অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
অবশেষে সূচকের উন্নতি ঘটেছে পুঁজিবাজারে। টানা চারদিন পতনের পর গতকাল বুধবার দেশের দুই পুঁজিবাজারে সূচকের উন্নতি ঘটল। ধারাবাহিক পতনের কারণে বিনিয়োগকারীরা যখন একপ্রকার হাল ছেড়ে দিতে বসেছে তখনই ঊর্ধ্বমুখী আচরণ করল দেশের দুই পুঁজিবাজার। এতে বিনিয়োগকারীদের হতাশা কিছুটা হলেও কমেছে। তবে এ আচরণ ক’দিন টেকে তা নিয়েও সন্দেহ পোষণ করছেন বিনিয়োগকারীরা। তারা মনে করেন কোনো কারণ ছাড়াই দিনের পর দিন পতন ঘটা পুঁজিবাজারের কোনো স্বাভাবিক আচরণ হতে পারে না। 
তবে বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন অন্য কথা। তারা মনে করেন, দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিফলন হচ্ছে পুঁজিবাজার। অর্থনীতি ভালো থাকলেই পুঁজিবাজার ভালো পারফর্ম করার কথা। জ¦ালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তাসহ নানা কারণে এখন সারা বিশে^র অর্থনীতিতেই মন্দাভাব বিরাজ করছে। তার প্রভাব থেকে মুক্ত নয় বাংলাদেশও। তবে পুঁজিবাজারে নিজেদের মূলধনের সুরক্ষায় সবচেয়ে বড় ভূমিকাটি বিনিয়োগকারীদের ওপরই বর্তায়। অথচ বাজার কিছুটা নেতিবাচক আচরণ করলেই শেয়ার বিক্রির ধূম পড়ে যায়। ধৈর্য ধরে ভালো সময়ের অপেক্ষা করাটাই যে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের প্রথম শর্ত, যার ধারে কাছেও কেউ নেই।  ফলে বাজারে পতন আরো তরান্বিত হয়। 
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ২৬ দশমিক ১৯ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। ৫ হাজার ৫২৪ দশমিক ৩৭ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি গতকাল দিনশেষে স্থির হয় ৫ হাজার ৫৫০ দশমিক ৪৪ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ১৩২ দশমিক ০৬ ও ৪ দশমিক ৪৭ পয়েন্ট। এর আগে চার দিনে প্রধান সূচকটির ৬৭ দশমিক ৮৩ পয়েন্ট হারায় ডিএসই। 
দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক ৪১ দশমিক ৯৬ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। ১৪ হাজার ৭৭২ দশমিক ৭৩ পয়েন্ট থেকে সকালে যাত্রা করা সূচকটি বিকেলে লেনদেনশেষে স্থির হয় ১৪ হাজার ৮১৪ দশমিক ৬৯ পয়েন্টে। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্সের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৪৭ দশমিক ৬১ ও ২৭ দশমিক ৬০ পয়েন্ট।    
সূচকের উন্নতি গতকাল দুই পুঁজিবাজারের লেনদেনেও কিছুটা প্রভাব ফেলে। এতে বেড়েছে বাজারগুলোর লেনদেন। ঢাকার শেয়ারবাজার এদিন ৬০০ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ৬৫ কোটি টাকা বেশি। মঙ্গলবার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৬৩৪ কোটি টাকা। অপর দিকে চট্টগ্রামের বাজারে লেনদেন পৌঁছে যায় ৪৬ কোটিতে, যা আগের দিন ছিল ২৫ কোটি টাকা। 
এ দিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত পাঁচটি ব্যাংককে তাদের মূলধন ভিত্তি বাড়াতে বন্ড ইস্যু করে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করার অনুমোদন দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি)। মঙ্গলবার কমিশনের ১০৩১তম সভায় এ অনুমোদন দেয়া হয়। বিএসইসির সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এ সভায় সভাপতিত্ব করেন চেয়ারম্যান মাসুদ খান। সভায় ওয়ান ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক ও ব্যাংক এশিয়ার বিভিন্ন মেয়াদের বন্ড ইস্যুর প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়।
