অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার ঘোষণার পাশাপাশি পুঁজিবাজারের উন্নয়নের জন্য দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) কর্তৃপক্ষের নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। এরই প্রতিফলন ঘটেছে গতকাল পুঁজিবাজারের লেনদেনে। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টম্বর) ডিএসই কর্তৃপক্ষ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সংস্থাটির নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগের বিষয়ে বিস্তারিত ঘোষণা দেয়। এর ফলে পাল্টে যায় বাজারের চিত্র। দু’দিন সূচক পতনের পর গতকাল দেশের দুই পুঁজিবাজারেই সূচকের বড় ধরনের উন্নতি ঘটে। একই সময়ে বৃদ্ধি পায় বাজারগুলোর লেনদেনও।
বেশ কিছুদিন ধরে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের বিরূদ্ধে বিনিয়োগকারীরা অতি নজরদারির অভিযোগ করছিলেন। আর তা অস্বীকার করে আসছিল ডিএসই কর্তৃপক্ষ। এ নিয়ে একটা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চলছিল দেশের প্রধান পুঁজিবাজারটির সাথে বিনিয়োগকারীদের। সম্প্রতি পুঁজিবাজারের অস্থির আচরণের কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট অনেকেই এটিকে সামনে আনেন। বলা হচ্ছিল বড় ধরনের লেনদেন সংঘটিত হলেই ডিএসই’র পক্ষ থেকে তা জানতে চাওয়া হচ্ছিল। করা হচ্ছিল অস্বাভাবিক নজরদারি। আর এর ফলে বড় বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করে সাইড লাইনে চলে আসছিলেন। এতে তৈরি হওয়া বিক্রয়চাপে অস্থির ছিল বাজার সূচক। ধারাবাহিক পতনের ফাঁদে আটকে যায় পুঁজিবাজার। এ নিয়ে বিভিন্ন পক্ষ থেকে ডিএসই’র প্রতি আিভযোগ ছিল অনেকের; কিন্তু মঙ্গলবার ডিএসই কর্তৃপক্ষ হতে দেয়া বিভিন্ন ঘোষণায় বাজারে তৈরি হয়েছে আস্থার পরিবেশ।
প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টকের প্রধান সূচক ডিএসই-এক্স গতকাল ৫৫ দশমিক ৩৯ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। ৫ হাজার ৫৪০ দশমিক ৩২ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি বুধবার দিনশেষে পোঁছে যায় ৫ হাজার ৫৯৬ দশমিক ২১ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ১৬ দশমিক ৫৫ ও ১০ দশমিক ৭৫ পয়েন্ট। অনুরূপভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই গতকাল ৫৪ দশমিক ৯২ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। ১৪ হাজার ৮১৫ দশমিক ৭৫ পয়েন্ট থেকে সূচকটি দিনশেষে পৌঁছে যায় ১৪ হাজার ৮৭০ দশমিক ৬৮ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৬৮ দশমিক ১৮ ও ৩৮ দশমিক ২৪ পয়েন্ট।
গতকাল লেনদেনের শুরু থেকেই দুই বাজারের সূচক ছিল ঊর্ধ্বমুখী। সাড়ে ১০টার পর বাজারে সাময়িকভাবে বিক্রয়চাপ সক্রিয় হলে কিছুক্ষণের জন্য নিম্নমুখী আচরণ করে সূচক। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এই চাপ সামলে ফের ঊর্ধ্বমুখী হয় সূচক। দিনের বাকি সময় আর বড় কোনো বিক্রয়চাপের মুখে পড়তে হয়নি। লেনদেনের শেষদিকে এসে ডিএসই’র প্রধান সূচকটি একপর্যায়ে ৬২ পয়েন্ট উন্নতি ঘটতে দেখা যায়। তবে দিনের সমন্বয়শেষে বৃদ্ধি পাওয়া সূচকের কিছুটা হারায় ডিএসই।
সূচকের পাশাপাশি গতকাল দুই পুঁজিবাজারের লেনদেনও কিছুটা বৃদ্ধি পায়। ঢাকা স্টক গতকাল ৮৪৪ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হয় যা আগের দিন অপেক্ষা ৫৩ কোটি টাকা বেশি। মঙ্গলবার বাজারটির লেনদেন ছিল ৭৯১ কোটি টাকা। অপর দিকে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজার ২৪ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে মঙ্গলবার। বুধবার সিএসই’র লেনদেন ছিল ১৯ কোটি টাকা।
