পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে কক্সবাজারের উখিয়ার ২৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থানরত প্রায় আট লাখ রোহিঙ্গা নাগরিকের জন্য কোরবানির এক হাজার ৭০০ গরু, ৩৫০ ছাগল ও ৫০ হাজার কেজি মাংস সরবরাহের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ২৩টির বেশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার (এনজিও) সহায়তায় এই মানবিক সহায়তা পরিচালিত হচ্ছে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের (আরআরআরসি) তত্ত্বাবধানে। প্রতিটি রোহিঙ্গা পরিবারকে ঈদের দিন সকালে প্রায় দেড় কেজি করে কোরবানির মাংস সরবরাহ করা হবে। উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের জন্য এনজিওগুলোর সহায়তা থাকলেও, টেকনাফের ক্যাম্পগুলো এবারের উৎসব থেকে প্রায় সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত হতে যাচ্ছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি যা বললেন- উখিয়া উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সরওয়ার জাহান চৌধুরী তার ফেসবুক আইডিতে উল্লেখ করে বলেন, ‘পবিত্র কোরবান উপলক্ষে এনজিও/আইএনজিও কর্তৃক রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১৫০০টি গরু. ৪৫০টি ছাগল, ৫০ টন প্যাকেট মাংস দেয়া হচ্ছে বলে শুনলাম। ২৫ শতাংশ হিসেবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য ৩৭৫টি গরু, ১১৪টি ছাগল ও সাড়ে ১২ টন প্যাকেট মাংস পাওয়ার কথা।’
তিনি কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ক্ষতিগ্রস্থ হোস্ট কমিউনিটির (উখিয়া-টেকনাফ) ন্যায্য হক যেন যথাযথভাবে বিতরণ করা হয়। এমনটি দাবি জানিয়েছেন তিনি।
এনজিও সংকটে সহানুভূতির প্রভাব-আরআরআরসি ও অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, বহু এনজিও এখন তহবিল সংকটে রয়েছে। এ কারণে তাদের পক্ষে কোরবানির পশু কেনা সম্ভব হয়নি। তবুও যারা সহায়তা করছে, তাদের মাধ্যমে প্রায় আট লাখ রোহিঙ্গাকে অন্তত কিছুটা আনন্দ দেয়ার চেষ্টা করছি। তবে টেকনাফের শালবাগানসহ অন্য ক্যাম্পের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, টানা দ্বিতীয়বারের মতো কোরবানির মাংস থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।
রোহিঙ্গা নেতা জামাল হোসেন বলেন, ‘ঈদে অন্যরা যখন মাংস পাচ্ছে, আমাদের শিশুরা তাকিয়ে থাকে। এটা খুবই কষ্টদায়ক।’
বিদেশি রেমিট্যান্সে ব্যক্তিগত কোরবানি-উখিয়া-টেকনাফের কিছু রোহিঙ্গা পরিবার নিজেদের উদ্যোগে আত্মীয়-স্বজনদের পাঠানো অর্থে কোরবানির প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
শালবাগান ক্যাম্পের বাসিন্দা আবদুল জব্বার জানান, গত বছর আত্মীয়দের পাঠানো টাকায় ৭০টির মতো গরু-মহিষ কোরবানি দিয়েছিলাম। এবারো প্রায় ৩০-৩৫টি পশু কেনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
উখিয়া ১১ নম্বর ক্যাম্পের বাসিন্দা জিয়াউর রহমান বলেন, ‘আত্নীয়-স্বজনেরা বিদেশে আছে। তারা টাকা পাঠিয়েছেন। আমরা বেশ কয়েক পরিবার মিলে এবার কোরবানি দেয়ার নিয়ত করেছি।’
মানবিকতা ও সহমর্মিতার বাস্তব প্রয়োগ- ইসলাম ধর্মে কোরবানি শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি আত্মত্যাগ, সহানুভূতি ও সামাজিক সাম্যবোধের প্রতীক। প্রিয় বস্তুকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করার মধ্য দিয়ে কোরবানি মুসলমানদের মানবিক দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পাশে দাঁড়ানো শুধু দাতব্য কাজ নয়, এটি ধর্মীয় ও মানবিক দায়িত্বও বটে।
ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনা-আরআরআরসি কার্যালয় জানিয়েছে, প্রতিটি ক্যাম্পে ক্যাম্প ইনচার্জের তত্ত্বাবধানে বিশেষ ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসব কমিটির মাধ্যমে মাঝিদের (রোহিঙ্গা নেতা) সমন্বয়ে মাংস বণ্টনের কাজ পরিচালিত হবে। ঈদের দিন বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকায় পশু জবাই ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিকল্প প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। কোরবানির পশুর চামড়া এবারও উখিয়া ও টেকনাফের এতিমখানাগুলোতে বিতরণ করা হবে।
প্রয়োজন আরো সংগঠিত সহায়তার- ২০১৯ সালে যেখানে ৫ হাজারের মতো পশু কোরবানি হয়েছিল, এবার সেই সংখ্যা দুই হাজারেরও নিচে নেমেছে। যুদ্ধ, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এনজিওগুলোকে সীমিত করেছে। তবে এই সংকটেও যারা রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন, তাদের অবদান নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান—রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তায় আরো সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া হোক, যেন এই উৎসবের আনন্দের ছোঁয়া প্রতিটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৌঁছে যায়।