ওয়ান ব্যাংকের ৪০০ কোটি টাকা মূল্যের আনসিকিউরড, নন-কনভার্টিবল, ফুললি রিডিমেবল, ফ্লোটিং রেট সাব-অর্ডিনেটেড বন্ড-৬ অনুমোদন করা হয়েছে। বন্ডটির কুপন রেট হবে রেফারেন্স রেটের সাথে তিন শতাংশ যোগ করে। প্রাাইভেট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে ইস্যু হতে যাওয়া এ বন্ডের প্রতি ইউনিটের অভিহিত মূল্য এক লাখ টাকা। এর মাধ্যমে ব্যাংকটির টায়ার-২ মূলধন ভিত্তি শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে। বন্ডটির ট্রাস্টি হিসেবে থাকবে গ্রিন ডেল্টা ক্যাপিটাল লিমিটেড এবং ইস্যু ম্যানেজার হিসেবে থাকবে ইউসিবি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড।
সাউথইস্ট ব্যাংক পিএলসির ৮০০ কোটি টাকা মূল্যের সাত বছর মেয়াদি ফুলি রিডিমেবল, নন-কনভার্টিবল, আনসিকিউরড, ফ্লোটিং রেট সাব-অর্ডিনেটেড বন্ডের ষষ্ঠ ইস্যুও অনুমোদন পেয়েছে। এ বন্ডের কুপন রেট হবে রেফারেন্স রেট +৩ শতাংশ এবং প্রতি ইউনিটের অভিহিত মূল্য পাঁচ লাখ টাকা। বন্ডটির ট্রাস্টি হিসেবে থাকবে ডিবিএইচ ফাইন্যান্স পিএলসি এবং ইস্যু ম্যানেজার হিসেবে কাজ করবে ইউসিবি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড।
ব্র্যাক ব্যাংকের এক হাজার কোটি টাকা মূল্যের তিন বছর মেয়াদি আনসিকিউরড, নন-কনভার্টিবল, ফুললি রিডিমেবল জিরো-কুপন গ্রিন বন্ডের প্রস্তাবও অনুমোদন করা হয়েছে। বন্ডটির সম্ভাব্য ডিসকাউন্ট রেট ৮ দশমিক ৫ শতাংশ এবং প্রতি ইউনিটের অভিহিত মূল্য ১০ লাখ টাকা। এ বন্ডের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ যোগ্য গ্রাহকদের কম খরচে সবুজ অর্থায়ন সুবিধা দিতে ব্যবহার করা হবে। এই বন্ডের ট্রাস্টি হিসেবে থাকবে প্রাইম ব্যাংক ইনভেস্টমেন্ট এবং ইস্যু ম্যানেজার হিসেবে থাকবে আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড।
আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের ৫০০ কোটি টাকা মূল্যের সাত বছর মেয়াদি আনসিকিউরড, নন-কনভার্টিবল, রিডিমেবল, ফ্লোটিং রেট এআইবিপিএলসি পঞ্চম সাব-অর্ডিনেটেড বন্ডের প্রস্তাবও অনুমোদন করেছে কমিশন। এ বন্ডের কুপন রেট হবে রেফারেন্স রেট +৩ শতাংশ এবং প্রতি ইউনিটের অভিহিত মূল্য পাঁচ লাখ টাকা। বন্ডটির ট্রাস্টি হিসেবে থাকবে ডিবিএইচ ফাইন্যান্স এবং ইস্যু ম্যানেজার হিসেবে থাকবে ইউসিবি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড।
এ ছাড়া ব্যাংক এশিয়ার ৮০০ কোটি টাকা মূল্যের সাত বছর মেয়াদি আনসিকিউরড, নন-কনভার্টিবল, ফুললি রিডিমেবল, ফ্লোটিং রেট অ্যান্ড সাসটেইনেবল সাব-অর্ডিনেটেড বন্ডের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। এ বন্ডের কুপন রেট হবে রেফারেন্স রেট +৩ শতাংশ এবং প্রতি ইউনিটের অভিহিত মূল্য ১০ লাখ টাকা। বন্ড থেকে পাওয়া অর্থ যোগ্য সবুজ ও টেকসই প্রকল্পে অর্থায়ন এবং পুনঃঅর্থায়নে ব্যবহার করা হবে। এর ট্রাস্টি হবে ডিবিএইচ ফাইন্যান্স পিএলসি এবং ইস্যু ম্যানেজার হিসেবে থাকবে প্রাইম ব্যাংক ইনভেস্টমেন্ট। 
বিএসইসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পাঁচটি বন্ডই প্রাইভেট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক ও উচ্চসম্পদশালী বিনিয়োগকারীদের কাছে ইস্যু করা হবে। পাশাপাশি প্রতিটি বন্ড ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মেইন বোর্ডে তালিকাভুক্ত করার কথা রয়েছে।