশ বড়।
মে ফুলের রঙ হালকা লাল থেকে গোলাপি। দূর থেকে দেখে মনে হতে পারে, গোলাকার ফুলটি কাঁটায় ঘেরা। অনেকগুলো সুঁচ মুখ বের করে আছে; হাত বাড়ালেই বিপদ! তবে বাস্তবে তা নয়। ফুলের গায়ে আঙ্গুল দিয়ে ছুঁয়ে দিলে নরম কোমল একটি অনুভূতি হয়।
ফুলটিতে হলুদ রঙেরও অস্তিত্ব আছে কিছুটা। এর পুষ্পমঞ্জরীর প্রতিটি ফুলের মাঝের ডগায় হলুদ রঙের সামান্য পরিমাণ রেণু থাকে। তবে তা বলতে গেলে চোখেই পড়ে না, হাত দিলেই কেবল আঙুলে হালকা হলুদ রঙ লেগে যায়। সাদা জামা পরে ফুলের কাছে গেলে ফিরে আসার সময় হয়তো দেখা যাবে, জামায় হলুদের ছিটা লেগে আছে।
একটু ঘাঁটাঘাটি করে জানা যায়, মে ফুলের অস্তিত্ব প্রথম আবিষ্কৃত হয় আফ্রিকা মহাদেশে। বর্তমানে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে গেছে এই ফুলের শোভা।
মে বলের গাছ ১০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। ফুলের ব্যাস ছয় থেকে আট ইঞ্চি পর্যন্ত হয়ে থাকে। কয়েক সপ্তাহ থাকার পর ধরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে এই ফুল।
পরিণত ফুল অক্ষত অবস্থায় ঝরে পড়ে না। ধরে ধীরে ফুলের বিভিন্ন অংশ খসে পড়তে থাকে। এভাবে একসময় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। অবশ্য ততদিনে একই কন্দ থেকে নতুন কাণ্ড বেরিয়ে নতুন ফুল ফুটতে শুরু করে। এভাবে মে মাসজুড়েই দেখা যায় এই ফুল।
ফুলগুলো ঝরে পড়ার সময়টিও দেখার মতো। কাণ্ডের গোড়ায় অসংখ্য শন পাপড়ির লম্বা কণার মতো ফুলগুলো ছড়িয়ে থাকে। তবে ফুল ফোটা শেষ হলে আস্তে আস্তে কাণ্ডগুলোও নিঃশেষ হয়ে যেতে থাকে। সৌন্দর্য পিপাসুদের আরো একটি মে মাসের অপেক্ষায় রেখে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে হারিয়ে যায় মাটির নিচে।
সূত্র : ইউএনবি