এ দিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকিং খাতের কোম্পানি প্রাইম ব্যাংক পিএলসির প্রায় ৪৯ লাখ শেয়ার কেনার ঘোষণা দিয়েছেন ব্যাংকটির একজন উদ্যোক্তা পরিচালক ও একটি করপোরেট উদ্যোক্তা। গতকাল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) পাঠানো পৃথক ঘোষণায় এ তথ্য জানানো হয়েছে। ঘোষণা অনুযায়ী, প্রাইম ব্যাংকের পরিচালক নাফিস সিকদার প্রচলিত বাজারদরে ব্লক মার্কেটের মাধ্যমে ব্যাংকটির ১৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫১৫টি শেয়ার কেনার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। ঘোষণায় বলা হয়েছে, আগামী ২৯ অক্টোবরের মধ্যে এ শেয়ার কেনার লেনদেন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্য দিকে ব্যাংকটির করপোরেট উদ্যোক্তা এমজেএল বাংলাদেশ পিএলসিও প্রাইম ব্যাংকের শেয়ার কেনার ঘোষণা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি প্রচলিত বাজারদরে ব্লক মার্কেটের মাধ্যমে ৩০ লাখ ১৪ হাজার ৮৯৫টি শেয়ার কেনার পরিকল্পনা করেছে। এই লেনদেনও ২৯ অক্টোবরের মধ্যে সম্পন্ন করার কথা জানানো হয়েছে। সে হিসাবে মোট ৪৯ লাখ ৪১০টি শেয়ার কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।
গতকাল ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস। এ দিন ৩৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ১৬ লাখ ৩৩ হাজার শেয়ার হাতবদল হয়। ২৫ কোটি ৯৮ লাখ টাকায় ১৭ লাখ ৩০ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস উঠে আসে দ্বিতীয় অবস্থানে। ডিএসই’র লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল- যথাক্রমে ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস, ওরিয়ন ইনফিউশন, আইপিডিসি, মালেক স্পিনিং, এপেক্স স্পিনিং, এনভয় টেক্সটাইলস, শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ ও সায়হাম টেক্সটাইলস।
গতকাল ডিএসইতে বেশ কয়েকটি কোম্পানিকে দিনের সার্কিট ব্রেকারের সর্বোচ্চ দরে লেনদেন হতে দেখা যায়। এগুলোর মধ্যে ছিল- ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট, ইনডেক্স অ্যাগ্রো, চার্টার্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স, ওরিয়ন ফার্মা, বসুন্ধরা পেপার মিলস, সি পার্ল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট। এদের মধ্যে ৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে দিনের শীর্ষে ছিল ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট। উল্লেখযোগ্য মূল্যবৃদ্ধি পাওয়া অন্য কোম্পানির মধ্যে আরো ছিল- তশরিফা ইন্ডাস্ট্রিজ, এপেক্স স্পিনিং, মুন্নু ফেব্রিক্স, ফার্স্ট প্রাইম মিউচুয়াল ফান্ড ও ট্রাস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স।
ডিএসইতে গতকাল সবচেয়ে বেশি দরপতন ঘটে মিউচুয়াল ফান্ডের। ৩৫টি ফান্ডের মধ্যে ২৯টিই দরপতনের শিকার হয়। এদের মধ্যে ৫ দশমিক ২৬ শতাংশ দর হারিয়ে সবার উপরে ছিল এবি ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড। ৫ দশমিক ২২ শতাংশ দরপতনের শিকার রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ছিল দ্বিতীয় স্থানে। এ তালিকায় আরো ছিল যথাক্রমে আইসিবি এনআরবি থার্ড মিউচুয়াল ফান্ড, আইএফআইসি ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ও প্রাইম আইসিবি মিউচুয়াল ফান্ড।





